জ্বর সারলে এবং আঙুলের ফোলা কমলে ফের সেই ভূতনাথ অ্যান্ড কোং এর আপিসে গেলেন। কিন্তু কোথায় কোম্পানি। ঘরের দরজায় একটা কাঠের ফলকে লেখা আছে : ভজহরি ট্রেডিং কোং লিঃ। তারা অনেক কিছু বেচেতবে ভূতটুত নয়।
খোঁজ নিয়ে জানলেন, ভূতনাথ কোম্পানি উঠে গেছে আগের দিন। পুলিশ ঝামেলা বাধিয়েছিল।
আজকাল মামা ভাগ্নে-মিলে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন খুঁটিয়ে পড়েন। এবার ভূত বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখলে সেখানে গিয়ে ধেড়ে ভূতই কিনবেন। বাচ্চা ভূতগুলো বড় বাজে। হিংসুটে স্বভাব। খামোকা কামড়ে আঙুল ঢোল করে দেয়।
ভুতুড়ে চশমা
নাতিকে কোলে নিয়ে আদর করতে গিয়ে মুরারিবাবুর চশমাটা গচ্চা গেল। নাতিটির সবে একটি-দুটি দাঁত গজিয়েছে। মুখের কাছে আঙুল দেখলেই খপ করে ধরে কুট্টুস করে কামড়ে দেয়, খিকখিক করে হাসে।
কিন্তু দাদুর চোখ থেকে একটানে চশমা খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলবে, ভাবা যায়? এখনই এমন বিচ্ছু, তো ভবিষ্যতে কেমন হবে আন্দাজ করে উদ্বিগ্ন হলেন মুরারিবাবু।
চশমা না থাকলে একেবারে কানা বললেই চলে। তাছাড়া চশমাটা সবে কিছুদিন আগে করিয়েছিলেন। স্টিলফ্রেমের দামি চশমা।
চশমা ভেঙেছে যে দুষ্টুটা, তার দাদা নুকুর বয়স বছর আষ্টেক। দাদুর অবস্থা দেখে দুঃখিত হয়ে বলল, চলো দাদু, তোমাকে চশমার দোকানে নিয়ে যাই।
মুরারিবাবু বললে,–সে তো বউবাজারে। হরিকে বল, একটা ট্যাক্সি ডেকে আনুক।
হরির ভরসা করা কঠিন। ট্যাক্সি ডাকার ছলে সে মোড়ের চায়ের দোকানে ঘণ্টাদুয়েক আড্ডা দিয়ে এসে হয়তো বলবে,–কেউ আসতে চাইছে না বড়বাবু।
নুকু তা জানে বলে নিজেই বেরিয়ে গেল এবং তক্ষুনি একটা ট্যাক্সিও ডেকে আনল। মাঝে-মাঝে নুকু তার ক্ষমতা দেখিয়ে এমনি করে তাক লাগিয়ে দেয়। তবে দাদুর সঙ্গে তার যাওয়া হল না। স্কুলের সময় হয়ে আসছে।
ট্যাক্সিওয়ালার চেহারা খেঁকুটে, রোগা। মাথাটি প্রকাণ্ড। তার মধ্যিখানে কাঠির মতো একগোছা চুল বসানো। কুতকুতে চোখ। ইয়া বড় নাক। খুব আলাপি মানুষ। পথে যেতে-যেতে বলল,-ছেলেমানুষ। বড় মুখ করে এসে বলল, দাদুর চশমা ভেঙেছে। বউবাজারে যাবেন চশমা করাতে। তা চশমা না থাকার কষ্ট আমি আমি বুঝি, সার!
মুরারিবাবু হাসলেন, আপনার তো চশমা নেই দেখছি। কী করে বুঝলেন তাহলে?
ছিল। ট্যাক্সিওলা বলল। আর দরকার হয় না। গত মাসে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। ওতেই চোখ সেরে গেছে।
মুরারিবাবু অবাক হয়ে বললেন,–তার মানে?
লরির সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা। বুঝলেন না? এক ধাক্কাতেই চশমা গুঁড়ো এবং চোখ পরিষ্কার। ট্যাক্সিওলা খিকখিক করে হাসতে লাগল। তারপর থেকে আর চশমার দরকার হয় না। এই যে আপনি চশমা ছাড়া দেখতে পাচ্ছেন না–একটা অ্যাকসিডেন্ট হলে বুঝলেন না?
আঁতকে উঠে মুরারিবাবু বলেন, সর্বনাশ! ওসব অলক্ষুণে কথা বলবেন না মশাই! আমার চশমাই ভালো।
ট্যাক্সিওলা বলল, নানা। কথার কথা বলছি। তা বউবাজারে কোন দোকানে চশমা করালেন স্যার?
–ফ্রেন্ডস অপটিক্যালস। খুব নামকরা দোকান।
–আপনি ইং চুংয়ের দোকানে করান না কেন? গলির ভেতরে ছোট্ট দোকান। হলে কী হবে? সস্তায় ঝটপট অত ভালো চশমা আর কেউ করতে পারে না। আধঘণ্টার মধ্যে পেয়ে যাবেন।
মুরারিবাবু একটু ভেবে বললেন, হ্যাঁ, ফ্রেন্ডস অপটিক্যালসে বড্ড বেশি দাম নেয়। তা ইং চুংয়ের সঙ্গে আপনার আলাপ আছে নাকি?
–খুব আছে। চলুন না, দেখবেন কত অমায়িক লোক ইং চু সায়েব।
ট্যাক্সিওলা বউবাজারে একটা গলির মুখে ট্যাক্সি রেখে বলল, আসুন, কাছেই।
ইং চুং অপটিক্যালস লেখা আছে ছোট্ট সাইনবোর্ডে। ঘুপচি একফলি ঘরের ভেতর বসে আছে একজন চীনা। কফিনের সাইজ শোকেসের ভেতরে গোটাকতক চশমা রয়েছে। মিটমিটে একটা বাল্ব জ্বলছে পেছনে। সরু গলিটা এমনিতেই দিনদুপুরে আঁধার হয়ে আছে।
ট্যাক্সিওলা বলে দিল, আমাদের পড়ার লোক চুং সায়েব, বুঝলে তো? বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখলে চলবে না–ট্যাক্সি দাঁড় করানো আছে।
মুরারিবাবু খুব অবাক হয়েছিলেন। বসিয়ে রেখে আধঘণ্টার মধ্যে চশমা দেবে? অবশ্য চীনারা সব বিষয়ে দক্ষ। ওদের দেশে প্রাচীন যুগে আশ্চর্য সব বৈজ্ঞানিক কাণ্ডকারখানাও ঘটেছে। সেই প্রাচীন বিদ্যার জোরেই হয়তো চুং সায়েব আধঘণ্টার মধ্যে চশমা বানিয়ে দিলেও দিতে পারে। তবে ট্যাক্সির মিটার কিন্তু ঘুরবে এবং ভাড়ার অংক বেড়ে চলবে।
তা বাড়ুক। চটজলদি চশমা পেলে কত সুবিধে। এই ভেবে মুরারিবাবু প্রেসক্রিপশন বের করে দিলেন চুং সায়েবকে। স্টিলফ্রেমের চশমা পছন্দ, তাও বললেন। চুং সায়েব দেখে ফেরত দিয়ে বলল,-ওকে বাবু! ওনলি টেন মিনিটস!
বলে কী! দশ মিনিটে দেবে? –মুরারিবাবু তাকিয়ে রইলেন মুগ্ধদৃষ্টিতে। চুং সায়েব ঘরের ভেতর দিকে একটা সুড়ঙ্গ ঢুকে গেল। ট্যাক্সিওলা চোখ নামিয়ে বলল,–ম্যাজিক সার, ম্যাজিক! আমার বেলায় আধঘণ্টা লেগেছিল। আপনার মাত্র দশ মিনিট। আসলে আপনাকে খদ্দের হিসেবে মনে ধরে গেছে চুং সায়েবের।
মুরারিবাবু বললেন, হয়তো সবরকম পাওয়ারের চশমা আগে থেকে করা থাকে। তাই–
বলা কঠিন, স্যার! ট্যাক্সিওলা বলল।–ওই যে দেখছেন আমার মুণ্ডুর মাপ। চোখের কোনা থেকে কান অবধি মেপে দেখুন–পাক্কা দশ ইঞ্চির কম নয়। এই বেখাপ্পা মাপের ফ্রেমও কি আগে থেকে করা থাকে? আসলে সার, চীনারা বহুরকম বিদ্যা জানে! বুঝলেন না?
