যা হওয়ার হল। এবার বানের জল ঢুকে পুকুরের জল বেরিয়ে যাওয়া। ফতুর হয়ে গেলেন ঘোঁতনবাবু। তার ওপর জুটল এই ব্যারাম। মাথার মধ্যে যখন-তখন সেই কোকিল ডেকে ওঠে। সে কী বিচ্ছিরি ব্যাপার, অন্যে বুঝতে পারবে না। মাথার মধ্যিখানে কোকিলের ডাক নিয়ে কি মানুষ বাঁচতে পারে? খেতে-শুতে শান্তি নেই।
সব শোনার পর বৈকুণ্ঠবাবু দুঃখিত মুখে বললেন, তাহলে তো বড় বিপদে পড়েছ ভায়া। তা সেই খাঁচার কোকিলটা এখন কোথায়?
ঘোঁতনবাবু ফিক করে হেসে বললেন, সম্প্রতি এক মাড়োয়ারিকে বেচে দিয়েছি।
যাকগে, ভালো করেছ। আপদ গেছে। –বৈকুণ্ঠবাবু এই বলে পা বাড়ালেন।
ঘোঁতনবাবু বললেন,–আপদ গেল কোথায়? কোকিল গেল, কোকিলের ডাকটা যে গেল না। তাই যাচ্ছি মৌলালির দরগায় সিন্নি দিতে।
বৈকুণ্ঠবাবু বললেন, হ্যাঁ, তাই যাও ভায়া। কোকিলের ব্যানো ওষুধটষুধ খেয়ে সারবে না। তুমি পিরবাবার দরগায় গিয়ে সিন্নিই চড়াও।
বলে ব্যস্তভাবে হনহন করে বাজারে ঢুকলেন বৈকুণ্ঠবাবু।
অন্যদিনে দরাদরি করে খুব জমিয়ে বাজার করেন। আজ সময়ও কম। ঘোঁতনবাবুর কথা শুনতে-শুনতে বেশ খানিকটা দেরিও হয়েছে। অল্পস্বল্প কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরলেন।
তাঁর মেয়ে ইতি গতকাল বাড়ির সামনে একটা কালো বোতল কুড়িয়ে পেয়েছে। বেশ লম্বা বোতল। কেরোসিন রাখার জন্যে ইতির মা সেটা রান্নাঘরে নিয়ে গেছেন। ইতি বোতলটা ধুয়ে সাফ করার সময় বলছিল,–কেমন মিষ্টি গন্ধ মা। মধুর মতো যেন।
ওর মা বলেছিলেন, তাহলে মধুটধুর বোতল!
বৈকণ্ঠবাবু বলেছিলেন,–তোমার মাথা খারাপ? এমন বোতলে আজকাল মধুর কারবার করে না কেউ। সে ছিল সায়েবদের যুগে। আজকাল বেঁটে চ্যাপ্টা শিশিতে মধু ভরে বেচে। ওটা ওষুধের বোতলই বটে। কই রে ইতি, নিয়ে আয় তত শুঁকে দেখি।
হ্যাঁ, শুঁকেছিলেন। একবার জলভরে ধোয়া হলেও গন্ধটা যায়নি। কিন্তু মজার কথা, গন্ধটা ওষুধের বলে মনে হয়নি বৈকুণ্ঠবাবুর। সত্যি বলতে কী, এমন মনমাতানো গন্ধ জীবনে কখনও শোকেননি।
আজ সকালবেলায় বাজার করতে গিয়ে ঘোঁতনবাবুর কাছে বোতল ওরফে কোকিলরহস্য শুনে তাই গোলমালে পড়ে গেছেন বৈকুণ্ঠবাবু।
সেই মাড়োয়ারি ভদ্রলোক তো খাঁচায় ভরা একটা কোকিল কিনেছিলেন ঘোঁতনের কাছে। কিন্তু যা শোনা গেল, কোকিলটার আবার হঠাৎ-হঠাৎ বোতল হয়ে যাওয়ার স্বভাব আছে। তাই কোকিলের বদলে খাঁচায় বোতল দেখে মাড়োয়ারি ভদ্রলোক নিশ্চয় ওটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে যান এবং সেইটেই ইতি কুড়িয়ে এনেছে।
বাড়ি ঢুকে প্রথমে কিচেনের দরজায় থলেটা ধপাস করে ফেললে বৈকুণ্ঠবাবু। তারপর হন্তদন্ত হয়ে বললেন,–বোতলটা কই? বোতলটা?
ইতির মা বললেন,–কোন বোতলটা?
–সেই যে গো, কাল ইতি যেটা কুড়িয়ে আনল।
বৈকুণ্ঠবাবুর কথা শুনে ইতির মা বাজার হয়ে বললেন,–তাই বলো। সে বোতল-বোতল করে পাঁচুর মাকে এইমাত্র তাড়ালুম না? ও ছাড়া আর কেউ নেয়নি। কাল সন্ধ্যাবেলা আঁচলের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে পালিয়েছে। ওই তো ওখানে জলজ্যান্ত রেখে দিলুম। আজ উনুন ধরাবার জন্য টিন থেকে কেরোসিন ঢালতে গিয়ে দেখি বোতলটা নিপাত্তা। তখনই বুঝলুম কার কীর্তি!
ইতি বললে, কাল সন্ধ্যাবেলা পাঁচুর মা যখন যাচ্ছে, ওর পেটে কী যেন লুকানো ছিল, বাবা!
তার মা ভেংচি কেটে বললেন, লুকানো ছিল বাবা, তা তখন বলতে কী হয়েছিল ধাড়ি মেয়ে?
বৈকুণ্ঠবাবু হাত তুলে বললেন, খুব হয়েছে, খুব হয়েছে। চেপে যাও!
চেপে যাব মানে? কী বলছ তুমি? –ইতির মা অবাক!
বৈকুণ্ঠবাবু চোখ নাচিয়ে একটু রহস্যময় হেসে বললেন,–পরে বলবখন। সে এক অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার। যাক, শত্রু পদে-পদে। আপদ বিদেয় হয়েছে।
ইতির মা হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পর, ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বাজারের থলে নিয়ে পড়লেন। এক্ষুনি তো আপিসের ভাত বাড়তে হবে। বৈকুণ্ঠবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সংসারের শতেক জ্বালায় মাথার মধ্যিখানে এমনিতেই এক গুচ্ছের ঝিঁঝিপোকা সারাক্ষণ ডাকে। বাড়তি করে কোকিলের ডাক ঢুকিয়ে কাজ নেই।
তার চেয়ে একটা ভাবনার ব্যাপার ছিল। ঘোঁতনের জগদম্বা বোতল ভাণ্ডারে তো শুধু শিশি-বোতল ছাড়া আর কিছু ছিল না। বৈকুণ্ঠবাবুর ঘরে কোকিলের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে হাড়িকুঁড়ি বাসনপত্র খাট আলমারি কাপড়চোপড় যদি রকমারি জন্তুজানোয়ার হয়ে ডাক জুড়ে দেয়! শিশি যদি পাখপাখালি হয়ে ওঠে, আলমারির বাঘ হতে কতক্ষণ। হাঁড়িগুলো হয়তো ভালুক হয়ে যাবে। বাসনকোসন ঘটিবাটি ইয়াবড় কচ্ছপ আর শামুক হয়ে উঠবে। খাটটা হাতি হয়ে চারঠ্যাং সোজা করে দাঁড়াবে। আলনাটা জেব্রা হয়ে–বাপস!
এই সাংঘাতিক দুর্ভাবনার স্রোতে ভাসতে ভাসতে আচমকা আঁতকে উঠলেন বৈকুণ্ঠবাবু। কোথায় যেন এইমাত্র শুনলেন কু-উ কু-উ কুউ…
যেন নয়, সত্যি। শোবার ঘরের মেঝেয় দাঁড়িয়ে স্নানের জন্যে কাপড় বদলাচ্ছেন, আর শুনছেন কুহু কুহু কুহু কুহু কু কু কু কু কুউ কু কু–
অমনি চেরা গলায় বৈকুণ্ঠবাবু উঠলেন,–বেরোও। বেরোও!
তারপর লাফালাফি হুলুস্থুল কাণ্ড ঘরের মধ্যে। ইতির মা, ইতি দৌড়ে এল।
ইতির মা বললেন, কী? অমন ষাঁড়ের মতো চাচাচ্ছ কেন? বেরোও বলছ কাকে? লাফালাফি করে তাড়াচ্ছই বা কী?
ইতি অনুমান করে বলল,-বেড়ালটাকে মা। তোমার বেড়ালটাকে।
