–বেশ! চলে আসুন। চশমা পেয়ে যাবেন।
আমি গোপনে যাব, স্যার! –তারাপদ বকসী চাপা গলায় বলল। গিয়ে আপনার জানালায় টোকা দেব। আপনি যেন দয়া করে জেগে থাকবেন।
–জানালা খোলা থাকে আমার ঘরে।
–এটা উচিত নয়, স্যার। বিস্তর খারাপ লোক আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায় আজকাল!
–ঠিক আছে। বলছেন যখন বন্ধ করে দেব। আপনি আসুন।
ফোন রেখে মুরারিবাবুর গুম হয়ে বসে রইলেন মিনিট দুই। মুহুর্মুহু গা শিউরে উঠল। এতক্ষণ একজন ভূতের সঙ্গে কথা বলছিলেন ভেবেই।
তারপর ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে জানালাগুলো বন্ধ করে দিলেন। একটু পরে ঝমঝম করে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। বর্ষার রাত। তাছাড়া এবার বর্ষাটা বড্ড বেশি রকমের। কিন্তু তারাপদ বকসীর আসবার নাম নেই। ভুতুড়ে চশমা ভূতের হাতেই চলে যাক, তাতে ক্ষতি মাত্র গোটা পঁয়তাল্লিশ টাকা। মাঝখান থেকে চর্মচক্ষে ভূতদর্শন হয়ে গেল। মন্দ কী! এখন সবকথা জানার পর দরকার খানিকটা সাহস। ভয় পেলে চলবে না।
আবার ফোন বাজল ক্রি-ক্রিং করে। তারাপদ বকসী এ রাতে আসতে পারবে না বলবে নাকি? কে জানে, আনাচে কানাচে পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে বলছিল।
কাঁপা-কঁপা হাতে ফোন তুলেই বললেন,–তারাপদবাবু নাকি?
ফোনের ভেতর ভারিক্কি গলায় ভেসে এল, আপনি কি তারাপদ বকসীর কথা বলছেন।
–হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে?
–বউবাজার থানা থেকে বলছি। আপনার তাহলে তারাপদর সঙ্গে যোগাযোগ আছে?
–না–মানে–
–মানে-টানে আবার কী। শুনুন মুরারিবাবু! আমাদের কাছে খবর আছে, ১৯৭৮ সালের ২১শে জুলাই তারিখে বউবাজার এলাকায় ইং চুং সায়েবের দোকানে যে ডাকাতি হয়েছিল, সে ব্যাপারে আপনার কাছে একটা মূল্যবান এভিডেন্স আছে।
–বুঝেছি। চশমাটার কথা বলছেন তো?
–হ্যাঁ। শুনুন, এখনই আমরা যাচ্ছি আপনার কাছে। সাবধান, চশমাটা যেন কাউকে দেবেন না। আমরা খবর পেয়েছি, তারাপদ ওটা চুরির মতলবে ঘুরছে? আপনার কাছে চাইতেও যেতে পারে। আপনি যা ভালোমানুষ, বলা যায় না কিছু।
মুরারিবাবু বিব্রতভাবে বললেন,–আচ্ছা, আচ্ছা।
–আচ্ছা-টাচ্ছা নয়। আমরা যাচ্ছি।…
ফোন রেখে মুরারিবাবু আবার গুম হয়ে গেলেন। বেচারা তারাপদ বকসীর তো কোনও দোষ নেই। ছুরি দেখিয়ে ডাকাতরা ওকে বাধ্য করেছিল ট্যাক্সি নিয়ে যেতে! খামোকা পুলিশ হয়রান করবে ওকে।
কিন্তু তারাপদকে চশমা দিলে পুলিশ এসে তাঁকেই হয়রান করবে। কে জানে এ পুলিশ কোন পুলিশ? ভূত-পুলিশ, নাকি শুধু পুলিশ। পুলিশ বলেই মনে হচ্ছে।
বাইরে বৃষ্টি ঝরছে সমানে। একটা জানালা খুলেই বন্ধ করে দিলেন মুরারিবাবু। বৃষ্টির ছাট আসছে। ঘরের ভেতর টেবিল ল্যাম্প জুলছিল।
হঠাৎ সেটা নিভে গেল। ফ্যানও বন্ধ হয়ে গেল। লোডশেডিং।
অন্ধকারে টেবিলের ড্রয়ার হাতড়ে একটা মোমবাতি পাওয়া গেল। এত রাতে হরির ঘুম ভাঙানো কঠিন। একটা হ্যারিকেন হলেই ভালো হতো! মোমবাতিটা বড় ছোট আর লিকলিকে।
মোমবাতিটা সবে জ্বেলেছেন, বাইরে খটখটঝুপঝাঁপ জুতোর শব্দ শোন গেল। তারপর দরজার কড়া নাড়ার শব্দ। তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন মুরারিবাবু। চেয়ারের ডগায় মাথা লাগল। বেশ জোর লাগল। ককিয়ে উঠলেন।
তারপরই কানের কাছে নুকুরের চিৎকার শুনতে পেলেন, দাদু! দাদু!
চোখ খুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন মুরারিবাবু। তার মুখের সামনে মুকু, নুকুর বাবা, নুকুর মা এবং কোলে সেই চশমা-কাড়া বিচ্ছু খোকাটা, এবং হরিও দাঁত বের করে আছে।
ব্যাপারটা কী? মুরারিবাবু মুখটা একটু তুলেই অবাক হলেন। এ কোথায় শুয়ে আছেন তিনি? এ তো হাসপাতাল বলে মনে হচ্ছে।
আর তার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে ব্যান্ডেজ, পায়ে ব্যান্ডেজ।
সঙ্গে-সঙ্গে মাথার ভেতরটা কেমন করে উঠল। নুকু বলল, দাদু, চোখ খোলো। আমরা তোমাকে দেখতে এসেছি। ট্যাক্সিতে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে তুমি মরে গিয়েছিলে যে?
তবে তাই। লম্বা নাক, কুতকুতে চোখ, মাথার ওপর কাঠিকাঠি চুল–একটা লোকের ট্যাক্সিতে চেপে চশমা করাতে যাচ্ছিলেন মনে পড়ছে। কিন্তু কখন অ্যাক্সিডেন্টটা হল। কিছুতেই মনে পড়ছে না। যাইহোক, ট্যাক্সিতে ওঠার পর বাকিটা তাহলে ধাক্কা খেয়ে চোখের মতোই মগজ পরিষ্কার হওয়ার ফল। সময়ের উজানে চলে গিয়েছিলেন। খিকখিক করে হেসে উঠলেন মুরারিবাবু। তাকে হাসতে দেখে সবাই অবাক। উদ্বিগ্নও। পাগল হয়ে যাবেন না তো?
.
চার
না। আঘাত তত গুরুতর হয়নি। মাস তিনেকের মধ্যে মুরারিবাবু আগের মতো চলাফেরা করতে পারছেন। তবে ভারি আশ্চর্য একটা ব্যাপার ঘটে গেছে, বিনা চশমায় দিব্যি বইপত্র পড়তে পারছেন এবং দূরের সবকিছুই দেখতে পারছেন।
তারাপদ বকসী বলেছিল বটে, এক ধাক্কাতেই চোখ পরিষ্কার। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি চেয়ে মোড় অবধি গেছেন, আচমকা লরির ধাক্কা। ট্যাক্সিওলা বেচারা নাকি মারা গেছে।
যে আগেই মরে গিয়েছিল, দ্বিতীয়বার তার মরা না মরা সমান।
এরপর একদিন মুরারিবাবু রাস্তার মোড়ে গেছেন ট্যাক্সি ধরতে। ভবানীপুরে ভাগ্নে শ্রীমান মুকুলের বাড়ি যাবেন। কিন্তু বাসে বেজায় ভিড়। ট্যাক্সিও পাচ্ছেন না। হঠাৎ দেখতে পেলেন একটা খালি ট্যাক্সি আসছে। হাত দেখাতেই ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে গেল।
অমনি মুরারিবাবু দেখলেন সেই লম্বা নাক, কুতকুতে চোখ, মাথায় কাঠি-কাঠি চুল–তারাপদ বকসী আঁতকে এসে বললেন,–না, না। যাব না।
