এই সময় বাসের কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে বলল, বাস ছেড়ে যাচ্ছে! ওঠবার হলে উঠে পড়ুন।
নিমেষে ভিড় শূন্য হয়ে গেল। এ বাস ছেড়ে দিলে আবার কখন পাবে, তার ভরসা নেই। মুরারিবাবু তাকিয়ে রইলেন। কই? কোথায় গেল সেই ট্যাক্সিওলা– যাকে পকেটমার বলে লোকেরা বেদম পিটুনি দিচ্ছিল?
তন্নতন্ন করে খুঁজে আর তাকে দেখতেই পেলেন না মুরারিবাবু। কোন ফাঁকে কেটে পড়েছে সে। তবে শুধু ওইটুকু পরিষ্কার বোঝা গেল, লোকটা চশমাটা হাতানোর তালে আছে। নিশ্চয়ই কোনও কারণে সে চশমাটা মুরারিবাবুর কাছে থাকা আর ঠিক মনে করছে না।
হুঁ–রহস্য আরও জট পাকিয়ে গেল তাহলে। মুরারিবাবু ভাবনায় গুম হয়ে গেলেন। তারপর বাসটা স্টার্ট সম্বিৎ ফিরল। রোখ। রোখ–বলে চেঁচিয়ে উঠলেন বটে, কিন্তু তক্ষুনি থমকে দাঁড়ালেন। কোন সাহসে আবার বাসে চাপতে যাচ্ছেন ভিড়ের মধ্যে?…
.
তিন
সেদিনই অনেক রাতে আরও একটা ঘটনা ঘটল। মুরারিবাবুর রাত জেগে বই পড়ার অভ্যাস। কিন্তু চশমার অভাবে বই পড়া হল না। অথচ ঘুমও আসতে চাইল না। তাই বলে চুং সায়েবের চশমা পরে বই পড়ার সাহস ছিল না। বইয়ের পাতায় দেখবেন শুধু একটা রহস্যময় ট্যাক্সি। বই পড়া তো যায় না এভাবে।
শুয়ে ছিলেন চুপচাপ। চশমা নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছিলেন। অগত্যা। সেই সময় ফোন বাজল। রাত বারোটায় কে ফোন করছে? হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে বললেন, হ্যালো! কাকে চাই?
–আপনি কি মুরারিমোহন সাঁতরা?
–হ্যাঁ। কে বলছেন আপনি?
–আমি তারাপদ বকসী। নমস্কার স্যার!
–আপনাকে তো চিনতে পারলুম না ঠিক।
–সে কী সার! আজ সকালেই তো আপনাকে ট্যাক্সি করে চুং সায়েবের দোকানে–
মুরারিবাবু নড়ে উঠলেন, আরে শুনুন, শুনুন!
–শোনার আগে আমার কথাটা বলে নিই স্যার!
উত্তেজনা চেপে মুরারিবাবু বললেন, হুঁ–বলুন।
–চুং সায়েব কেলেঙ্কারি করেছে। আজ সকালে আপনাকে চশমা তৈরি করে দেওয়ার পর দুপুরবেলা আমার সঙ্গে এক জায়গায় হঠাৎ দেখা। হাসতে-হাসতে বলল কী–সেই বুড়োবাবুর চশমার ভেতর আমাকে ট্যাক্সি সমেত ঢুকিয়ে দিয়েছে। শুনে তো আমি ভাবনায় পড়ে গেলুম। বুড়োবাবু মানে আপনি যদি ব্যাপারটা পুলিশের কানে তোলেন বুঝলেন তো সার?
–কিছু বুঝলাম না।
–তাহলে গোড়ার কথাটা খুলে বলি, স্যার!
–বলুন। সেটাই শুনতে চাই।
–বছর ছয়েক আগে এক রাত্তিরে ভবানীপুরে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে খালি ট্যাক্সি নিয়ে শ্যামবাজারে ফিরে আসছি, চৌরঙ্গীতে চারজন লোক দাঁড় করিয়ে বলল, শ্যামবাজার যাবে। খুশি হয়ে ওঠালুম তাদের। কিন্তু তখন কী জানতুম ওদের কী মতলব? বলল, বউবাজার হয়ে একটা কাজ সেরে ওদের যেতে হবে। তাই বউবাজারের দিকে চললুম। চুং সায়েবের দোকানের গলির মুখে আমাকে ট্যাক্সি দাঁড় করাতে বলল। তিনজন নেমে গেল। একজন আমার পেছন থেকে ছুরি দেখিয়ে বলল, চুপ। যা, বলব, করবে। টু করলে মারা পড়বে। বুঝলেন তো স্যার?
–হুঁ। ওরা চুং সায়েবের দোকানে ডাকাতি করেছিল। তারপর চুং সায়েবকে খুন করে—
ট্যাক্সিতে ফিরে এল। প্রাণের ভয়ে একটা কথা বলতে পারলুম না। বুঝলেন না?
–আহা বুঝতে পেরেছি। তারপর?
–তারপর স্যার লোকগুলো হুকুম দিলে স্পিড বাড়াও। বাধ্য হয়ে স্পিড বাড়ালুম। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে যেই পৌঁছেছি, আচমকা একটা লরি এসে পড়ল মুখোমুখি। আর ব্যস! বুঝলেন তো স্যার?
–বুঝলুম। আপনি অক্কা গেলেন?
–একেবারেই!
–তার মানে আপনি ভূত হয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছেন?
–হেঁ হেঁ লজ্জা পাই স্যার, ভূত বললে।
–ভূত বললে লজ্জা পান, কিন্তু বাসে উঠে আমার পকেটে হাত ঢোকাতে লজ্জা পান না!
–ধরা পড়ার ভয়ে স্যার! পুলিশ–বুঝলেন না? পুলিশ এখনও খুঁজছে আমাকে।
–সেই পুলিশও নিশ্চয় ভূত?
–ঠিক ধরেছেন স্যার! তাই বলছিলুম, দয়া করে যদি চশমাটা আমাকে দেন, খুব ভালো হয়। চুং সায়েব আমাকে আর জড়াতে পারবে না ডাকাতি কেসে। পুলিশও প্রমাণ পাবে না।
মুরারিবাবু গর্জে বললেন,–চালাকি?
–কেন স্যার? –আপনি ভূত?
–হেঁ-হেঁ–আর লজ্জা দেবেন না স্যার।
–শাট আপ! আপনি ভূত হয়ে আমাকে টেলিফোন করছেন রাতদুপুরে? আমি কচি খোকা?
–সে কী স্যার? বিশ্বাস করলেন না?
–না। চুং সায়েবেকে ডাকাতরা খুন করেছিল শুনে এসেছি। কিন্তু আপনি দিব্যি ট্যাক্সি করে এখনও ঘুরছেন তার মানে, আপনি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। চুং সায়েব ভূত। তাতে আর সন্দেহ নেই। ভূত হয়ে চুং সায়েব এতদিন আপনাকে ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন। আপনাকে আমি ধরিয়ে দেব। মশাই! আমাকে কি বুদ্ধ পেয়েছেন যে বিশ্বাস করব, ভূত হয়েও আপনি আমার পকেটে হাত ঢোকাচ্ছিলেন এবং লোকেদের হাতে যথেচ্ছ পিটুনি খাচ্ছিলেন?
–চুং সায়েবের ভূত যদি চশমা করে দিতে পারে, তাহলে আমিই বা আপনার পকেটে হাত ঢোকাতে পারি না কেন? লোকের হাতে মার খেতেই বা অসুবিধেটা কীসের স্যার?
তর্কে হেরে মুরারিবাবু বললেন, কিন্তু আমি তো ভূত নই। আমি আপনাদের পুলিশ-ভূতকে পাচ্ছি কোথায় যে চশমাটা দেব তাদের?
–ওরা আপনার আনাচে-কানাচেই ঘুরছে স্যার! আজ সকালে আমার ট্যাক্সি করে আপনাকে যেতে দেখছে না?
মুরারিবাবু শিউরে উঠে জানালাগুলোর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, আপনি কোত্থেকে ফোন করছেন?
–যে হাসপাতালের মর্গে ছিলুম, সেই হাসপাতালের পাবলিক বুথ থেকে।
