মুরারিবাবু সাইনবোর্ডটা দেখিয়ে বললেন,–ইং চুং সায়েবের দোকান ছিল না এটা?
লোকটা গরম তেলে বেগুনি ছেড়ে দিয়ে বলল,–তা তো জানি না বাবুজি। আমি এই দোকান করেছি পাঁচ-ছ বছর আগে।
চটে গেলেন মুরারিবাবু, কী বাজে কথা বলছ? আজ সক্কালে এখান থেকে চশমা করিয়ে নিয়ে গেলুম। আর তুমি বলছ পাঁচ-ছ বছর এই দোকান করেছ? তাহলে এই সাইনবোর্ডটা কেন?
লোকটা বলল, সাইনবোর্ড তো পাঁচ-ছ বছর ধরেই আছে। তাতে কী হয়েছে? খামোকা ঝামেলা করবেন না বাবুজি! গলির ভেতর আরও চশমার দোকান আছে। আপনি ভুল করছেন।
মুরারিবাবু জোরগলায় বললেন, অসম্ভব। ওই তো ঘরের ভেতর সেই সুড়ঙ্গ টাও দেখতে পাচ্ছি। চালাকি কোরো না আমার সঙ্গে। নিশ্চয় ওই সুড়ঙ্গের ভেতর চুং সায়েব লুকিয়ে আছে। ওকে ডাকো।
লোকটা খাপ্পা হয়ে বলল, আঃ! কী ঝুটঝামেলা করছেন বাবুজি! সবাইকে জিগ্যেস করুন না, এখানে কোনও চশমার দোকান ছিল কি না।
মুরারিবাবু ছড়ি তুলে সাইনবোর্ড ঠুকে বললেন, আলবাত ছিল।
গণ্ডগোল দেখে লোক জড়ো হচ্ছিল। পাশের দোকানের এক ভদ্রলোক ব্যাপারটা শুনে বললেন, আপনার ভুল হচ্ছে স্যার! ইং চুং সায়েবের চশমার দোকানই ছিল এটা। তবে তা সাত বছর আগের কথা। চীনা সায়েব ভালোই চশমা বানাত। একা থাকত। তারপর একরাত্রে ওকে ডাকাতরা খুন করে যায়। তারপর থেকে কিছুদিন ঘরটা খালি পড়ে ছিল। শেষে মটরবুড়ো এসে ভাজার দোকান করে।
মুরারিবাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আস্তে-আস্তে চলে এলেন গলি থেকে সদর রাস্তায়। পকেটে চুং সায়েবের চশমাটা ঠিকই আছে। অথচ চুং সায়েব বেঁচে নেই! ছ-সাত বছর আগে ডাকাতরা তাকে খুন করে গেছে। আজ সকালে তাহলে কি কোনও অলৌকিক পদ্ধতিতে মুরারিবাবু ছ-সাত বছর পিছিয়ে গিয়েছিলেন?
খুব রহস্যময় ব্যাপার বলতে হয়। মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আর ওই ট্যাক্সি এবং ট্যাক্সিওলাই চশমার ভেতর ঢুকে গেল কীভাবে?
এ হেঁয়ালি উদ্ধার করা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। উদ্ধার করা যেত হয়তো, যদি ট্যাক্সিওলার সঙ্গে ফের দেখা হতো।
কিন্তু ট্যাক্সিওলা যে চুং সায়েবের মতো ছ-সাত বছর আগের এক মরে যাওয়া মানুষ নয়, তাই বা কে বলল? সম্ভবত সেও তাই। অপঘাতে মরে যাওয়া মানুষ। তা না হলে লরির সঙ্গে তার ট্যাক্সির মুখোমুখি ধাক্কা, চশমা ভাঙা এবং চোখ সেরে যাওয়ার কথা বলছিল কেন?
শিউরে উঠলেন মুরারিবাবু। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সাহস করে আবার একবার চশমাটা বের করলেন। চোখে পরে আকাশের দিকে তাকালেন। আধমিনিট পরেই সেই দৃশ্য আবার। তেড়ে আসছে হলুদ কালো ট্যাক্সি। জানালা দিয়ে মুন্ডু বের করা ট্যাক্সিওলা–সেই লম্বা নাক, মাথার ওপর কাঠি কাঠি একগোছা চুল।
ঝটপট চশমাটা খুলে পকেটে ভরে রাখলেন। তারপর সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ের মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাসে উঠে পড়লেন। বাসে প্রচণ্ড ভিড়। কিন্তু উপায় কী? চারটে বাজতে না বাজতে এই অবস্থা হয়ে যায়। বয়স হয়েছে মুরারিবাবুর। চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে কোনওরকমে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই টের পেলেন তার পাঞ্জাবির পাশ পকেটে কেউ হাত ঢোকাচ্ছে। দু-হাতে ওপরকার রড ধরে আছেন। হাত দুটো নামাবার উপায় নেই। এতটুকু নড়ারও সাধ্য নেই। সামনে-পেছনে দুপাশে লোকেরা তাকে ঠেসে রেখেছে। এ অবস্থায় মুখে পকেটমার! পকেটমার! বলে চেঁচানো ছাড়া আর কিছু করা যায় না। কিন্তু চাচাতে গিয়ে থামলেন মুরারিবাবু। বরং মুচকি হাসলেন।
যে পকেটমার হাত ঢোকাচ্ছে, সেই পকেটে সেই ভুতুড়ে চশমাটা ছাড়া আর কিছু নেই। নিয়ে যাক না ব্যাটা আপদ বিদায় হোক বরং। ওই বিদঘুঁটে জিনিসটা আবার কী ঝামেলা বাধায় বলা যায় না। কে বলতে পারে, আচমকা ট্যাক্সিটা চশমা থেকে বেরিয়ে তাকে চাপা দেবে কি না। সেটা হয়তো অসম্ভব নয়। যে জোরে ছুটে আসে, মনে হয় তার ওপর এসে পড়ল বলে। কিংবা ছোট্টটি হয়ে চোখের ভেতর ঢুকে যেতে পারে।
পকেটমার পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে আর মুরারিবাবু এই সব কথা ভেবে খিক খিক করে হাসছেন। পাশের লোকটা তার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে। নিশ্চয় পাগলা ভাবছে তাঁকে। ভাবুক।
কিন্তু তারপরেই কেউ চেঁচিয়ে উঠল,–তবে রে ব্যাটা! তখন থেকে দেখছি এই ভদ্রলোকের পকেটে হাত ঢোকানোর চেষ্টা করছ–
সঙ্গে সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল চলন্ত বাসের ভেতর। একসঙ্গে অসংখ্য যাত্রী কানফাটানো গলায় চ্যাঁচিতে থাকল,-মার! শেষ করে দে।
বাসে পকেটমার ধরা পড়লে যা হয়। সে এক হুলুস্থুল কাণ্ড। ভিড়ের ধাক্কায় মেয়েদের আর্তনাদ, বাচ্চাদের ভা–বেগতিক বুঝে ড্রাইভার বাস দাঁড় করাল।
মুরারিবাবু দেখলেন, একটা লোককে যাত্রীরা টানতে টানতে বাস থেকে নামাচ্ছে এবং সেই লোকটাই নিশ্চয়ই তাঁর পকেটে হাত ঢুকিয়েছিল।
কিন্তু রাস্তায় তাকে টেনে নামাতেই মুরারিবাবু হতচকিয়ে গেলেন। পকেটমার আর কেউ নয়, সেই ট্যাক্সিওলা-লম্বা নাক, মাথার ওপর বসানো কাঠি কাঠি চুল! মুরারিবাবু ভিড় ঠেলে নামবার চেষ্টা করে চেঁচিয়ে উঠলেন,–ওকে মারবেন না! ওকে মারবেন না!
কিন্তু এখন এসব কথা কে শোনে! রাস্তার লোকেরাও এসে জুটে গেছে। সবাই তাকে মারবার চেষ্টা করছে। ভিড় ঠেলে মুরারিবাবু কিছুতেই কাছে যেতে পারলেন না।
