তারপরই বিষ্টু ছেলের চিমটি খেয়ে উঃ! করে উঠল এবং করুণ মুখে বলল, লক্ষ্মী সোনা! অমন করে না। ছাড়! ছাড়! উঁহু! দিচ্ছি বাবা, দিচ্ছি।
ডনের দিদি আমার ভাগ্নি পিঙ্কি তার পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে বলল, মাথায় দুটো চটি লাগাতে পারছ না মা? যখনই পড়তে বসব, তখনই বাঁদরের বাঁদরামি শুরু হবে।
ডন মাকে ছেড়ে দিয়ে ফিক করে হেসে বলল, বাঁদর না দিদি, বেড়াল! যেমন-তেমন বেড়াল নয়, সাধুবাবার মন্তরপড়া বেড়াল।
পিঙ্কি চোখ পাকিয়ে বলল, দাঁড়া! বাবাকে আসতে দে। তারপর দেখাচ্ছি মজা!
ডন বেড়ালটা তার দিকে ছুঁড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করতেই সে চোখের পলকে ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে দিল। পিঙ্কি বেড়ালকে বড্ড ভয় পায়।
দিদি রান্নাঘর থেকে একটা ছোট্ট বাটিতে একটুখানি দুধ নিয়ে বেরুল। বলল, এই নে। তোর বেড়ালকে দুধ খেতে দিয়ে মামার কাছে পড়তে বোস। তোর বাবা বাড়ি ফিরে যদি দেখেন, এখনও তুই পড়তে বসিসনি, তাহলে তোর বেড়ালের অবস্থা কী হবে ঝতে পারছিস?
ডন লক্ষ্মীছেলের মতো এক হাতে সেই কালো বেড়াল আর অন্য হাতে দুধের বাটি নিয়ে সোজা আমার ঘরে গিয়ে ঢুকল। তারপর বলল,–মামা! আলো জ্বেলে দাও।
সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলুম। ডন বেড়ালটাকে মেঝের কোণে বসিয়ে তার মুখের কাছে দুধের বাটিটা রাখল। বললুম, ঠিক আছে। বেড়ালটার খিদে পেলে দুধ খেয়ে নেবে। আয়! তুই পড়তে বোস।
ডন আমার বিছানায় বসে পড়াশুনো করে। আমি চেয়ার টেনে তার কাছাকাছি বসে তাকে পড়াই। আজ সে এমনভাবে বসল যেন বেড়ালটাকে সে দেখতে পায়। আমাকেও চেয়ারটা একটু সরাতে হল।
বুঝতে পারছিলুম, ডনের মন বেড়ালটার দিকে পড়ে আছে। কিন্তু আমার অবস্থাও তা-ই। যতবার ঘুরে বেড়ালটার দিকে তাকাচ্ছি, কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। দোকানদারটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কালো রঙের অবিকল জ্যান্ত চেহারার বেড়ালটার উজ্জ্বল চোখদুটো হিংস্রভাবে যেন আমাকেই দেখছে। মনে হচ্ছে, এখনই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর।
কিছুক্ষণ পরে ডন বলল, দুধ খেল নাকি দেখে আসি মামা!
বললুম, খিদে পেলেই খাবে। তুই ও নিয়ে ভাবিসনে।
–না মামা! এতক্ষণে ওর খিদে পেয়েছে। মা একটুখানি দুধ দিল যে! ওইটুকু দুধে কি ওর পেট ভরে?
একটু ঝুঁকে দুধের বাটি দেখে নিয়ে বললুম, নারে! এখনও খায়নি। বরং এক কাজ করা যাক। ওর মুখটা দুধের বাটিতে গুঁজে দিই। তাহলে লোভের চোটে দুধটুকু খেয়ে ফেলবে।
ডন একটু ভেবে নিয়ে বলল, উঁহু! তুমি কিছু জানো না মামা! বেড়াল জিভ দিয়ে চেটে দুধ খায়। ভোঁদার পিসিমার হুলোকে দুধ খেতে দেখিনি বুঝি?
ঠিক এই সময় আচমকা লোডশেডিং হয়ে গেল। ডন ব্যস্তভাবে বলল, মামা! শিগগির নোম জ্বালো!
টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতি খুঁজে বের করলুম। তারপর দেশলাই জ্বেলে মোমবাতিটা সবে ধরিয়েছি, ডন একলাফে বিছানা থেকে মেঝেয় নেমে চেঁচিয়ে উঠল, মামা! মামা! আমার বেড়াল কই?
মোমবাতির আবছা আলোতে কালো বেড়ালটা দেখতে পেলুম না। দুধের বাটি যেমনকার তেমনি রাখা আছে। ঝটপট বিছানায় বালিশের পাশে রাখা টর্চ বের করে সুইচ টিপলুম। একপলকের জন্য চোখে পড়ল, এইমাত্র একটা কালো বেড়ালের লেজ দরজার বাইরে অন্ধকারে মিশে গেল।
ততক্ষণে ডন চ্যাঁচিমেচি জুড়ে দিয়েছে। দিদি লণ্ঠনহাতে রান্নাঘরের বারান্দা থেকে জিগ্যেস করছে, কী হল? কী হল? চ্যাঁচিচ্ছিস কেন?
আমি টর্চ জ্বেলে বারান্দায় গেলুম। তারপর দেখতে পেলুম বেড়ালটাকে। বারান্দায় একটা থামের কাছে বসে আছে। চোখদুটো টর্চের আলোয় আরও হিংস্র দেখাচ্ছে। থমকে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে থাকলুম।
ডন কিন্তু একটুও ভয় পেল না। ছুটে গিয়ে বেড়ালটাকে তুলে নিয়ে এল। তারপর তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, বুঝলে মামা? ওইটুকু দুধ দেখে রাগ হয়েছে। তাই রাগ করে পালিয়ে যাচ্ছিল।
সে ঘরে ঢুকে দুধের বাটিটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। বেড়ালটা তো জ্যান্ত বেড়াল নয় যে অমন করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে! এ তো একটা অসম্ভব ব্যাপার। অথচ আমি তার লেজের ডগা দেখেছি দরজার বাইরে।
নাকি আমার চোখের ভুল?
ঠিক আছে। কিন্তু বেড়ালটাকে বাইরে নিয়ে গেল কে? লোডশেডিংয়ের সুযোগে এ কাজ কেউ করতেই পারে। কিন্তু কে করবে? পিঙ্কি কালো বেড়ালকে ভীষণ ভয় পায়। দিদি ওদিকে রান্নাঘরে লণ্ঠন জ্বালতে ব্যস্ত ছিল। তাছাড়া দুরন্ত ছেলে ডনের বেড়াল নিয়ে তার মজা করার সাহসই নেই। ছেলের প্রতি দিদির অবশ্য মায়া মমতা বেশি। তাই তাকে প্রশ্রয় দেয়। ডনের বাবা খুব রাশভারী মানুষ। এখন তিনি অফিসার্স ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছেন। বাড়ি ফিরতে রাত নটা বেজে যাবে। বাড়ির কাজের লোক মন্টু ছুটি নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে গেছে। কাজেই বাইরের কেউ কক্ষনও বেড়ালটাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যায়নি।
সন্ন্যাসী চেহারার দোকানদার বলেছিল,–মন্তরপড়া বেড়াল। চোখে-চোখে রাখবেন। রাতবিরেতে হঠাৎ জ্যান্ত হয়।
ভ্যাট! ওসব গাঁজাখুরি কথা।
কিন্তু ধাঁধাটা থেকে গেল। সেইসঙ্গে অস্বস্তিও বেড়ে গেল।…
রাত্তিরে ডন শোয় পিঙ্কির কাছে। কিন্তু পিঙ্কি সে-রাতে ডনকে কিছুতেই কালো বেড়াল নিয়ে শুতে দেবে না। অগত্যা দিদি ছেলেকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমার ঘরে শুতে পাঠিয়েছিল। ডন আমার পাশে শুয়ে চাপাগলায় বলল, মা আমার বিড়ালের জন্য অনেকটা দুধ দিয়েছে, মামা! দেখবে, আর ও পালাবে না। রাত্তিরে ওর আরও খিদে পাবে তো? পেট ভরে গেলে তখন ঘুমিয়ে পড়বে। আচ্ছা মামা! ওর একটা সুন্দর নাম বলো না?
