বলে ধনাদা দুম করে এক কিল মারলেন থলের ওপর। অমনি থলেটা লাফিয়ে উঠল। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,–পালাবে! পালাবে!
থলেটা ঘরের ভেতর লাফ দিতে শুরু করল। ধনাদার হাত ফস্কে গেল। দরজার কাছে এগোতেই কাজল দরজা বন্ধ করে দিল। নান্তু কিক ঝাড়ল সঙ্গে সঙ্গে। থলেটা ঘরময় লাফালাফি জুড়ে দিল। আমরা তার ওপর সমানে কিক ঝাড়তে থাকলাম। তারপর ধনাদা ওটার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ধরে ফেললেন এতক্ষণে! হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,–চল। ব্যাটাকে ধাপায় পুঁতে রেখে আসি…।
ধাপা অনেকটা পথ। কিন্তু গোবর্ধনবাবুর ফুটবল সারা পথ চুপ করে রইল বেগতিক দেখেই।
ধাপায় পৌঁছে কাজল একটা ছুরি দিয়ে গর্ত খুঁড়তে শুরু করল। খোঁড়া হলে সে থলেসুষ্ঠু ফুটবলটা গর্তে ফেলতে যাচ্ছে দেখে ধনাদা আঁতকে উঠলেন। আরে করিস কী? করিস কী? এটা আমার রেশন আনবার থলে। আড়াই টাকা দাম। বরং মুখটা ফঁক করে গলিয়ে দে।
কিন্তু দড়ি খোলার সঙ্গে-সঙ্গে ঘটল আরও উদ্ভট ব্যাপার। কোথায় ফুটবল। একটা কালো বুনো বিড়াল লাফ দিয়ে বেরিয়ে গেল? তারপর বাই বাই করে দৌড়ে গিয়ে একটা আবর্জনার ঢিবিতে উঠে থামল এবং আমাদের দিকে ঘুরে-ঘুরে জুলজুলে হলুদ চোখে তাকিয়ে দাঁত বের করে ধমক দিল, মা-ও-ও। তারপর আর তার পাত্তা পাওয়া গেল না। ধনাদা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হতাশ-ভঙ্গিতে বললেন,–এবারও ফস্কে গেল!
কাজল ফোঁস করে বললেন, ধুস! ছিল ফুটবল, হয়ে গেল বেড়াল। কোনও মানে হয়?
ভুতুড়ে বেড়াল
আমার ভাগ্নে ডন যেমন বিছু তেমনি খেয়ালি ছেলে। তার কীর্তিকলাপ নিয়ে এ যাবৎ অনেক গল্প বলেছি। কিন্তু এবার যে গল্পটা বলছি, সেটা ভারি অদ্ভুত আর রহস্যময়। এ যাবৎ আমি নিজেই এই ঘটনার মাথামুকিছু বুঝতে পারিনি। একটা ব্যাখ্যা অবশ্য করেছিলাম। কিন্তু সেটা নেহাত মনগড়া।
আষাঢ় মাস। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক পশলা বৃষ্টির পর বিকেলে মেঘ কেটে আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই মফস্বল শহরের রাস্তার অবস্থা হয়ে গেছে শোচনীয়। খানাখন্দে জল জমেছে। তোবড়ানো পিচের সঙ্গে কাদা আর পাথরকুচি এমন মিলেমিশে গেছে যে পা ফেললেই আছাড় খাওয়ার সম্ভাবনা। তার ওপর নানারকম যানবাহনের উৎপাত তো আছেই। আচমকা রাস্তার নোংরা জল পিচকিরির মতো ছিটকে এসে জামাকাপড় বিচ্ছিরি করে ফেলবে।
এ অবস্থায় রোজকার মতো বেড়াতে বেরুনোর ইচ্ছে চেপে রাখতেই হল। বরং তার চেয়ে চুপচাপ বসে গোয়েন্দা উপন্যাস পড়াই ভালো। র্যাক থেকে তাই কাঠমাণ্ডুতে কাটামুণ্ডু নামে একখানা বই টেনে নিলুম।
সবে বইটার পাতা খুলেছি, হঠাৎ পিঠের দিকে জোরালো চিমটি খেয়ে উঃ। করে উঠলুম। তারপর খাপ্পা হয়ে ঘুরে দেখি শ্রীমান ডন নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রেগেমেগে বললুম,-থাপ্পড় খাবি বলে দিচ্ছি কিন্তু। তোকে বলেছি না, কিছু বলার থাকলে সামনে এসে বলবি। এমনি করে পেছন থেকে কক্ষনও চিমটি কাটবি নে।
ডন আমার হুমকি গ্রাহ্য করল না। তেমনি নির্বিকার মুখে বলল, রথের মেলা দেখতে যাব!
–যাবি তো যা। আমাকে চিমটি কাটছিস কেন?
–তুমি আমাকে নিয়ে যাবে।
–কালই তো নিয়ে গিয়েছিলুম। রোজ-রোজ মেলায় গিয়ে নতুন আর কী দেখবি?
একটা বেড়াল কিনববলে ডন আমার হাতের বইটা চেপে ধরল।
বুঝলুম এবার কাঠমাণ্ডুতে কাটামুণ্ডুর আর রক্ষে নেই। তাই মুখে হাসি ফুটিয়ে বললুম, কালই তো তোকে একটা রথ আর একটা বাঘ কিনে দিয়েছি। ছ্যা-ছ্যা! বাঘের পাশে বেড়াল রাখবি তুই?
ডন হাসল না। বই থেকে হাত সরাল না। নির্বিকার মুখে বলল,–ভোঁদা বলল বেড়াল বাঘের মাসি। মাসিকে না দেখতে পেলে বাঘ রেগে যাবে। মামা! তুমি শিগগির ওঠো। দেরি করলে কী হবে জানো তো?
বইটা আরও জোরে সে আঁকড়ে ধরল। অগত্যা আমাকে উঠে পড়তে হল। বললুম, ঠিক আছে। চল, যাচ্ছি। এবার লক্ষ্মীছেলের মতো বই থেকে হাত সরিয়ে নে।
–বেড়ালটার দাম দশ টাকা, মামা! মা দিয়েছে তিন টাকা। দিদি দিয়েছে দু টাকা।
–হুঁ। আমাকে বাকি পাঁচ টাকা দিতে হবে। কিন্তু দশ টাকা দাম, কে বলল তোকে?
–আমি এক্ষুনি রথের মেলা থেকে আসছি?
–বলিস কী রে? এই জলকাদায় তুই গেলি কী করে? তোর জুতোয় তো একটুও কাদা দেখছি নে!
–ভোঁদাদের আমবাগান দিয়ে বুড়োশিবের মন্দিরতলা দিয়ে—তারপর–
–বুঝেছি, বুঝেছি! এবার বইটা ছাড়!
–আগে তুমি পাঁচটা টাকা দাও।
টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা পাঁচ টাকার নোট ওর হাতে দিলুম। তখন ডন বই থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর হঠাৎ ফিক করে হেসে বলল, তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে যাবে মামা!
–কেন? যেমন একা গিয়েছিলি তেমনি একা চলে যা। বেড়াল কিনে নিয়ে আয়।
ডন চোখ বড় করে বলল,–মেলা থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে না? বুড়োশিবের মন্দিরের কাছে জটাবাবা থাকে। তারপর জানো তো মামা? ভোঁদাদের আমবাগানে কন্ধকাটা থাকে। কন্ধকাটা বাগান পাহারা দেয়। নইলে সব আম চুরি হয়ে যেত। ভোঁদা বলছিল। আর জানো মামা?
কথা বাড়াতে না দিয়ে বললুম, চল, বেরুনো যাক।
আসলে এমন সুন্দর রোদ্দুরে ঝলমল করা বিকেলটা ঘরে বসে বই পড়ার চেয়ে বাইরে কাটানোর সুযোগ ডনই তো এনে দিয়েছে। তা সে চিমটি কেটেই হোক বা পাঁচটা টাকা নিয়েই হোক। তাই শেষপর্যন্ত ডনের প্রতি খুশি হয়েছিলুম।
