বললুম, কালু রাখতে পারিস। কিংবা কালুয়া। নাকি কাল্লু রাখবি?
–ভ্যাট! ওসব বিচ্ছিরি নাম। একটা ইংরিজি নাম বলো তো মামা?
–ব্ল্যাকি।
–না, না। সুন্দর নাম বলো!
–এখন কিছু মাথায় আসছে না। কাল রাখবখন। ঘুমিয়ে পড়।
ডন একটু ঘুমকাতুরে ছেলে। কিছুক্ষণের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু অস্বস্তিতে আমার ঘুম আসছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, বেড়ালটা যদি আবার কিছু করে বসে? যদি চুপি-চুপি মশারির ভেতরের ঢুকে আমার গলায় কামড় বসায়? ডনের দিকে যেন ওর দৃষ্টি নেই। ব্যাটাচ্ছেলের শুধু আমার দিকে চোখ। আর কী হিংস্র ওর চাউনি।
টর্চটা মাথার পাশে রেখে দিয়েছিলুম। একটু শব্দ শুনলেই টর্চ জ্বালব। তারপর যদি সত্যি ওই হতচ্ছাড়া বেড়ালটা কোনও কাণ্ড বাধায়, ওকে লাঠিপেটা করব। আগেভাগে তাই মন্টুর লাঠিটা এনে এ ঘরে বিছানার পাশে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রেখেছিলুম।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি। সেই ঘুম হঠাৎ কেন ভেঙে গেল জানি না। রাস্তার দিকের জানালা বন্ধ ছিল। শুধু বাড়ির ভেতরের দিকের একটা জানলা খোলা ছিল। ভেতরের বারান্দায় সারারাত একটা চল্লিশ ওয়াটের বালব জ্বলে। মশারির ভেতর থেকে সেই আলোটা আবছা দেখা যায়। কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখি ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। ফ্যানের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তার মানে লোডশেডিং। তারপর কানে এল বৃষ্টির শব্দ। বুঝতে পারলুম, ভ্যাপসা গরমের জন্যই ঘুম ভেঙেছে। তারপরই মনে পড়ে গেল বেড়ালটার কথা। অমনি মশারির একটা পাশ একটুখানি তুলে টর্চ জ্বাললুম। কিন্তু কী আশ্চর্য! বেড়ালটাকে দেখতে পেলুম না। অস্বীকার করছি না, সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠেছিল। এদিকের দুধের বাটিটা তেমনি রাখা আছে।
মাথা বের করে টর্চের আলো ফেলে দেখলুম, বাটিতে একটুও দুধ নেই। দেখামাত্র আতঙ্কে টর্চের সুইচ থেকে আঙুল সরে গেল। আবার ঘন অন্ধকারে ঘর ভরে গেল। বৃষ্টিটা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। মশারির ভেতর মাথা ঢুকিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলুম। মন্টুর লাঠিটা কী কাজে লাগাব ভেবেই পেলুম বা।
কতক্ষণ নিঃসাড় অবস্থায় শুয়ে থাকার পর হঠাৎ মরিয়া হয়ে উঠে বসলুম। ডনের ঘুম ভাঙানো যাবে না। তাছাড়া ওকে জাগিয়েই বা কী হবে? যদি বা ওকে জাগানো যায়, বেড়াল নেই শুনেই ও চ্যাঁচিমেচি শুরু করবে।
সাবধানে মশারি থেকে বেরিয়ে টর্চ জ্বেলে মন্টুর লাঠিটা নিলুম। তারপর ঘরের ভেতরে চেয়ার-টেবিল-খাট এবং বইয়ের র্যাকের তলায় আলো ফেলে বেড়ালটা খুঁজে দেখলুম। কোথাও বেড়ালটা লুকিয়ে নেই। তাহলে কি ভুতুড়ে কালো বেড়ালটা রাতদুপুরে সত্যি জ্যান্ত হয়ে দুধ সাবাড় করে পালিয়ে গিয়েছে?
দরজা খুলে বেরুতে সাহস হচ্ছিল না। খোলা জানালাটার কাছে গিয়ে বাইরে টর্চের আলো ফেললুম। বৃষ্টিটা এবার জোরালো হয়েছে। বৃষ্টির ছাটে বারান্দা ভিজে গিয়েছে। জ্যান্ত বেড়াল জলকে বেজায় ভয় পায়। কিন্তু এই বেড়ালটা তো ভূতুড়ে। কাজেই তার কথা আলাদা। এতক্ষণে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিল। তারপর শুরু হল মেঘের গর্জন। তার কিছু করার নেই। টর্চের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। যদি আচমকা ভুতুড়ে কালো বেড়ালটা পেছন থেকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে?
কথাটা ভাবামাত্র সব সাহস উবে গেল। ঝটপট মশারির ভেতর ঢুকে পড়লুম। লাঠিটা এবার বিছানায় আমার পাশেই রেখে দিলুম। আতঙ্কে আর ঘুম আসতে চাইছিল না। বৃষ্টির জন্য ভ্যাপসা গরমটা অবশ্য আর ছিল না।…
দিদির ডাকাডাকিতে চোখ খুলে দেখি, ভোর হয়ে গেছে। ডন তখনও বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। সাড়া দিয়ে বললুম, কী হয়েছে?
জানালার ওধার থেকে দিদি খাপ্পা মেজাজে বলল,–এসব তোরই কীর্তি। ডনের মাথায় যত দুষ্ট বুদ্ধি তুই-ই যোগাচ্ছিস।
মশারি থেকে বেরিয়ে বললুম,–আহা, হয়েছেটা কী বলবে তো?
দিদি বলল, পিঙ্কি কালো বেড়ালকে ভয় পায়। তাই তোরা মামা-ভাগ্নে মিলে রাত্তিরে কখন খেলনা-বেড়ালটাকে পিঙ্কির ঘরের দরজার সামনে রেখে এসেছিস। দরজা খুলেই পিঙ্কি ভয় পেয়ে কেঁদে-কেটে অস্থির।
বলে দিদি বাঁ-হাতে সেই কালো বেড়ালটা জানালা গলিয়ে ভেতরে ছুঁড়ে দিল। তারপর গজগজ করতে করতে চলে গেল।
অবাক হয়ে দেখলুম, সেই বেড়ালটাই বটে। টেবিলের পায়ার কাছে চার ঠ্যাং তুলে আছড়ে পড়েছে। দিদি ওটাকে রাগের চোটে এত জোরে ছুঁড়েছে যে বেচারার পেট ফেঁসে গিয়েছে এবং ভেতরে ঠাসা কয়েক টুকরো স্পঞ্জ বেরিয়ে পড়েছে।
দিনের বেলায় আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ডন জেগে ওঠার আগেই কালো বেড়ালটাকে তুলে নিয়ে ফাটা জায়গায় স্পঞ্জের টুকরোগুলো ঠেসে ঠিকঠাক করে দিলুম। লক্ষ করলুম পেটটা কালো সুতো দিয়ে সেলাই করা ছিল। সেই সুতো টেনে কোনওরকমে গিট দিয়ে রাখলুম। তারপর বেড়ালটাকে দুধের বাটির কাছে আগের মতো বসিয়ে দিলুম।
কিন্তু প্রশ্ন হল, বেড়ালটা এ ঘর থেকে পিঙ্কির ঘরের দরজার সামনে গেল কী করে? আর বাটির দুধই বা কে খেল?
মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলুম না। একটু পরে ডনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললুম,–তোর বেড়াল খিদের চোটে সবটুকু দুধ সাবাড় করেছে।
ডন ধড়মড় করে উঠে মশারি থেকে বেরিয়ে এল। তারপর আহ্লাদে আটখানা হয়ে বেড়ালটাকে খুব আদর করতে থাকল। বলল, মামা! আজই কিন্তু একটা ভালো ইংরেজি নাম চাই। নইলে কী হবে বুঝতে পারছ তো?
