একসময় সঙ্গী ভদ্রলোকের খোঁচা খেয়ে চোখ খুলতে হল। তিনি আমার ব্যাগটা আমার কোলে ঠেলে দিয়ে জয় মা তারা বলে উঠে দাঁড়ালেন। বাসে তখনও যথেষ্ট। ভিড়। আমিও ভদ্রলোকের দেখাদেখি উঠে পড়লুম এবং জনাতিনেক লোক আমাদের সিটে তখনই সশব্দে বসে পড়ল। তারপর ঠেলাঠেলি করে ভদ্রলোকের পিঠে আগের মতো সেঁটে থেকে দরজার দিকে এগিয়ে গেলুম।
এতক্ষণে দেখতে পেলুম, দরজার ধারে দাঁড়িয়ে কন্ডাক্টার টিকিটের পয়সা নিচ্ছে। ভদ্রলোককে তিন টাকা দিতে দেখে আমিও তা-ই দিলুম। অ্যাসিস্ট্যান্ট তলা তলা বলে চ্যাঁচিচ্ছিল। কোন তলা তা বোঝা যাচ্ছিল না। অবশেষে বাস থামল। ভদ্রলোকের সঙ্গে আমিও নেমে গেলুম। কিন্তু আর কোনও যাত্রী নামল না। বাসটা চলে গেল।
গাছের নিচে আবছা আঁধারে দাঁড়িয়ে দেখি, ভদ্রলোক এগিয়ে যাচ্ছেন। কাছে গিয়ে বললুম,–ওঃ! একটা সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা হল বটে! তবে আপনি না থাকলে–
ভদ্রলোক আমাকে থামিয়ে খাক শব্দে হেসে বললেন,–আরে কী কাণ্ড! আপনিও এই স্টপে নেমে পড়েছেন দেখছি।
অবাক হয়ে বললুম,-কেন? আপনিও তো ঘুমঘুমিতলায় নামবেন বলছিলেন।
–কী বিপদ! এটা তো ঝুমঝুমিতলা স্টপ! আপনি শোনেননি ঝুমঝুমিতলা বলে চ্যাঁচিচ্ছিল?
–সে কী! এটা ঝুমঝুমিতলা?
–হ্যাঁ, মশাই! এই আক্রাগণ্ডার বাজারে খামোকা বাড়তি পঞ্চাশ পয়সা খরচ করতে যাব কেন? ঘুমঘুমিতলা এই স্টপ থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার। ওই দেখুন! চাঁদমামা উঠেছে। জ্যোৎস্নায় এটুকু পথ হাঁটতে-হাঁটতে পদ্য রচনা করব। আমি একজন কবি। বুঝলেন তো?
এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লুম? কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গেছে। তাই বললুম,–দেড় কিলোমিটার জ্যোৎস্নায় হাঁটতে-হাঁটতে কল্পনাশক্তি জাগারই কথা। তা আপনি কবি?
–বলতে পারেন বইকী! স্কুলের ম্যাগাজিনে পদ্য ছাপা হতো। এখন মফস্বল শহরের পত্রিকাতেও ছাপা হয়। খানকতক পদ্য দিতেই তো হিংলাডিহি গিয়েছিলুম।
–এবার আপনার নামটা জানতে পারি?
–আমার নাম তারাচরণ যশ। আপনার বন্ধু সানু আমার পদ্য শুনে বলেছিল, যদি কখনও পত্রিকা করি, আপনার পদ্য সবার আগে ছাপব যশকাকা!
দেড় কিলোমিটার পথ হাঁটতে কথা বলাই ক্লান্তি থেকে বাঁচবার একমাত্র উপায়। তাই বললুম,–আমিও তাহলে আপনাকে যশকাকা বলব!
–বলুন! ইচ্ছে যখন হয়েছে, তখন বলুন।
–আচ্ছা যশকাকা, সানুদের বাড়িতে কী গণ্ডগোলের কথা বলছিলেন?
–এখন এই নিরিবিলি রাস্তায় রাত্রিকালে ওকথা বলা উচিত না।
–ভূতপ্রেতের গণ্ডগোল নয় তো?
তারাচরণ যশ থমকে দাঁড়ালেন।–রাম! রাম! রাম! পেছনে ঝুমঝুমিতলা। একটা বটগাছ আছে ওখানে। রাতবিরেতে পেতনি ঝুমঝুম শব্দে নূপুর বাজিয়ে নাচে। কাজেই রাম রাম রাম।
তিনি আবার পা বাড়ালেন। বললুম,–ঠিক আছে। আপনার একটা পদ্য শোনান বরং।
যশবাবু হাসলেন। কদিন থেকে একটা পদ্য লিখছি। তবে শেষ লাইনটা কিছুতেই মেলাতে পারছি না। বড় সমস্যায় পড়েছি। আপনি তো কলকাতায় থাকেন। শিক্ষিত মানুষ। একটু সাহায্য করতে নিশ্চয় পারবেন।
বেঁকের বশে বলে ফেললুম, আমি আগে পদ্যই লিখতুম। এখন অবশ্য গদ্য লিখি। শারদীয়া সংখ্যা পত্র-পত্রিকায় লেখার জন্যই নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলুম। সন্দীপ ওদের গ্রামের বাড়ির কথা বলল। তাই চলে এলুম।
যশবাবু যেন লাফিয়ে উঠলেন। বলেন কী? মশাইয়ের নাম?
নামটা বানিয়ে বলতে হল। আমার নাম কল্লোল গুপ্ত।
–বাঃ! অপূর্ব নাম! শুনেছি-শুনেছি মনে হচ্ছে। আপনার লেখাও পড়েছি মনে হচ্ছে।
–আপনি না বলে তুমি বললেই খুশি হব যশকাকা।
যশবাবু খুশি হয়ে বললেন,–তাই বলছি। তা–তুমি যখন পদ্য লিখতে একসময়, তখন তুমিই আমার অসমাপ্ত পদ্যটার একটা হিল্লে করতে পারবে। তাহলে বলি পদ্যটা?
–বলুন!
যশবাবু গলা ঝেড়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে সুর ধরে বললেন,–
পাতুবাবু ছাতু খান অতি আহ্লাদে
জল্লাদ ধরে নিয়ে যায় প্রহ্লাদে
রামবাবু রেগে লাল
সন্দেশে কেন ঝাল…
এবার যশবাবু থেমে গেলেন। শ্বাস ছেড়ে বললেন,–শেষ লাইনটা মেলাতে হবে প্রথম লাইনের সঙ্গে। কিন্তু আদে, প্রহ্লাদের সঙ্গে মিলবে এমন কোনও শব্দই খুঁজে পাচ্ছি না।
একটু ভেবে নিয়ে বললুম,–
পাতুবাবু ছাতু খান অতি আহ্লাদে
জল্লাদ ধরে নিয়ে যায় প্রহ্লাদে
রামবাবু রেগে লাল
সন্দেশে কেন ঝাল
ঝাল মেপে দেখি ওরে দাঁড়িপাল্লা দে।
যশবাবু এবার সত্যিই লাফিয়ে উঠলেন।–বাঃ! ঝাল মেপে দেখি ওরে দাঁড়িপাল্লা দে! অপূর্ব! ঝাল মেপে দেখি ওরে দাঁড়িপাল্লা দে! মুখস্থ করি। ঝাল মেপে দেখি ওরে দাঁড়িপাল্লা দে! এক্ষুনি বাড়ি গিয়ে লিখে ফেলতে হবে। নইলে ভুলে যাব। ঝাল মেপে দেখি ওরে দাঁড়িপাল্লা দে। ঝাল মেপে দেখি ওরে দাঁড়িপাল্লা দে! ঝাল মেপে দেখি ওরে–শর্টকাটে যাইরে! দাঁড়িপাল্লা দে।
সুর ধরে বলতে-বলতে তারাচরণবাবু বাঁ-দিকে ঘন কালো রঙের মধ্যে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। একটু পরে বুঝতে পারলুম, ওটা একটা আমবাগান। শর্টকাটে আমবাগানের ভেতর দিয়ে উনি বাড়ি গিয়ে এখনই লাইনটা লিখে ফেলবেন। কিন্তু কেন যে সন্দীপের ভূতভুতুম পত্রিকার কথাটা বলিনি। বললে উনি আমাকে গিরিবালা ভবনে পৌঁছে দিতেন।
নিজের বোকামিতে রাগ হচ্ছিল। ঘুমঘুমিতলায় কালাচাঁদখুডোর থাকার কথা। এখনও সেটা কতদূরে কে জানে!
