তারপর দুজনে বরফে স্কেটিং খেলার মতো জলের ওপর স্কেটিং শুরু করল। চেঁচিয়ে উঠলুম,–জিম! জিম! এই হতভাগা!
চন্দ্রকান্ত থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। রোদ্দুরে তাঁর দাঁত চকচক করতে থাকল। তার মানে, হাসছেন। খাপ্পা হয়ে বললুম, আপনার নামে পুলিশ-কেস করব বলে দিচ্ছি।
চন্দ্রকান্ত স্কেটিং করে চলে এলেন কাছাকাছি। ভুরু কুঁচকে বললেন, কী করবেন বললেন যেন?
–পুলিশকে জানাব।
চন্দ্রকান্ত খি-খি করে হেসে বললেন,–তা জানাতে পারেন। তবে এও জানাবেন, এলাকার সব চোর-চোট্টাকে তাহলে আমি জল-জুতো আর ডানা তৈরি করে দেব। পুলিশ তখন তাদের আর পাকড়াও করতেই পারবে না! চোর যদি উভচর হয়, পুলিশের কী অবস্থা হবে, আশা করি, বুঝতেই পারছেন!
ওঁর কথায় কান না দিয়ে ফের ডাকতে থাকলুম,–জিম! জিম! এই নেমকহারাম হতচ্ছাড়া!
এতক্ষণে জিম আমাকে দেখতে পেল। কিন্তু এবার সে জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে এল না। হঠাং জল-ছাড়া হয়ে পাখির মতো ডানা মেলে আকাশে উড়ল এবং আমার মাথার ওপর বারতিনেক চক্কর দিয়ে ঝুপ করে মাটিতে নামল। লেজ নাড়তে লাগল। অমনি খপ করে তাকে ধরে ফেললুম।
চন্দ্রকান্ত জল থেকে ডাঙায় উঠে জল-জুতো খুলতে-খুলতে বললেন, আপনার ডানাদুটো কিন্তু রাখা আছে সযত্নে। চাইলে এখনও দিতে পারি। আর যদি শেষপর্যন্ত না-ই নেন, রামুকেই দেব। এই রামু, যাসনে। কথা আছে শোন! ডানা পরে পাখি হবি?
রামু কী বুঝল সেই জানে। সে হন্তদন্ত হয়ে কেটে পড়ল। বিজ্ঞানী বাঁকা হেসে পাইপ বের করে বললেন, আশ্চর্য! মানুষের ভালো করতে গেলেই গাল খেতে হয় দেখছি। আপনার জিমকে উভচরে পরিণত করলুম–সেজন্য আপনি আমার প্রশংসা করবেন, তা নয়। উল্টে পুলিশের কথা বলে শাসাচ্ছেন!
জিমের চার ঠ্যাং থেকে চারটে জল-জুতো খুলে চন্দ্ৰকান্তের সামনে ছুঁড়ে ফেললুম। তারপর ওর দুই কাঁধ থেকে ডানার মতো জিনিস দুটো অনেক টানাটানি করে খুলে ফেললুম। জিম মুখ গোমড়া করে রইল। ডানাদুটোও ফেলে দিয়ে বললুম,
–আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি চন্দ্রকান্তবাবু, আর কখনও আমার কুকুর চুরি করবেন না। নিজে কুকুর পুষে যা ইচ্ছে করুন!
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত পাইপ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–অগত্যা তাই করতে হবে। তবে ডানাদুটো
আমি পাখি নই, মানুষ। বলে চলে এলুম। তবে এ কথা ঠিকই, ডানাদুটো পরে একবার পাখির মতো ওড়াউড়ি করে দেখতে লোভ যে হচ্ছিল না, এমন নয়। ভয় শুধু একটাইযদি ছাদা থাকে? তাহলে রামুর গাধা-বেচারার মতো–বাপস! ভাবতেই শরীর ঠান্ডা হিম হয়ে যায়। ঝুটঝামেলায় কী দরকার? বেশ তো আছি দু ঠেঙে হয়ে।
ভূতে-মানুষে
একালের লেখকদের এই এক ঝামেলা। পুজোসংখ্যা পত্র-পত্রিকা বেরিয়ে যাওয়ার নপর থেকেই সম্পাদকমশাইদের তাগিদ শুরু হয়ে যায়, পরের বছর পুজোসংখ্যার জন্য জানুয়ারির মধ্যেই লেখা চাই। সেবার জানুয়ারি পেরিয়ে মার্চ মাস এসে গেল। কিন্তু আমার কলম যেন অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করে বসল। আসলে মগজ একেবারে খালি। লেখা বেরুতে চায় না। প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলুম। কিন্তু গোদের ওপর বিষফোঁড়া। মার্চের মাঝামাঝি হঠাৎ আমার এক বন্ধু সন্দীপ এসে সোল্লাসে বলল,–কেল্লা মার দিয়া!
বললম, কী ব্যাপার?
–তোকে আমি বলেছিলুম না আগামী পুজোয় একটা পত্রিকা বের করব? টাকার জোগাড় হয়ে গেছে। এবার আর আমাকে রেখে কে? পত্রিকার নামও ঠিক করে ফেলেছি। বুঝলি?
সন্দীপ কবে পত্রিকা বের করবে বলেছিল মনে পড়ল না। বললুম,– ভালো। খুব ভালো খবর। পত্রিকার কী নাম ঠিক করলি?
সন্দীপ একগাল হেসে বলল,-ভূতভুতুম।
অবাক হয়ে বললুম, ভূতভুতুম? তার মানে, ভূতের গল্পের পত্রিকা করবি নাকি?
–হ্যাঁ। তবে শুধু গল্প নয়। প্রবন্ধ থাকবে। পদ্য থাকবে। উপন্যাস থাকবে। আর সেই উপন্যাস তোকেই লিখতে হবে। টাকার কথা ভাবিস না। লেখকদের আমরা উপযুক্ত দক্ষিণাই দেব।
ওর কথা শুনেই আমার মাথা ভেঁ-ভোঁ করছিল। সন্দীপ যেমন জেদি, তেমনই গোঁয়ার-গোবিন্দ। করুণমুখে বললুম, সন্দীপ। তোর পত্রিকায় লিখে কি টাকা নিতে পারি? কিন্তু কথাটা কী জানিস? ভূতের আর একটুও চাহিদা নেই। সেই মান্ধাতার আমল থেকে ভূত নিয়ে এত লেখা হয়ে গেছে যে, পাঠক ভূতকে আর একটুও ভয় পায় না। তাছাড়া স্বনামধন্য ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ভূতের সার কথা লিখে গেছেন। এদিকে নতুন ভূত হলেও কথা ছিল। পুরোনো ভূতেরা বাসি হয়ে পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কাজেই
সন্দীপ আমার কথায় বাধা দিয়ে বলল, কী যে বলিস তুই! আমার আইডিয়াটাই তো তাই অন্যরকম। তুই নতুন ভূতের কথা বললি। সেই আনকোরা নতুন ভূত নিয়েই শারদীয়া ভূতভুতুম পত্রিকা বের করতে চাই। তুই অ্যাদ্দিন অনেকরকম ভূতের গল্প লিখেছিস। এবার নতুনরকমের ভূত নিয়ে একখানা উপন্যাস তোকে লিখতেই হবে। তুই একালের ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় হয়ে যাবি।
হতাশ হয়ে বললুম, ভাই সন্দীপ! তোকে খুলেই বলি। এবার মানুষ নিয়েই কোনও লেখা আসছে না, তো ভূত।
–আহা, নতুন ভূত।
–কিন্তু নতুন ভূত পাচ্ছি কোথায়? আমার মগজ একেবারে খালি। কল্পনার যন্ত্রটা মগজের মধ্যে থাকে। সেটাই বিগড়ে গেছে। কল্পনা ছাড়া কি লেখা হয়?
সন্দীপ একটু চুপ করে থাকার পর গম্ভীর হয়ে বলল,-বুঝেছি। কলকাতায় তোর এই ঘরে বইপত্তরের আবর্জনার মধ্যে বসে কি আর লেখা আসে? তোর প্রবলেম আমি বুঝেছি। এক কাজ কর। বীরভূম জেলার ঘুমঘুমিতলায় আমার ঠাকুরদার পৈতৃক একটা বাড়ি আছে। নিরিবিলিতে দোতলা বাড়ি। পিছনে পুকুর আছে। এই বসন্তকালে প্রকৃতি-পরিবেশ আর পাখি-টাখির ডাক–মানে, ওয়ান্ডারফুল জায়গা! বিশেষ করে লেখকদের লেখার জন্য অত সুন্দর জায়গা আর কোথাও নেই। বাড়িটার কেয়ারটেকারের নাম কালাচাঁদ। আমরা যখন ওখানে বেড়াতে যাই, তাকে কালাচাঁদ-খুড়ো বলে ডাকি। ডানপিটে লোক। খুড়ো বললে খুব খুশি হয়। তুই আজই ওখানে চলে যা। একমাস দেড়মাস যদ্দিন খুশি থাকবি। লিখবি। তার চেয়ে বড় কথা, নতুন ধরনের ভূত দেখতে পাওয়ার চান্স ওখানে নাইন্টি নাইন পারসেন্ট।
