চুপ করে থাকলুম। গাধাটার চতুর্থ পায়ে জল-জুতো ঢুকিয়ে স্কু আঁটতে-আঁটতে বিজ্ঞানী ফের বললেন,–বলবেন, পাখিরাও তত মানুষের মতো দু-ঠেঙে। কিন্তু পাখিদের হাড় কঁপা। তাই ওজন হালকা। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাদের বাগে পায় না। যত সমস্যা খালি মানুষের।
বলে রামুকে উঠতে ইশারা করলেন। রামু তার গাধার ওপর থেকে সরে যেতেই গাধাটা ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। অমনি চন্দ্রকান্ত তার দুটো কান ধরে ফেললেন। বললেন,-রামু, পেছন থেকে ঠেলে দাও। শিগগির!
রামু ঠেলতে শুরু করল। চন্দ্রকান্ত প্রাণীটাকে জলের ধারে নিয়ে গেলেন। এরপর রীতিমতো একটা লড়াই বেধে গেল। গাধাটা কিছুতেই জলে নামবে না। প্রচণ্ড আপত্তি তার গলা দিয়ে বিকট হয়ে বেরোল। গাধার ডাক কাছ থেকে শোনা। বাপস!
চন্দ্রকান্ত আমার উদ্দেশ্যে বললেন,–ও মশাই! হাঁ করে দেখেছেনটা কী? হাত লাগান! এমন একটা বৈপ্লবিক কাজে সহযোগিতা করবেন না? আসুন, আসুন।
অগত্যা জিমকে নামিয়ে দিয়ে গাধাটার পেছনে যেতে হল। কিন্তু গাধাটা পেছনের ঠ্যাং ছুড়ছে, ব্যাপারটা বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই সাবধানে পাশ থেকে বরং কাতুকুতু দেওয়াই উচিত মনে করলুম এবং তাতে কাজ হল। গাধাটা আমার কাতুকুতুর চোটে মরিয়া হয়ে ঝাঁপ দেওয়ার ভঙ্গিতে জলে নেমে গেল।
না–নেমে গেল বলা ভুল। হেঁটে গেল। হাঁটতে গিয়ে রীতিমতো দৌড়তে শুরু করল। বিজ্ঞানী চেঁচিয়ে উঠলেন, খাসা! অপূর্ব! তোফা!
রামু একগাল হাসির সঙ্গে চ্যাঁচিতে থাকল, সোজা চলে যা বাপ! ওই দ্যাখ, কত্ত দাম! মনের সুখে পেট পুরে খা!
গাধাটা আশ্চর্য, এতটুকু অবাক হল না–তুই ব্যাটা স্থলচর প্রাণী হয়েও যে জলে দিব্যি হেঁটে যেতে পারছিস, তাও লক্ষ করছিস না? মনে-মনে বললুম, এ-জন্যই লোকে বলে গাধা!
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত পাইপ ধরাচ্ছিলেন। ঠোঁটের কোণায় গর্বের হাসি। জিম একবার জলচর গাধাটার দিকে, একবার চন্দ্রান্তের দিকে তাকাচ্ছে। ওর দুচোখে লোভ চনমন করছে। পড়ন্ত বেলায় বিশাল ঝিলের জলে লালচে রোদ্দুর ঝলমল করছে। খেলার মাঠ থেকে খেলুড়েদের আবার একটা হুল্লোড় ভেসে এল। তারপর দেখলুম, ফুটবলটা আবার আকাশ বেয়ে এসে ধপাস করে ঝিলের মধ্যিখানে পড়ল।
হাসতে-হাসতে বললুম, যান আবার ফুটবল কুড়িয়ে দিন।
চন্দ্রকান্ত বললেন,–ভাববেন না। ওই দেখুন, বলটা যাচ্ছে গাধাটার কাছে। আশা করা যায়, গাধাটা ওটার একটা সদগতি করবে।
করলও বটে। বলটা ভাসতে-ভাসতে কাছে যাওয়া মাত্র দামখেকো গাধাটা নিশ্চয় বিরক্ত হয়েই পেছনের ঠ্যাং দিয়ে কিক করল। অমনি বলটা হাইকিকে ফের খেলার মাঠে। আশ্চর্য! এতে খেলুড়েরা অবাক হল না? আবার পুরোদমে খেলতে শুরু করল।
বিজ্ঞানী মৌজ করে পাইপ টানছিলেন। বললেন, কী মশাই? আপনার কুকুরের জন্য জল-জুতোর প্রস্তাব দিয়েছিলুম। কী সিদ্ধান্ত করলেন, বলুন?
বললুম, কী দরকার? জিম তো জলজ উদ্ভিদ খায় না রামুর গাধার মতো! কাজেই ব্যাপার অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু আমি খালি একটা কথা ভাবছি।
–বলুন কী ভাবছেন?
–ভাবছি, আজকাল মানুষ অবাক হতে ভুলে গেছে। এটা ঠিক নয়।
–কেন বলুন তো?
–মানুষ অবাক হতে ভুলে গেলে পৃথিবীটা হয়তো আর আনন্দময় ঠেকবে । সব একঘেয়ে হয়ে যাবে।
বিজ্ঞানী মুচকি হেসে বললেন,–সেদিন বলেছি, আনন্দ-টানন্দ নিয়ে তর্ক করার মুড আর আমার নেই। কারণ আমি ক্রমশ সদানন্দ হয়ে আছি। কিছু বুঝলেন?
–উঁহু।
–বুঝবেন। কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন। আপনাকে আমি একজোড়া ডানা তৈরি করে দেব।
–বলেন কী।
–হুঁ। অসম্ভব সম্ভব হলে মানুষের মনে কী ভাব জাগে, সেটা আপনার টের পাওয়া দরকার। কারণ আমার ধারণা, আনন্দ বলতে ঠিক কী বোঝায়, আপনি জানেনই না!
এই সময় রামু বলে উঠল, আচ্ছা বাবুমশাই, আমার গাধাটা যদি ওখানে থেকেই যায় আর যদি বাড়ি না ফেরে?
চন্দ্রকান্ত চোখ কটমটিয়ে বললেন,–কেন এ কথা ভাবছ তুমি?
রামু চিন্তিত-মুখে বলল,-দেখুন না, দাম খাচ্ছে তো খাচ্ছে। ব্যাটাছেলের খেয়াল নেই, এখনই শুকুতে দেওয়া কাপড়-চোপড়ের বোঁচকা নিয়ে ওকে বাড়ি ফিরতে হবে।
চন্দ্রকান্ত বললেন,–ভেবো না। বরং আমার জল-জুতো জোড়া পরে জলে হাঁটার প্র্যাকটিস চালিয়ে যাও। নাও, পররা।
রামুকে জল-জুতো পরতে দেখে আমার কেন যেন রাগ হল। ভাবা যায়? রামু জল-জুতো পরে জলে হেঁটে তার গাধাটাকে খেদিয়ে আনবে! এ একটা বিদঘুঁটে অনাছিষ্টি ছাড়া কী? মুখ গোমড়া করে জিমকে তুলে নিয়ে কেটে পড়লুম।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললেন, আর দিনতিনেক অপেক্ষা করুন। আপনার ডানা পেয়ে যাবেন।
দুদিন পরে বিকেলে অভ্যাসমতো জিমকে নিয়ে ঝিলের ধারে বেড়াতে গেছি। দেখি, রামু মুখ চুন করে জলের ধারে বসে আছে। বললুম, কী রামু, তোমার গাধার খবর কী?
রামু চোখ মুছে বলল, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে দাদাবাবু! গাধাটা ডুবে মরেছে।
চমকে উঠে বললুম,–সে কী! ওর পায়ে তো জল-জুতো ছিল।
থাকলে কী হবে? রামু ভাঙা গলায় বলল।কাঁটা-খোঁচা লেগে কখন ছাদা হয়ে গিয়েছিল। সক্কালে ঝিলের মাঝখানে গেছে, অমনি হ্যাঁদা দিয়ে জল ঢুকে ভড়ভড় করে ডুবে তলিয়ে গেল।
–তোমার তৌ জল-জুতো আছে। দৌড়ে গিয়ে ওকে–
বাধা দিয়ে রামু বলল, সাহস হল না দাদবাবু! যদি এতেও ছাদা হয়ে থাকে? তাছাড়া তেমন পেরাকটিসও তো হয়নি। কসরতের ব্যাপার!
