বুঝলেন মুরারিবাবু। তাই ঠিক। প্রাচীন কোনও গুপ্তবিদ্যার জোরে চুং সায়েব ঠিক মাপের চশমা ঝটপট বানিয়ে ফেলতে পারে। তেমনি মুগ্ধচোখে ঘরের ভেতরকার সেই সুড়ঙ্গের দিতে তাকিয়ে রইলেন মুরারিবাবু।
কিছুক্ষণ পরে সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে এল চুং সায়েব। একটা ডিসের ওপর রাখা, সুন্দর স্টিলফ্রেমের চশমা। মুরারিবাবুর চোখে পরিয়ে দিয়ে ছোট্ট লাল গোল একটা আয়না ধরল ওঁর মুখের সামনে। মুরারিবাবু মুখে হাসি ফুটে উঠল। অপূর্ব! চেহারা খুলে গেছে একেবারে। মাপেও ঠিক। আর পাওয়ারও ঠিক। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। বাইফোকাল চশমা। ওপরের কাঁচ তফাতে দেখার জন্য এবং নিচের অংশ পড়াশুনোর জন্য। চমৎকার! মানিব্যাগ বের করতেই চুং সায়েব বলল,-টোয়েন্টি রুপিজ ওনলি!
মাত্র কুড়ি টাকা! তাহলে দেখা যাচ্ছে ফ্রেন্ডস অপটিক্যালস মহা জোচ্চোর। দুশো টাকা দাম নিয়েছিল আগের চশমাটার!
টাকা মিটিয়ে অনেকবার থ্যাংকস জানিয়ে নতুন চশমা পরে ট্যাক্সিতে এসে চাপলেন মুরারিবাবু। ট্যাক্সিওলা স্টার্ট দিয়ে খি-খি করে হেসে বলল, কী বুঝলেন সার? যা বলেছিলুম, তাই হল কি না বলুন?
মুরারিবাবুও একগাল হেসে বললেন,–ভালো। খুব ভালো।
ট্যাক্সিওলা বাড়ির সামনে পৌঁছে দিয়ে বলল, ভাড়াও দেখুন খুব বেশি ওঠেনি। মাত্র টাকা পনেরো। অন্য কেউ হলে–
ট্যাক্সিওলাকে আর কথাই বলতে দিলেন না মুরারিবাবু। একটা কুড়ি টাকার নোট গুঁজে দিলেন ওর হাতে। নমস্কার করে চলে গেল ট্যাক্সিওলা।
ট্যাক্সির নাম্বারটা দেখে রাখলেন। ডব্লিউ বি টি ৯৯৯৯। ভবিষ্যতে কখনও দেখা হলে সুবিধে হবে। বলা যায় না, বর্ষাবাদলার দিনে কোথাও গিয়ে আটকে গেছেন, কোনও ট্যাক্সি রাজি হচ্ছে না, দৈবাৎ যদি ওকে পেয়ে যান–তাকে না করতে পারবে না। বড় উপকারী ভালোমানুষ লোকটা। বাড়ির সবাই খুব তারিফ করল নতুন চশমাটার। এমনকী যে বিচ্ছু চশমা ভেঙেছিল সেও দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে খিক খিক করে হাসতে লাগল। তাই বলে আর ওর ধারেকাছে যাচ্ছেন না দাদু।
নিজের ঘরে ঢুকে এদিনকার কাগজটা নিয়ে বসলেন মুরারিবাবু। কাগজ পড়তে পড়তে মাঝে-মাঝে জানালা দিয়ে তাকাচ্ছিলেন। এক সময় হঠাৎ দেখলেন, শরতের নীল ঝকঝকে আকাশে একটা ট্যাক্সি ছুটে আসছে–ছুটে আসবে কীভাবে, উড়েই আসছে এবং প্রচণ্ড বেগে তার দিকে আসছে। আসতে-আসতে একেবারে জানালার কাছে। আর ট্যাক্সিওলা জানালা দিয়ে মুন্ডু বের করে আছে সেই ট্যাক্সিওলালম্বা নাক, প্রকাণ্ড মুন্ডু, মাথার ওপর বসানো একগোছা কাঠি-কাঠি চুল, কুতকুতে চোখ আর ঠোঁটে বিদঘুঁটে হাসি…।
আঁতকে উঠে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। কিন্তু এ কী! ট্যাক্সিটা যে তার ঘরের ভেতর এবং সেই ট্যাক্সিওলা মুখ বাড়িয়ে হাসছে।
খবরের কাগজে চোখ রাখলেন সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তুওরে বাবা। কাগজের ওপরও যে তাই। সেই ট্যাক্সি ও ট্যাক্সিওলা। এবার এতটুকুনটি হয়ে গেছে। পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে ট্যাক্সির নম্বর। সেই নম্বর!
ভয় পেয়ে চশমা খুলে ফেলে হাঁক দিলেন মুরারিবাবু-হরি! ও হরি! শিগগির একবার আয় তো!
হরি এসে একগাল হেসে বলল, লতুন চশমাখানা শুনলুম ভালোই হয়েছে। বড়বাবু! পরুন একবার দেখি।
মুরারিবাবু বললেন, হরি! একবার চশমাটা পর তো বাবা।
হরি অবাক হয়ে বলল,-কেন বড়বাবু? আমি চশমা পরব? আপনার চশমা?
–ধুর হতভাগা! যা বলছি কর। নে–পর।
জোর করে পরিয়ে দিলেন হরির চোখে। হরি বলল,-বাঃ! খুব পোস্কের চশমা! সব বড়-বড় পষ্টাপষ্টি দেখিতেছি।
–কিছু দেখতে পাচ্ছিস? জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকা।
হরি জানালার কাছে এসে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর বলল, উড়ে বাব্বা! একখানা ট্যাক্সি আসিতেছে যে বড়বাবু! এই! এই! চাপা দেবে যে!
বলে চশমাটা খুলে ফেলল। মুরারিবাবু উত্তেজনা ও আতঙ্ক চেপে বললেন, এবার ঘরের ভেতরটা দ্যাখ তো হরি!
হরি ভয় পেয়েছিল। বড়বাবুর কথায় ভয়ে-ভয়ে আবার চশমা পরে ঘরের ভেতর তাকিয়ে, সব্বোনাশ! ট্যাক্সিখানা ঘুরে ঢুকে পড়তিছে–বলে খুলে ফেলল চোখ থেকে।
মুরারিবাবু গুম হয়ে চশমা নিয়ে বললেন,–হরি! কথাটা কাউকে বলিসনে। এটা একটা ম্যাজিক চশমা বুঝলি তো?
হরিও গুম হয়ে মাথা নেড়ে নিজের কাজে চলে গেল…।
.
দুই
হরিকে মুরারিবাবু বললেন বটে ম্যাজিক চশমা, কিন্তু ভালোই বুঝে গেছেন এ একটা ভুতুড়ে চশমা এবং এর পেছনে কোনও চক্রান্ত আছে। তা না হলে চুং সায়েব এর ভেতরে ও ট্যাক্সিওলাকেই তার ট্যাক্সিসমেত ঢুকিয়ে দিয়েছে কেন? সেদিনই আবার যেতে হল বউবাজারে। ফ্রেন্ডস অপটিক্যালসেরই শরণাপন্ন হতে হল মুরারিবাবুকে। কিছু বেশি টাকা দিয়ে পরদিন বিকেলের মধ্যেই ডেলিভারি পাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তারপর গেলেন ইং চুং সায়েবের দোকানে।
গিয়েই কিন্তু হতবাক মুরারিবাবু। সেই গলি, সেই ঘুপচি আলো-আঁধারি ঘর, তোবড়ানো রংচটা সেই ছোট্ট সাইনবোর্ড সবই ঠিক আছে। কিন্তু এ যে একটা চানাচুর-তেলেভাজার দোকান! এক বুড়ো কাঠখোট্টা চেহরার লোক কয়লার উনুনে প্রকাণ্ড কড়াই চাপিয়ে নাকমুখ সিঁটকে বসে আছে। কড়াইয়ের কালো তরল পদার্থটা থেকে প্রচণ্ড ঝুঁজ ছড়াচ্ছে। মুরারিবাবু অবাক হয়ে বললেন, ওহে, এখানে চুং সায়েবের চশমার দোকান ছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে দোকান কোথায় উঠে গেল? লোকটা ভুরু কুঁচকে তাকাল, কী বলছেন বাবুজি?
