খাপ্পা হয়ে বললুম,–চন্দ্রকান্তবাবুর কাছে তোমার খেসারত দাবি করা উচিত ছিল। গাধার দাম আর জরিমানা!
রামু ফোঁসফোঁস করে নাক ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,–গিয়েছিলুম তো। গিয়ে দেখি দরজায় তালা ঝুলছে।
হুঁ, বেগতিক দেখে কেটে পড়েছেন বিজ্ঞানী। কিন্তু এর একটা বিহিত করা উচিত। পাড়ার লোকেদের ডেকে একটা মিটিং করতে হবে। তারপর জেলাশাসকের কাছে চন্দ্ৰকান্তের নামে একটা দরখাস্ত। এই সব উদ্ভুট্টে কাণ্ড করে ভদ্রলোক এরপর আরও কত লোকের ক্ষতি করবেন কে জানে।
ফেরার সময় চন্দ্ৰকান্তের বাড়ির পাশ দিয়েই গেলুম। রামু ঠিকই দেখেছে। দরজায় প্রকাণ্ড তালা ঝুলছে। কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে গেছি হঠাৎ শনশন শব্দ। গাছপালা তোলপাড়। তারপর ওপর থেকে কী একটা ঝুপ করে পড়ল, একেবারে সামনাসামনি। দেখি, বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত। দু-বাহুতে দুটো ডানা–সত্যিই ডানা। প্রকাণ্ড ডানা। ফিক করে হেসে বললেন, কী? বলেছিলুম না আপনার জন্য একজোড়া ডানা তৈরি করে দেব। পাখি হয়ে ইচ্ছেমতো ওড়াউড়ি করে বুঝবেন, অসম্ভব সম্ভব হওয়ার আনন্দটা কতখানি!
বললুম,–দেখুন মশাই, এ সব উদ্ভুট্টে ব্যাপারে আমি নেই।
–সে কী! কেন বলুন তো?
–আপনি জানেন রামুর গাধাটা জলে ডুবে মারা পড়েছে?
–কী কাণ্ড। রামু তো বলেনি আমাকে।
–আপনার দেখা পেলে তো বলবে।
চন্দ্রকান্ত দুঃখিত মুখে বললেন, আপনার এই ডানার কাজে দুদিন ব্যস্ত ছিলুম। যাই হোক, গাধাটার তো ডুবে মরা উচিত ছিল না।
–উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন নয়। জল-জুতোয় হ্যাঁদা হয়েছিল!
চন্দ্রকান্ত একটু হাসলেন। বুঝেছি! নেহাত একটা দুর্ঘটনা। ঘঁাদার জন্য নৌকো ডোবে কি না বলুন আপনি? দোষ তো নৌকোর বা যে তৈরি করেছে নৌকো, তার নয়-মাঝির। মাঝির এসব ব্যাপারে নজর রাখা উচিত!
–ধুর মশাই! গাধা কেমন করে বুঝবে যে জল-জুতোয় ছ্যাঁদা হয়েছে?
–আহা! রামুর উচিত ছিল জলে হাঁটানোর সময় পরীক্ষা করে দেখা।
–রামু একজন নিরক্ষর লোক। সে কী করে ওসব যন্ত্রের ব্যাপার বুঝবে?
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত জিভে চুকচুক শব্দ তুলে বললেন, আহা রে, বেচারা! আপনি ঠিকই বলেছেন। রামুকে আমারই শিখিয়ে দেওয়া উচিত ছিল, জল-জুতো ছাদা হয়েছে কি না, কীভাবে পরীক্ষা করতে হয়! যাই হোক, ওকে বরং একটা গাধা কেনার টাকা দেবোখন। আসুন, আপনাকে ডানাদুটো পরিয়ে দিই।
ভড়কে গিয়ে বললুম, না মশাই, পাখি হয়ে দরকার নেই আমার।
চন্দ্রকান্ত হাসতে লাগলেন। বুঝেছি! ঘঁাদা-ঊ্যাদার ভয় হচ্ছে তো? আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন! পরীক্ষা করে দেখে নিয়ে তবে না এতক্ষণ ওড়াউড়ি করে বেড়ালুম?
ভয় নেই। গ্যারান্টি রইল–আপনি আকাশ থেকে পড়বেন না।
চন্দ্রকান্ত ডানা খুলতে ব্যস্ত হলেন। আমি সেই ফাঁকে কেটে পড়লুম মানে, প্রায় দৌড়ে পালিয়ে বাঁচলুম।
কিন্তু সেটাই প্রকাণ্ড একটা ভুল হয়ে গেল। পালিয়ে-টালিয়ে আসার সময় মানুষের অবস্থা হয় চাচা, আপন প্রাণ বাঁচার মতো। জিমের কথা মনে ছিল না। ফলে জিম নিশ্চয় সুযোগটা নিল। কারণ বাড়ি ঢুকতে গিয়ে তার কথা যখন মনে পড়ল, দেখি সে নেই। সর্বনাশ!
চেঁচিয়ে ডাকলুম,–জিম! জিম! জিম! কিন্তু তার আর পাত্ত নেই।
হতভাগা বুদু যদি চন্দ্ৰকান্তের পাল্লায় পড়ে থাকে, নিশ্চয় তাকে জল-জুতো পরতে হবে এবং তারপর ঠিক রামুর গাধাটার মতোই…
ভাবতে গিয়ে বুক কেঁপে উঠল। তখন মরিয়া হয়ে চন্দ্ৰকান্তের বাড়ির দিকে ফের হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলুম।
চন্দ্রকাস্তের বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেখি, তেমনই তালা বন্ধ। যে-রাস্তায় একটু আগে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেখানেও সব শুনশান, ফঁকা। বুঝলুম, জিমকে নিয়ে বিজ্ঞানীপ্রবর গা-ঢাকা দিয়েছেন কোথাও। গুজব শুনেছি, চন্দ্ৰকান্তের একটা ল্যাবরেটরি আছে কোনও এক গোপন জায়গায়। সেখানেই নাকি যত উদ্ভুট্টে জিনিস আবিষ্কার করেন ভদ্রলোক। বাড়িটা নেহাত বসবাসের জন্য এবং নিতান্তই পৈতৃক। এ-বাড়িতে আমি যেমন, তেমনই অন্য কেউই কোনও ল্যাবরেটরি কস্মিনকালে দেখিনি। খুব ভাবনায় পড়ে গেলুম। জিমটা এত বুদ্ধ আর ন্যালা-ভোলা, সেটাই ভাবনার কারণ ।
কদিন ধরে বিজ্ঞানী ভদ্রলোকের খোঁজে সারা শহর, মাঠ-ময়দান, বন-জঙ্গল, এমনকী এলাকার প্রায় সবটাই চষে বেড়িয়েছি। গোয়েন্দার মতো সূত্র খুঁজেছি। মেলেনি। আমাদের এই এলাকাটা অসমতল, এখানে-ওখানে ছোট-বড় টিলাও আছে। এমন একটা জায়গায় কাউকে খুঁজে বের করাও কঠিন। শেষে পুলিশে খবর দেওয়াই ঠিক করলুম।
থানায় যাব বলে তৈরি হচ্ছি সেই সময় রামু-ধোপা এল হাঁপাতে হাঁপাতে।–দাদাবাবু! শিগগির আসুন।
–কী হয়েছে, রামু?
রামু বলল, আমার গাধার অবস্থা দাদাবাবু! ঠিকঠাক গাধার অবস্থা।
বিরক্ত হয়ে বললুম,–ভ্যাট! কার গাধার অবস্থা বলবে তো?
–আজ্ঞে দাদাবাবু, আপনার কুকুরটার!
লাফিয়ে উঠলুম। –জিম? কোথায় জিম? ঝিলের জলে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
হুঁ, যা ভেবেছিলুম তাই। দৌঁড়ে বেরিয়ে গেলুম রামুর সঙ্গে। খেলার মাঠ পেরিয়ে ঝিলের ধারে পৌঁছে দেখি, ঝিলের জলের মধ্যিখানে চন্দ্রকান্ত আর জিম লুকোচুরি খেলছে। জলজ দাম আর শোলাগাছের ভেতর একটি দু-ঠেঙে এবং একটি চার-ঠেঙে প্রাণী ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। বিজ্ঞানী মাঝে-মাঝে শোলাঝোঁপের আড়ালে গুঁড়ি মেরে বলছেন, জিমি টু-কি!
