একটু হেসে বললুম,–এরপর কবে দেখব, আপনি পাখির মতো সটান মাটি ছাড়া হয়ে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেন!
চন্দ্রকান্ত বললেন, কী বলছেন মশাই! সে তো সায়েবদের দেশে কবে শুরু হয়ে গেছে। এমনকী, গ্লাইডারে ওই তো এখন সেকেলে ব্যাপার হয়ে গেছে। না, না। প্যারাশুটের কথা বলছি না। বেলুনের কথাও না। পিঠে রুকস্যাকের মতো চৌকো বোঁচকা বেঁধে সটান পাখির মতো ওড়াউড়ি। বোঁচকাটার ভেতর থাকে ঠাসা হাইড্রোজেন গ্যাস। ইচ্ছেমতো কন্ট্রোল করার অসুবিধে নেই।
পা বাড়িয়ে বললুম,–দরকার নেই মশাই! দিব্যি আছি। ঝুটঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কী?
বিজ্ঞানী মন্তব্য করলেন, আপনি বড় সেকেলে।
ঝিলের ধারে হাঁটতে-হাঁটতে কিছুটা চলার পর ঘুরে দেখি, চন্দ্রকান্ত তাঁর জল জুতো বগলদাবা করে বাড়ির পথে এগিয়ে চলেছেন। মন তেতো হয়ে গেল। বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা? জল, মাটি, আকাশ এসবের সঙ্গে মানুষের যে স্বাভাবিক সম্পর্ক আছে, তা দুমদাম ভেঙে ফেলা উচিত হচ্ছে কি? নামোটরগাড়ি, বিমান, জাহাজের ব্যাপারে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু চন্দ্রকান্ত মাঝে-মাঝে যা-সব করছেন, তা অন্যরকম। একেবারেই আলাদা ধরনের। এই জল-জুতোর ব্যাপারটাই ধরা যাক। এটা যদি বাজারে চালু হয়ে যায়, আর নৌকো, জাহাজ, স্টিমার, লঞ্চ এসব জলযানের দরকার হবে না। কত শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। কত লোকের মুখের অন্ন যাবে। কোনও মানে হয়?…
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তকে তারপর থেকে এড়িয়ে চলাই উচিত মনে করেছিলুম। দূর থেকে ওঁকে দেখতে পেলে অন্য দিকে কেটে পড়ছিলুম। কিন্তু জিমের মতিগতি দেখে সন্দেহ জাগছিল। যখনই সে দূরে কোথাও ওই বিজ্ঞানী ভদ্রলোককে দেখতে পায় কেমন যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ওর কান টেনে দিয়ে বলি,–ওরে হতভাগা! বেশ তো চার ঠ্যাঙে নেচে কুঁদে বেড়াচ্ছিস। বেশি লোভ নয়। তুই যা, তাই থাক। তুই কি জল-মাকড়সা যে তরতর করে জলের ওপর দৌড়োদৗড়ি করবি?
জিম তবু বারবার মুখ ঘুরিয়ে চন্দ্রকান্তকে দেখতে থাকে।
একদিন খেলার মাঠে বসে আছি। জিম আমার বগলদাবা। ছেলেরা ফুটবল খেলছে। হঠাৎ ফুটবলটা জোরালো কিক খেয়ে ঝিলের জলের মধ্যিখানে গিয়ে পড়ল। খেলুড়েরা হইহই করে ঝিলের ধারে গেল। বলটা উদ্ধার না করলে খেলা বরবাদ। কেউ ঢিল ছুঁড়ে বলটাকে কাছে আনার চেষ্টা করতে থাকল। কেউ জাঙিয়া পরে জলের নামার জন্য তৈরি হল। এমন সময় ঝোঁপঝাড়ের ভেতর থেকে বিজ্ঞানীপ্রবরের আবির্ভাব ঘটল। ঝোঁপের ভেতর নিশ্চয় একটা কিছু করছিলেন। মনে হল, সেই গোপন কাজটা ফেলে আসায় একটু বিরক্তও হয়েছেন। বললেন, কী হল? এত হল্লা করছ কেন তোমরা? খেলা আর হল্লা এক জিনিস নয়, জানো না?
চন্দ্রকান্তকে সবাই খুব সমীহ করে চলে। তার একটা বড় কারণ, গত বছর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এশহরে এসে ওঁকে কী যেন একটা পদক-টদক দিয়ে গেছেন। বলে গেছেন,–এই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আমাদের দেশের গর্ব। জাতির গর্ব। যাই হোক, তারপর থেকে ভদ্রলোককে ছোট-বড় সব্বাই খাতির করে প্রচণ্ড খাতিরই বলতে হবে। এই ফুটবল-খেলুড়েদের বিদ্রূপনা আমার জানা আছে। তারা যে ইচ্ছে করেই কাদামাখা ফুটবল আমার দিকে পাঠায়, আমি কি বুঝি না? দেখলুম, চন্দ্ৰকান্তের সামনে সব্বাই নিরীহ কেঁচো বনে গেছে। একজন কঁচুমাচু মুখে বলল, জলে বল পড়েছে, স্যার!
শোনামাত্র চন্দ্রকান্ত ফিক করে হাসলেন, তাই বলো,–বলে সেই ঝোঁপটার ভেতর ঢুকে গেলেন। খেলুড়েরা হল্লা থামিয়ে ফের জলের দিকে ঘুরল! এরপর কী ঘটবে, একমাত্র আমারই জানা! চন্দ্রকান্তকে ফের দেখা গেল। জলের ওপর গটগট করে হেঁটে গিয়ে বলটি তুললেন এবং চমৎকার একটা কিকে সেটিকে মাঠে ফেরত পাঠালেন। ছেলেগুলো ব্যাপারটা দেখে প্রথমে বেজায় ভড়কে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের মন পড়ে আছে বলে। কাজেই বলটার দিকেই দৌড়ে গেল। আবার পুরোদমে খেলা চলতে থাকল। তখন বুঝলুম, চন্দ্ৰকান্তের অদ্ভুত সব কীর্তিকলাপ দেখে-দেখে সবাই এমনই অভ্যস্ত যে, এসব নিয়ে কেউ কথা ঘামাতে চায় না।
শুধু আমি বাদে। আমিই মাথা ঘামাই। চিন্তিত হই। মনে হয়, এত বাড়াবাড়ি ঠিক নয়। পৃথিবীটাকে এত ঝটপট অন্যরকম করে ফেলা উচিত হচ্ছে না।
কিন্তু ঝোঁপের ভেতর কী করছেন চন্দ্রকান্ত? ঝোঁপগুলো মাঝে-মাঝে নড়ে উঠছে। খুব সন্দেহজনক ব্যাপার। জিমকে বগলদাবা করেই উঠে পড়লুম। ছাড়া পেলে জিম বিজ্ঞানীপ্রবরের ঠ্যাঙের তলায় গিয়ে ঢুকবেই, যা বুঝতে পারছি ওর মতিগতি দেখে এবং একবার ওঁর খপ্পরে পড়লে আর উদ্ধার করাই যাবে না। একটা বশীকরণ ক্যাপসুল খাইয়ে দিলেই হল–কিছু বলা যায় না।
উঁকি মেরেই অবাক। ঝোঁপের ভেতর রামু-ধোপা তার গাধাটাকে শুইয়ে ওপারে গাট মেরে বসে আছে। বেচারাকে নড়তে-চড়তে দিচ্ছে না। আর চন্দ্রকান্ত প্রাণীটার চার ঠ্যাঙে সেই জল-জুতো পরাচ্ছেন।
না হেসে পারা গেল না। আমার হাসি শুনে বিজ্ঞানী মুখ ফেরালেন। বললেন, এই যে! আসুন, আসুন।
ফাঁকা জায়গায় ঢুকে বললুম, ব্যাপারটা কী?
রামু একগাল হেসে বলল, খুবই সুবিধে হবে দাদাবাবু, বুঝলেন?
-সুবিধেটা কীসের?
–আজ্ঞে দাদাবাবু, ঝিলের মধ্যিখানে কত দাম গজিয়ে আছে। এবার থেকে মনের সুখে সেখানে গিয়েও চরতে পারবে।
চন্দ্রকান্ত জল-জুতো পরাতে-পরাতে বললেন,–সেদিন আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়নি। সেটা হল, মানুষের চেয়ে আর সব প্রাণী জন্মের পর দ্রুত হাঁটতে শেখে কেন? না–তাদের চারটে করে ঠ্যাঙ আছে। চার-ঠেঙেদের ব্যালান্স আর দু-ঠেঙেদের ব্যালান্সে তফাত আছে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ব্যাপারটা আশা করি জানেন?
