এক ভদ্রলোক ট্যাক্সির জন্য তাক করছিলেন। তিনি তক্ষুনি উঠে পড়লেন। মুরারিবাবু বারণ করার আগেই ট্যাক্সিটা বেরিয়ে গেল। সেই নম্বর। ডব্লিউ বি টি ৯৯৯৯। যাকগে। আরেকজনের মগজ সাপ হয়ে যাবে ধাক্কা খেয়ে। এই কলকাতায় এমন কত ট্যাক্সি আর কত তারাপদ বকসী কত ঘুরে বেড়াচ্ছে সঙ্গে পুলিশ। মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। তবে মুরারিবাবু কৃতজ্ঞ বইকী। এক ধাক্কায় তাঁর চোখ পরিষ্কার হয়ে গেছে। আর চশমাও লাগে না।…
ভুতুড়ে ফুটবল
সেদিন বাড়ির রোয়াকে বসে কজন মিলে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে রীতিমতো হই-চই বাঁধিয়েছি, হঠাৎ কোত্থেকে একটা ফুটবল এসে দমাস করে মাঝখানে পড়ল। তারপর ফুটবলটা ডিগবাজি খেয়ে লাগল গিয়ে একেবারে ধনাদার গায়ে। ধনাদা সবে সেজেগুজে অফিসে বেরুচ্ছেন। ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবিতে একটা দাগড়া কালো ছোপ ফেলল। তবে সেটাও বড় কথা নয়, ধনাদা ধরাশায়ী হয়ে চেরাগলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ধর! ধর! ধর ব্যাটাকে।
আমরা হকচকিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম। কিন্তু খেলোয়াড়দের দেখতে পেলাম না। গলিটা মোটামুটি চওড়া। এমাথা থেকে ওমাথা অবধি পরিষ্কার দেখা যায়। বলটা তাহলে এল কোত্থেকে?
ধনাদা উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে এলেন, ধরতে পারলিনে বলটা? কী রে তোরা!
আমরা হেসে ফেললাম। মিঠুন বলল, আপনি বলটা ধরতে বলছিলেন? আমরা ভাবলাম…
কথা কেড়ে ধনাদা দাঁত খিঁচিয়ে বললেন,–ওয়ার্থলেস! তোরা এতগুলো গাঁট্টাগোট্টা ছেলে থাকতে ব্যাটা ফের ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়ল!
আমি বললাম,–কেটে পড়বে কোথায়? দাঁড়ান, খুঁজে দিচ্ছি।
ধনাদাকে ধরাশায়ী করে বলটা আবর্জনার গাদা ভর্তি একটা টিনের টবে পড়েছে দেখেছি। তাই দৌড়ে টবটার কাছে গেলাম। কিন্তু কোথায় বল?
ধনাদা বেজার মুখে বললেন,-নেই ফের হাওয়া হয়ে গেছে। হবেই, সে তো জানা। ঠিক আছে! আমারও নাম ধনপতি শর্মা! একদিন না একদিন খপ করে ব্যাটাকে ধরে ফেলবই। তারপর ফাটিয়ে ছাড়ব। আমার সঙ্গে ফড়ি!
আমরা অবাক হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম। ধনাদার কথাবার্তা শুনে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। ধনাদা বাড়ি ঢুকে একটু পরে জামা বদলে বেরুলেন এবং গম্ভীরমুখে চলে গেলেন।
নান্তু বললে, কিছু বোঝা গেল না। আয় তো বলটা খুঁজে দেখি। নিশ্চয় হারাধনের ঘরে গিয়ে ঢুকেছে।
হারাধন ধোপর ঘর আবর্জনার টবের ওপাশে। জামাকাপড় ইস্তিরি করছিল। আমাদের কথা শুনে আঁতকে উঠে ইস্তিরি, টেবিলের আশপাশ, তলা তন্নতন্ন করে খুঁজল। ঘরভর্তি ধোয়া কাপড়-চোপড়। ময়লামাখা একটা ফুটবল সেখানে ঢোকা ভালো নয়।
কিন্তু কোথায় বল? পাশের মুদি দোকান, সন্দেশের দোকান, দর্জির দোকান সবখানে খুঁজেও পাত্তা মিলল না, আশ্চর্য! ফুটবলটা কি শুন্যে উবে গেল? আমাদের জেদ চড়ে যাচ্ছিল। আশেপাশে প্রত্যেকটা বাড়ি খুঁজে তোলপাড় করলাম। কোথাও বলের হদিশ পাওয়া গেল না। কেউ ওটা লুকিয়ে রেখে আমাদের মিথ্যা কথা বলবে বলে মনে হয় না। পাড়ায় আমাদের এই দলটার ভীষণ দাপট!
শেষে অনি বলল, ধ্যাৎ! ছেড়ে দে। মনে হচ্ছে, গড়িয়ে গিয়ে যেভাবে হোক, হাইড্রেনের তলায় চলে গেছে।
কথাটা মনে ধরল। ও নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
দিনকতক পরে দেখি, ধনাদার বাড়ির সামনে একটা টেম্পোতে মালপত্র বোঝাই হচ্ছে। ধনাদা ব্যস্তভাবে তদারক করছেন। কাছে গিয়ে বললাম, কী ব্যাপার ধনাদা? এসব নিয়ে কোথায় চলছেন?
ধনাদা গম্ভীরমুখে বললেন, বাসা বদলাচ্ছি।
–সে কী! এ পাড়ায় তো ভালোই ছিলেন।
ধনাদা আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, না রে ভাই! এখানে এসেও রেহাই পেলাম কই? গত বছর নারকেলডাঙা থেকে তোদের পাড়ায় চলে এসে ভাবলাম, যাকগে, এবার স্বস্তিতে থাকা যাবে। কিন্তু হতচ্ছাড়া এখানেও আমার পেছনে লাগল।
অবাক হয়ে বললাম, কে সে? বলুন না তাকে আমরা ঢিট করে ছাড়ছি।
ধনাদা হতাশভাবে বললেন,-পারবি না। পারবি কি? কী সাহস দেখলি তো স্বচক্ষে সেদিন। ক্রমশ ব্যাটার স্পর্ধা বেড়ে যাচ্ছে। আগে তো ঘরের ভেতর একা বসে থাকার সময় এসে জ্বালাত–সেও সন্ধ্যার পর। এখন দিনদুপুরে সবার সামনে এসে বেয়াদপি জুড়েছে!
আমরা বললাম,-ব্যাপারটা কী বলুন তো?
ওই ফুটবল। আবার কী।ধনাদা গলা চেপে বললেন। গতবার নারকেলডাঙা থেকে পিছু নিয়েছে, যখন-তখন কোত্থেকে এসে দমাস করে গায়ে পড়ছে। তারপর হাওয়া!
বিশ্বাস হল না। বললাম, যাঃ! কী বলছেন! ফুটবল কি মানুষ? খামোকা আপনার পেছনে লাগবে কেন?
ও তোরা বুঝবিনে, বলে ধনাদা নিজে কাজে মন দিলেন।
আমি মিঠুনের খোঁজে চললাম। ব্যাপারটা ভারি রহস্যজনক। ওদের বলা দরকার।…
ধনাদা বাসা বদলে বেনেপুকুরে গিয়ে উঠেছিলেন। ঠিকানা জোগাড় করে আমি, নান্তু, মিঠুন আর কাজল কদিন পরে এক রবিবারে সেখানে হাজির হলাম। ধনাদাকে কেমন বিষয় দেখাচ্ছিল। বরাবর একা মানুষ। স্বপাক খান। একঘরের ফ্ল্যাট হলেই চলে যায়। বেনেপুকুরে এ বাসাটা একেবারে তিনতলার ছাদে, চিলেকোঠামতো একটা ঘর। মিঠুন দেখেটেখে বলল, এত ওপরে ফুটবলটা আর উঠতে পারবে না, ধনাদা।
ধনাদা করুণ হাসলেন। কী বলিস! ব্যাটা স্বগৃগে গিয়েও রেহাই দেবে না। বরং তেতলার ওপর উঠে দেখছি আরও ভুল করেছি। এখন প্রায়ই এসে হানা দিচ্ছে। একটু আগে ওখানটায় বসে চা খাচ্ছি, ব্যস! এসে গদাম করে পিঠে পড়ল! এই দ্যাখ না, জামার কী অবস্থা করেছে!
