বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরুলে একটা ঘাসে ঢাকা পোড়ো-জমি। তারপর ভোঁদাদের সেই আমবাগান। বাগানের পাশ দিয়ে পায়ে-চলা পথটায় একটু-আধটু জলকাদা আছে। তবে কিনারার ঘন ঘাসে পা ফেলে সাবধানে হাঁটলে জলকাদা এড়ানো যায়। ডনের বুদ্ধির প্রশংসা করা উচিত। এভাবে একটু ঘুরপথে গেলে মেলার দূরত্ব অবশ্য বেড়ে যায়। তা যাক। বৃষ্টিধোয়া সবুজ গাছপালা, পাখির ডাক, রংবেরঙের প্রজাপতির খুশি-খুশি নাচানাচি দেখতে-দেখতে রথের মেলায় যাওয়ার চেয়ে কাঠমাণ্ডুতে কাটামুণ্ডু বেজায় বিচ্ছিরি ব্যাপার!
বুড়োশিবের মন্দিরের দিকটায় জলকাদার বালাই নেই। বাঁধানো চত্বরের পর খেলার মাঠ। সেই মাঠের একধারে মেলা বসেছে। ভিজে ছপছপে ঘাসের ওপর প্রতিদিনের মতো ছেলেরা ফুটবল খেলছে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলুম। ডন তাড়া দিয়ে বলল, দেরি হয়ে যাচ্ছে মামা। এখন কি খেলা দেখার সময়?
বললুম,–নারে! যদি ওদের বলটা এসে গায়ে পড়ে? প্যান্টশার্ট নোংরা হয়ে যাবে যে!
ভ্যাট! তুমি কিছু জানো না! এবার আমরা ঝিলের ধারে ওই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাব। –ডন আমার হাত ধরে টানল। উৎসাহে হাঁটতে-হাঁটতে সে বলল, রামুবোপা ঝিলের জলে কাপড় কাঁচে জানো তো মামা?
–জানি বইকী।
–রামু আর তার গাধাটা হেঁটে-হেঁটে কেমন সুন্দর রাস্তা করেছে দেখবে চলো।
–তুই সেই রাস্তায় গিয়েছিলি বুঝি?
–হ্যাঁ। নইলে আমাকে মাঠে দেখতে পেলেই ভোঁদা জোর করে গোলকিপার করত যে!
ঝোঁপজঙ্গলের ভেতর ঢুকে লক্ষ করলুম, রামু ধোপা বিকেলে এই চমৎকার রোদ্দটা পেয়ে কাঁচা কাপড়গুলো শুকিয়ে নিচ্ছে। তার গাধাটা ঝিলের ধারে মনের আনন্দে ঘাস খাচ্ছে।
যাই হোক, জলকাদা বাঁচিয়ে অবশেষে মেলার ভিড়ে পৌঁছলুম। ডন আমাকে একটা দোকানের সামনে নিয়ে গেল। দোকানটা আসলে তেরপল ঢাকা ছোট্ট একটা তাঁবু। ভেতরে নানারকম জন্তুর পুতুল। না–পুতুল বলা হয়তো ঠিক হচ্ছে না। কারণ খুদে জন্তুগুলো দেখতে অবিকল আসল জন্তুর মতো। খরগোশ, কাঠবেড়ালি, কয়েকরকম পাখি, গিরগিটি, ফণাতোলা সাপ, ব্যাঙ, কুকুরছানা এইসব। সেগুলোর মধ্যে একটা কালো বেড়াল জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে। দেখার মতো গোঁফও আছে। একেবারে আসল বেড়ালের সাইজ।
মাথার সন্ন্যাসীদের মতো চুড়ো করে বাঁধা চুল, মুখে একরাশ গোঁফ-দাড়ি, তেমনি কুচকুচে কালো একটা লোক এই দোকানের মালিক। ডনকে দেখেই সে হাসল,–তাহলে বেড়ালটা দেখছি তোমার খুব পছন্দ হয়েছে খোকাবাবু! কিন্তু দশ টাকার কমে বেচব না।
ডন বুকপকেট থেকে টাকাগুলো বের করে তাকে দিতে যাচ্ছিল। আমি বললুম, কই, আগে বেড়ালটা দেখি।
সন্ন্যাসী চেহারার দোকানদার বলল,–খোকাবাবু আপনাকে সঙ্গে এনেছে বুঝি? ভালো। আমি কাকেও ঠকাইনে বাবু! এ বেড়াল যেমন-তেমন বেড়াল নয়। জ্যান্ত বললেও ভুল হয় না।
বলে সে কালো বেড়ালটা আমাকে দিল। সত্যি বলতে কী, ওটা হাতে নেওয়ামাত্র মনে হল, যেন আসল জ্যান্ত বেড়াল। তেমনি নরম তুলতুলে শরীর। লেজটাও নড়ছে। চমৎকার বানিয়েছে তো!
ততক্ষণে ডন দশটা টাকা দোকানদারকে দিয়ে ফেলেছে। একটু দরাদরি করার সুযোগ পেলুম না। দোকানদার একগাল হেসে টাকাগুলো কপালে ঠেকিয়ে ফতুয়ার ভেতর ভরল। তারপর বলল, মাত্র দশ টাকায় বেচে লোকসানই হল বাবু! কিন্তু কী আর করা যাবে? কালো বেড়াল অলক্ষুণে বলে কেউ কিনতে চায় না। এই খোকাবাবুর যেমন চোখ আছে, তেমনি সাহসও আছে বটে। তাই দশ টাকায় বেচতে চেয়েছিলুম। তবে খোকাবাবুকে বলছি, আপনাকেও বলছি, বেড়ালটা একটু চোখে চোখে রাখবেন।
জিগ্যেস করলুম,–কেন বলো তো?
দোকানদার চাপাগলায় বলল,-মম্ভরপড়া বেড়াল। রাতবিরেতে হঠাৎ জ্যান্ত হয়। বুঝলেন তো?
ওর কথা শুনে হেসে ফেললুম। বলল কী হে! নকল বেড়াল জ্যান্ত হয়। তোমার মন্তরের এত জোর?
সে চোখ টিপে বলল, হাসবেন না বাবু! খোকাবাবুকে বলবেন, যেন সাবধানে রাখে।
ডন আমার হাত থেকে বেড়ালটা কেড়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল পথে যেতে যেতে বললুম,–ডন! লোকটা তোকে রামঠকানো ঠকিয়েছে জানিস? আমার মনে হল, ভেঁড়া তোয়ালেতে কালো রং মাখিয়ে ভেতরে স্পঞ্জ ঠেসে বেড়ালটা তৈরি করেছে। গোঁফ আর চোখদুটো প্লাস্টিকের না হয়ে যায় না। মুখে একটু লালচে রং মাখিয়ে দিয়েছে। ব্যস!
ডন আমার কথায় কান দিল না। হঠাৎ আমাকে ফেলে দৌড়তে শুরু করল। ওর পিছনে আমাকে দৌডুতে দেখলে লোকেরা কী ভেবে হয়তো হইচই বাধাবে। তাই ধীরেসুস্থে হাঁটছিলুম।…
বাড়ি ফিরে দেখি, ডন বেড়ালটাকে দুধ খাওয়াবে বলে রান্নাঘরের দরজায় প্রায় কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। বললুম, কী রে? তুই ওটাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য অমন দৌড়ে চলে এলি? বোকা ছেলে! নকল বেড়াল কি দুধ খেতে পারে?
দিদি রেগে গেল আমার ওপর। তুই যত নষ্টের গোড়া! তোর পাশ্লায় পড়ে ও গোল্লায় যেতে বসেছে। না পড়াশুনো, না কিছু। যা বায়না ধরবে, তা মেটানোনা চাই-ই। যেমন গুণধর মামা, তেমনি গুণধর ভাগ্নে।
বললুম, যা বাবা! আমি কী করলুম?
–করলুম মানে? বেড়াল কেনার কথা তুই-ই ওর মাথায় ঢুকিয়েছিস।
বেগতিক দেখে বললুম,–ঠিক আছে। তা দাও না একটুখানি দুধ। পাথরের গণেশ যদি দুধ খেতে পারে
দিদি অমনি কপালে হাত ঠেকিয়ে নমো করে বলল,–এই সন্ধ্যাবেলা দেব দেবতার নামে যা-তা বলবি নে বলে দিচ্ছি। আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছিলুম জানিস?
