সন্দীপের কথা আমার মনে ধরল। ওর পত্রিকার জন্য ভূতের উপন্যাস না লেখা হোক, স্থানবদলের দরুণ আমার মগজে কল্পনাশক্তিটা ফিরে আসবার সম্ভাবনা প্রচুর। তাই রাজি হয়ে গেলুম। সন্দীপ এস. টি. ডি. ফোনে ঘুমঘুমিতলায় তার বাবার বন্ধু এক ডাক্তারবাবুকে জানিয়ে দেবে এবং তিনি কালাচাঁদকে আমার যাওয়ার খবরটা দিয়ে রাখবেন।
হাওড়া স্টেশনে বারোটা পাঁচের ট্রেনে চেপে আমাকে নামতে হবে হিংলাডিহি স্টেশনে। সেখান থেকে বাসে চেপে ঘুমঘুমিতলা পৌঁছুব। স্টেশন থেকে আঠারো কিলোমিটার দূরত্ব। বাসস্টপে কালাচাঁদ থাকবে।
সন্দীপ চলে যাওয়ার সময় আবার বলে গেল, প্রথমে কিন্তু আমার পত্রিকার জন্য উপন্যাস লিখতে বসবি।
পরে বুঝতে পেরেছিলুম, সন্দীপ ভূতভুতুম পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার জন্য আমার উপন্যাস সর্বাগ্রে পেতে চায়। তাই আমাকে সে তার গাড়িতে চাপিয়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল এবং ট্রেনেও তুলে দিয়েছিল।
যে ট্রেনের হিংলাডিহিতে সাড়ে তিনটে নাগাদ পৌঁছুনোর কথা, সেই ট্রেন গদাইলস্করি চালে চলতে-চলতে পৌঁছুল সওয়া চারটেতে। বেরিয়ে গিয়ে বাসস্ট্যান্ডে ঘুমঘুমিতলার বাস খোঁজ করলুম। সেখানে প্রচণ্ড ভিড়। কয়েকটা বাস দাঁড়িয়ে আছে এবং সবগুলোই ভিড়ে ততক্ষণে ঠাসা হয়ে গেছে। আরও লোক গিয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলছে। অবস্থা দেখে দমে গেলুম। ঘুমঘুমিতলার বাসের খোঁজ যার কাছে নিচ্ছি, সে-ই বলছে,–ওপাশে দেখুন।
আমার কাঁধে প্রকাণ্ড ব্যাগ আর হাতে ব্রিফকেস। আমার বাসটারও যদি ওইরকম অবস্থা হয়, কেমন করে আমি তাতে চাপব বুঝতে পারছিলাম না। সেইসময় বেঁটে গোলগাল চেহারার ধুতি-পাঞ্জাবিপরা এক ভদ্রলোককে দেখতে পেলুম। তাঁর কাঁধে একটা কাপড়ের নকশাকাটা ব্যাগ। তিনি একপ্রান্তে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাথায় টাক। মুখে কেমন একটা হাসি। তার কাছে গিয়ে খোঁজ করতেই তিনি সহাস্যে বললেন,–একটু অপেক্ষা করুন। খবর নিয়েছি। যন্তর বিগড়ে জয় মা তারা এখন মানুবাবুর গ্যারাজে আছে। মিস্তিরিরা হাত লাগিয়েছে। বুঝলেন না? একটা ট্রিপ ফেল করলে মালিকের হেভি লস!
বুঝলুম, বাসটার নাম জয় মা তারা। ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করলুম।–আপনি কোথায় যাবেন?
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, আপনি যেখানে যাবেন। তা মশাইয়ের আসা হচ্ছে কোত্থেকে?
–কলকাতা থেকে।
–ঘুমঘুমিতলায় কাদের বাড়ি যাওয়া হবে?
–চাটুজ্যেমশাইদের বাড়ি। বাড়িটার নাম গিরিবালা ভবন।
–তাই বলুন! অবনী চাটুজ্যে এখন কলকাতায় চলে গেছে। অবনী স্কুলে আমার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। তা–মশাই কি অবনীর আত্মীয়?
–না। অবনীবাবুর ছেলে সন্দীপ আমার বন্ধু।
–সন্দীপ, মানে সানু আপনার সঙ্গে আসেনি?
–সে এখন ব্যস্ত। আমি একা এসেছি।
ভদ্রলোক কেন কে জানে মুচকি হাসলেন। তা ভালো। কালাচাঁদ আছে। গণ্ডগোল পড়লে সে একাই একশো।
একটু চমকে উঠেছিলুম। গণ্ডগোল মানে? কীসের গণ্ডগোল?
ও কিছু না।–বলে ভদ্রলোক রাস্তার দিকে তাকালেন, রেডি হোন! জয় মা তারা আসছে মনে হচ্ছে।
–প্লিজ আমাকে বাসে উঠতে আপনি যদি একটু সাহায্য করেন–
–আলবাত করব। আমার বাল্যবন্ধুর ছেলের বন্ধু আপনি। এক কাজ করবেন। আপনি আমার পেছনে আঠার মতো সেঁটে থাকবেন। ছেড়ে গেলেই বিপদ। সেঁটে থাকলে দেখবেন, ঠিক বাসের মধ্যিখানে পৌঁছে গেছেন। আগে থেকে সাবধান করে দিলুম।
একটা খালি বাস হর্ন দিতে দিতে এসে দাঁড়ানোমাত্র আমি সত্যিই খালি বাঁ-হাত দিয়ে ভদ্রলোকের পেটের দিকটায় জড়িয়ে ধরেছিলুম। তারপর যেন ঝড় প্লাবন মহাপ্রলয়ের মধ্যে দিয়ে অসহায় হয়ে প্রায় ভেসেই চললুম। এরপর কী ঘটল বুঝলুম না। একসময় দেখলুম, আমি সেই ভদ্রলোকের পাশে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে বসে আছি।
নাঃ! কাঁধের প্রকাণ্ড ব্যাগটা ঠিকই আছে। তবে ভদ্রলোকের পেটের ওপর আছে, এই যা। হাতের ব্রিফকেস দু-পায়ের ফাঁকে কখন ঢুকে গেছে। ভদ্রলোক শাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বলে উঠলেন,–জয় মা তারা!
আমিও মনে মনে বললুম,–জয় মা তারা!
বাসটার মধ্যে মানুষ আর জিনিস ঠেসে প্রায় দলা পাকিয়ে আছে। পিঠে খোঁচা খেয়ে অতিকষ্টে মুখ ঘুরিয়ে দেখলুম, বাইরে বাদুড়ঝোলা হয়ে লোকেরা ঝুলছে। ভেতরের লোকেরা চ্যাঁচিচ্ছে–বাস চালাও! বাস চালাও!
বাসের ছোকরা অ্যাসিস্ট্যান্ট বাসের গায়ে থাপ্পড় মেরে হাঁক দিচ্ছে–ছেড়ে গেল! ছেড়ে গেল! বেলতলা! তেলতলা! ঝুমঝুমিতলা! ঘুমঘুমিতলা!
যাত্রীদের চ্যাঁচিমেচিতে অবশেষে বাসের চাকা গড়াল। কিন্তু এ যে দেখছি ভূমিকম্প হচ্ছে যেন! প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর মাঝে-মাঝে কেমন গোগো গরর-গরর বিদঘুঁটে শব্দ। জানালার বাইরে মানুষের মাথা। বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরে সঙ্গী ভদ্রলোককে জিগ্যেস করলুম,–পৌঁছুতে কতক্ষণ লাগবে?
তিনি হাই তুলে বললেন, রাস্তার বেহাল অবস্থা। দু-ঘণ্টাও লাগতে পারে। তিন ঘণ্টাও লাগতে পারে। চিন্তা করবেন না। জয় মা তারা।
বলে তিনি চোখ বুজলেন এবং তার চিবুকটা বুকে বসে গেল। ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?
খানাখন্দে পড়ে বাসের চাকা অদ্ভুত শব্দ করছে। বাসের গতি মন্থর। তারপর লক্ষ করলুম, সেই অ্যাসিস্ট্যান্ট চিৎকার করে উঠছে। শুধু তলা শব্দটাই বুঝতে পারছি। আর বাসটা থেমে যাচ্ছে। ভাবছি, এই বুঝি বাস খালি হল। কিন্তু যতজন নামছে, তার বেশি উঠছে। জোর ধস্তাধস্তি ধাক্কাধাক্কি ঝগড়া চলেছে দু-পক্ষের মধ্যে। অবশেষে আমার চোখ বুজে এল। কী আর করা যাবে? লেখার স্বার্থে এই কষ্টটা না করে উপায় নেই। কষ্ট না করলে কি কেষ্ট মেলে?…
