আনমনে বললুম,–ডিকশনারি খুঁজে ভালো একটা নাম দেব। তুই ভাবিসনে।
সেদিন ছিল সোমবার। আমি গেলুম অফিসে। ডন গেল স্কুলে। বেড়ালটা আমার ঘরে রেখে গিয়েছিল ডন। বাটিতে যথারীতি দুবও রেখেছিল সে। অফিস থেকে আমার ফিরতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখি, ডন প্রচণ্ড হই চই বাধিয়েছে। দিদি ছেলেকে সামলাতে পারছে না। ব্যাপার কী?
পিঙ্কি আমাকে দেখে হাসতে হাসতে বলল,–জানো মামা কী হয়েছে? একটু আগে ভোঁদার পিসিমা এসেছিলেন। ডনের বেড়ালটা নাকি কখন ওঁদের বাড়ি গিয়ে ওঁর হুলোর সঙ্গে ভাব জমাতে চেয়েছিল। আর হুলো অমনি ডনের বেড়ালটাকে কামড়ে ধরে আছাড় মেরেছে। তারপর নখের আঁচড়ে ফালাফালা করে ফেলেছে। ওই দেখো না মামা! উঠোনে পড়ে আছে।
উঠোনের কোণে কালো একটা ন্যাতার মতো জিনিস দেখতে পেলুম। শুধু মুন্ডুটা ঠিকঠাক আছে এইমাত্র।
ডনকে কিছু বলার আগে ঘরে ঢুকে দুধের বাটিটা দেখতে গেলুম। আশ্চর্য ব্যাপার, বাটিতে একফোঁটা দুধ নেই। বাটিটা অবশ্য কাত হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু মেঝেতে দুধের কোনও চিহ্ন নেই।
হঠাৎ মনে হল, ভোঁদার পিসিমার হুলো বেড়ালটাই কি কাল সন্ধ্যায় এ ঘরে এসে দুধ সাবাড় করার পর ডনের বেড়ালটাকে বারান্দায় রেখে গিয়েছিল? হুলোই কি আজ দিনের বেলায় আবার এসে
নাহ। ভোঁদাদের বাড়ি এ বাড়ি থেকে দুটো বাড়ির পরে। হুলোর গায়ে এত জোর নেই যে একটা খেলনার বেড়াল অতদূরে বয়ে নিয়ে যাবে। তাছাড়া হুলো এ বাড়িতে এসে উৎপাত করত বলে মন্টু একটা ফাঁদ পেতেছিল এবং সেই ফঁদে হুলোর লেজের ডগা আটকে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত লেজের ডগাটুকু ফেলে হুলো প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে এ বাড়িতে আর তাকে দেখা যায় না।
কাজেই রহস্যটা থেকেই যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরে ডনের তাগিদে কালো বেড়ালের সেই ঘেঁড়াখোঁড়া মড়াটা নিয়ে আবার রথের মেলায় যেতে হল। কিন্তু সন্ন্যাসী চেহারার সেই দোকানদার তার দোকান গুটিয়ে চলে গেছে। রাগ করে ডন কালো বেড়ালের মড়াটা ঝিলের জলে ছুঁড়ে ফেলে বলল,-মন্টুটা আসুক! তারপর হুলোকে ফঁদে আটকে মুণ্ডু কেটে বলি দেব।
ওকে আশ্বাস দিয়ে বললুম,–হ্যাঁ। হুলোটাই তোর বেড়ালটাকে মেরে ফেলেছে।
কথাটা বললুম বটে, তবে ধন্দটা মনে থেকে গেল। আজও থেকে গিয়েছে।…
ভূত নয় অদ্ভুত
সেদিন বিকেলে আমার কুকুর জিমকে নিয়ে খেলার মাঠ ঘুরে ঝিলের ধারে ।যেতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। শুধু অদ্ভুত কেন, অসম্ভবই বলা উচিত। অথচ আমি চর্মচক্ষে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত কী আশ্চর্য! কী অবাক।
না, স্বপ্নও বলা যাবে না। কারণ আমি হেঁটে বেড়ানোর সময় ঘুমোব কেমন করে? এদিকে জিমও ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছে এবং আমার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ঝিলের জলের ওপর মার্চের ভঙ্গিতে হাঁটতে-হাঁটতে এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। মুখে মিটিমিটি হাসি! জয়ের হাসিই বটে। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, অসম্ভব! অসম্ভব!
বিজ্ঞানীপ্রবর ঝিলের জল থেকে কিনারার ঘাসে পা বাড়িয়ে বললেন,–বিজ্ঞান অসম্ভবকে সম্ভব করে। এটাই তার কাজ।
এতক্ষণে দৃষ্টি গেল ওঁর পায়ের দিকে। পায়ে গাবদাগোবদা কালো জুতো। বেটপ গড়নের এমন জুতো কোথাও দেখা যায় না। বললুম,–, বুঝতে পেরেছি। আপনার জুতোর ম্যাজিক।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত হাসতে-হাসতে বললেন,–ম্যাজিক বলতেও পারেন। কারণ সব ম্যাজিকই কোনও না কোনও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। তবে এই জুতোর সঙ্গে কিঞ্চিৎ ব্যালান্সের কসরতও জড়িত। সার্কাসে তারের ওপর হাঁটা নিশ্চয় দেখেছেন। সেইরকম আর কী! জুতো-জোড়া পরে জলে ব্যালান্স রেখে হাঁটা শিখতে আমার দিন সাতেক লেগেছে। আপনি চাইলে দিতে পারি।
ঝটপট বললুম, কী দরকার? জলে হাঁটার চাইতে মাটিতে হাঁটায় অনেক আরাম।
চন্দ্রকান্ত ঘাসে বসে পা থেকে কিম্ভুত গড়নের জুতদুটো খুলে ফেললেন। তারপর জিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, বরং ওর জন্য দু-জোড়া জল-জুতো তৈরি করে দেব। দেখবেন, একদিনেই জলের ওপর ছুটোছুটি করতে শিখে গেছে। কারণটা বুঝতে পারছেন তো? ওর শরীরটা আমার-আপনার চেয়ে অনেক হালকা।
জিমের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল, সে তার চারটে ঠ্যাঙের জন্য দু-জোড়া জল-জুতো পেলে ধরাকে সরা জ্ঞান তো করবেই, আমাকেও আর পাত্তা দেবে না। সে জল-জুতো দুটো শুঁকতে পা বাড়ালে ধমক দিলুম। তখন সরে এল। ঠ্যাং মুড়ে করুণচোখে তাকিয়ে রইল বিজ্ঞানী ভদ্রলোকের দিকে।
চন্দ্রকান্ত পাইপে তামাক ভরতে-ভরতে বললেন,–জিম আমার-আপনার বা যে-কোনও মানুষের চেয়ে জল-জুতো পরে হাঁটা অনেক আগে কেন শিখতে পারবে, তার কারণ আছে। মানুষ ছাড়া সব প্রাণীই জন্মের পর খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে শেখে। কিন্তু মানুষের দেরি লাগে। ওই যে বলে হাঁটি হাঁটি পা-পা!
বললুম, বুঝলুম। কিন্তু জলের ওপর হেঁটে লাভটা কী? জলের ওপর নৌকোয় চেপে যাওয়ার মতো আনন্দ পাওয়া যাবে কি? কিংবা ধরুন জলে ভাসা অর্থাৎ সাঁতার কাটারও একটা আনন্দ আছে। বিজ্ঞান যদি মানুষের জীবন থেকে এইসব আনন্দ কেড়ে নেয়, সেটা কি উচিত কাজ হবে?
বিজ্ঞানী পাইপে আগুন দিলেন। তারপর একরাশ ধোঁয়ার ভেতর বললেন, আবর্ণ ব্যাপারটা নিয়ে তর্ক করার মুড নেই। কারণ এখন আমি আনন্দের ভেতর বুঁদ হয়ে আছি। জলে হাঁটার যে কী আনন্দ, যে-মানুষ জলে হাঁটেনি, তাকে বোঝানো কঠিন।
