কয়েক পা এগিয়েছি, হঠাৎ পাশের একটা গাছের ছায়া থেকে কেউ রাস্তায় এসে করজোড়ে প্রণাম করে বলল, মশাই কি কলকাতা থেকে আসছেন? মশাই কি সানুবাবুর বন্ধু?
বললুম, —হ্যাঁ। তুমি কি কালাচঁদ-খুড়ো?
জ্যোৎস্নায় লোকটাকে ছায়ামূর্তি বলে মনে হচ্ছিল। সে বলল, আজ্ঞে না। আমি কালাচাঁদ না। গোরাচাঁদ। কালাচাঁদের মাসতুতো ভাই। কই দিন আপনার মালপত্তর। আমি বয়ে নিয়ে যাই। আপনি আরামে হেঁটে আসুন।
গোরাচাঁদকে আমার কাঁধের ব্যাগ দিলুম। হাতের ব্রিফকেসটা সে প্রায় ছিনিয়ে নিল। কিন্তু সে এমনভাবে হাঁটতে থাকল যে আমি তার সঙ্গ ধরতে হাঁপিয়ে উঠছিলুম। তাই বললুম,–ও গোরাঠদখুড়ো! একটু আস্তে হাঁটো। এই খানাখন্দে ভরা রাস্তায় আছাড় খাব যে!
গোরাচাঁদ গতি কমিয়ে মুখ ঘুরিয়ে হাসল। জ্যোৎস্নায় মানুষের দাঁত কি অত চকচক করে? সে সহাস্যে বলল, আমাকেও খুড়ো বলছেন? বাঃ! আপনি খুব ভালো লোক। কালাচাঁদকে গ্রামের সব্বাই খুড়ো বলে। আমাকে কেউ খুড়ো বলেনি।
–আচ্ছা গোরাচাঁদখুড়ো, তারাচরণ যশমশাইকে তো তুমি চেনো।
–খুব চিনি। চিনি বলেই তো গাছপালার ছায়ার আড়ালে চুপিচুপি হাঁটছিলুম।
–কেন?
–আজ্ঞে ওঁর পদ্য শোনার ভয়ে। গত আশ্বিন মাসে এক রাত্তিরে একশো একখানা পদ্য শুনিয়ে ছেড়েছিলেন। অগত্যা কী করব? আমিও ওঁকে বাবা! নামটি আমার গোরাচাঁদ।
রসিকতা করে বললুম,–পাতব শেয়াল ধরার ফাঁদ। কাঁদবে শেয়াল হুক্কাহুয়া। যশমশাই ধরবে ধুয়া, ক্যা হুয়া ক্যা হুয়া?
গোরাচাঁদ থমকে দাঁড়িয়ে তেমনই চকচকে দাঁতে হাসল।–ওরে বাবা। আপনি যে যশমশাইয়ের কত্তাবাবা দেখছি! বাঃ। আমি এবার যশমশাইকে ছড়াটা শুনিয়ে ছাড়ব। এখনও, উনি বাড়ি পৌঁছুতে পারেননি।
বলে সে সুর ধরে আওড়াল :
নামটি আমার গোরাচাঁদ
পাতব শেয়াল ধরার ফাঁদ
কাঁদবে শেয়াল হুক্কা হুয়া
যশমশাই ধরবে ধুয়া
ক্যা হুয়া ক্যা হুয়া।।
তারপর আমাকে হতবাক করে সে এই ছড়াটা সুর ধরে বলতে বলতে রাস্তার বাঁ-দিকে গাছপালার ভেতর উধাও হয়ে গেল। সম্বিত ফিরে পেয়ে চিৎকার করে ডাকলুম,–গোরাচাঁদ খুড়ো! গোরাচাঁদ-খুড়োয়
তখনও তার ছড়াটা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কেমন যেন খ্যানখেনে গলার স্বর। এবার আমার মনে হল, সর্বনাশ! লোকটা ছিনতাইবাজ! চালাকি করে আমার ব্যাগ আর ব্রিফকেস হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল।
সে যেদিকে গেছে, সেদিকে ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলা আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলুম। একটু পরে সামনে টর্চের আলো জ্বলে উঠল। তারপর আলোটা আমার ওপর এসে পড়ল। এবার বোধহয় ডাকাত আসছে। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলুম, কালাচাঁদ খুড়ো! কালাচাঁদ-খুড়ো!
ভারী গলায় লোকটা বলে উঠল, মশাই কি সানুবাবুর বন্ধু? মশাই কি কলকাতা থেকে আসছেন?
এ-ও যে গোরাঠাদের ভঙ্গিতে কথা বলছে। বললুম, হ্যাঁ। তুমি কে?
টর্চ নিভিয়ে লোকটা করজোড়ে প্রণাম করে বলল, আজ্ঞে আমিই কালাচাঁদ। বাসস্টপে আপনার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলুম। বাস চলে গেল। আপনি নামলেন না। তারপর আমার মনে হল, বাবুমশাই তো এ তল্লাটে নতুন আসছেন। ভুল করে ঝুমঝুমিতলায় নেমে পড়েননি তো? তাই দেখতে আসছিলুম। হঠাৎ কানে এল কেউ গোরাচাঁদ খুড়ো বলে চ্যাঁচিচ্ছে।
বললুম,–আমিই চ্যাঁচিচ্ছিলুম কালাচাঁদ-খুড়ো! গোরাচাঁদ আমাকে বলল, সে তোমার মাসতুতো ভাই। তুমিই তাকে আমার খোঁজে পাঠিয়েছ।
–কী বিপদ! তা আপনার মালপত্তর কই?
–গোরাচাঁদ-খুড়ো নিয়ে পালিয়ে গেল!
কালাচাঁদ ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ওরে হতচ্ছাড়া। দেখাচ্ছি মজা। কথায় বলে না? স্বভাব যায় না মলে! স্বভাব বাবুমশাই!
–স্বভাব যায় না মলে মানে?
–এখন ওসব কথা থাক। চলুন। সানুদের বাড়ি এখান থেকে কাছে। আমার সঙ্গে আসুন।
সে পায়ের কাছে টর্চের আলো ফেলে হাঁটতে থাকল। বাঁ-দিকে একটা অনাবাদি মাঠের পথে আমরা হেঁটে যাচ্ছিলুম। যেতে-যেতে এতক্ষণে দেখলুম, কালাচাঁদের একহাতে লাঠি আছে। আবার ভয় পেলুম। লাঠির ঘায়ে আমাকে মেরে মানিব্যাগ হাতিয়ে নেবে না তো? এ কি সত্যি সন্দীপদের বাড়ির কেয়ারটেকার কালাচাঁদ? নাকি কোনও ডাকাত? নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গিয়ে লাঠি তুলবে। আমি তৈরি হয়ে হাঁটছিলুম। কিছুক্ষণ পরে একটা পুকুরের পাড়ে উঠে সে বলল,–এই পুকুরটা সানুদের। ওই দেখুন ওদের বাড়ি।
দোতলা বাড়িটাতে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে দেখে সাহস ফিরে পেলুম। বললুম,–ঘুমঘুমিতলায় ইলেকট্রিসিটি আছে দেখছি।
–আজ্ঞে ঠা। বছর তিনেক হল ইলেকটিরি এসেছে।
জোরে শ্বাস ছেড়ে বললুম,–কিন্তু আমার ব্যাগ আর ব্রিফকেসের কী হবে। খুড়ো?
কালাচাঁদ হাসল। আজ্ঞে ও নিয়ে ভাববেন না। গোরাচাঁদ আমাকে খুব ভয় করে। বলে সে চেঁচিয়ে উঠল,–অ্যাই হতচ্ছাড়া! বাবুমশাইয়ের মালপত্তর দোতলার ঘরে রেখে তবে যে চুলোয় যাবি যা! নইলে এক্ষুনি মোনা-ওঝাকে ডেকে আনব। সেদিনের মতো তোকে সে তালগাছের ডগায় দাঁড়কাক করে বসিয়ে রাখবে।
গোরাচাঁদকে আমি দেখতে পাচ্ছিলুম না। পুকুরের পাড়ে অজস্র তালগাছ। পশ্চিমপাড় দিয়ে ঘুরে গিরিবালা ভবনের গেটে পৌঁছেছি, হঠাৎ দেখলুম একটা ছায়ামূর্তি বাড়ির পূর্বদিকে উধাও হয়ে গেল। কালাচাঁদ গেটের তালা খুলে বলল,–এ গ্রামে চোর-ডাকাত নেই বাবুমশাই! গোরাচাঁদেরও চুরি-ডাকাতি করা স্বভাব ছিল না। স্বভাব বলতে শুধু একটা। জোছনা-রাত্তিরে টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো। আর তালগাছের ডগায়–
