মন্দিরের গেট পেরিয়ে কয়েক পা গেছেন, হঠাৎ চমকে উঠলেন। বোতলটা নিচের ঝুল পকেটে ঢোকানো ছিল! সেটা খুব নড়াচড়া করছে। পকেটে হাত ভরতেই একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন ঘোঁতন।
একি! একি! বোতল কোথায়? হাতে যে নরম পালকের মতো কিছু ঠেকছে। ভয়ে-ভয়ে তাকিয়ে পকেটের ফাঁক দেখেন, বোতলটা রূপ বদলে একটা কোকিল হয়ে গেছে। ঠোঁট ফাঁক করলে তার মুখের ভেতরে লালচে জিভ এবং গলা অবধি দেখা গেল। মনে হল কোকিলটা ডাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু আঁটো জায়গায় সুবিধে করতে পারছে না। এবং সেই সময় কোকিলটা তার হাতে বেজায় ঠোক্কর দিতে শুরু করল।
হাত সঙ্গে সঙ্গে বের করে নিলেন। রক্তারক্তি হয়ে গেছে ডান হাতটা। তখন করলেন কী, পকেটের মুখ চেপে ধরে আটকে রাখলেন এবং দৌড়তে শুরু করলেন
যাই হোক, সেদিনই টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে কলকাতা রওনা হলেন ঘোঁতনবাবু। দুদিন দুরাত জানি। কিন্তু একবারও পকেটের মুখ ফাঁক হতে দেননি। কোকিল সারাক্ষণ ছটফট করেছে। মরিয়া হয়ে পকেট চেপে ধরে বসে থেকেছেন ঘোঁতনবাবু। এইভাবে হাওড়া পৌঁছেছেন।
তারপর প্রথমে চিৎপুরের দোকান গিয়ে বন্ধ দরজার তালা খোলেন বাঁ-হাতে। ভেতরে ঢুকে বাঁ-হাতেই দরজা ফের আটকে সুইচ টিপে বাতি জ্বালেন। তারপর পকেট থেকে হাত সরিয়ে নেন। কিন্তু আশ্চর্য, পরমাশ্চর্য! কোথায় কোকিল! সেই বোতলটাই পকেটে পোরা আছে।
তখন শ্রদ্ধা সহকারে বোতলটা দেয়ালের তাকে গণেশের পাশে বসিয়ে রাখেন। আপাতত ওখানেই সিদ্ধিদাতার পাশে থাকুন। শিগগির একটা চাদির পালঙ্ক এনে একটা ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠা করবেন। দেয়াল কেটে নতুন তাক করে নিতেই বা অসুবিধেটা কী?
সেদিনকার মতো এই। দরজা বন্ধ করে বাড়ি ফিরে গেলেন নিশ্চিন্তে। বোতলদেব যদি আবার বেখেয়ালে কোকিলদেব হয়েও ওঠেন, পালাতে পারবেন না। দরজা তো বন্ধ রইল।
এবং পরে যদি দেখেন, সত্যি আবার কোকিল রূপ ধারণ করেছেন তাহলে বরং একটা খাঁচার ব্যবস্থাই করবেন।
করতেও হল ঠিক তাই। পরদিন সকালে গিয়ে দোকান খুলছেন তখনই কানে এল ভেতরে কোকিল ডাকছে। কু-উ-উ–কু-উ-উ–কু-উ-উ। তারপর কুহু কুহু কুহু কুহু-কহুকুহু–কুক্কু কু কু কু কুকু–
আর দরজা খোলা হল না। তক্ষুনি একটু দূরে একটা হার্ডওয়ার স্টোর্স থেকে মজবুত লোহার খাঁচা কিনে আনলেন। তারপর খুব সাবধানে দোকানে ঢুকেই দরজা আটকে দিলেন। সুইচ টিপে বাতি জ্বেলে দেখলেন–কোকিলদেব গণেশের পাশেই বসে আছেন এবং উদাস সুরে গান গাইছেন।
পা টিপে পাশ থেকে এগিয়ে ধপ করে ধরে ফেললেন তাকে এবং খাঁচায় ভরে নিশ্চিন্ত হলেন। খাঁচাটা টাঙিয়ে রাখলেন জায়গামতো।
হ্যাঁ, শিশি-বোতলের ব্যবসা কি আবার জমে উঠল। প্রায়ই নানান কোম্পানি থেকে সেকেন্ডহ্যান্ড শিশি-বোতলের অর্ডার আসে। এসব মাল ঘেতনবাবু সস্তায় কেনেন। ওই যে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে শিশি-বোতল কিনে বেড়ায় যারা, তাদের কাছ থেকে কিনে নেন। তারপর ঠিকে কাজের লোক দিয়ে সাফ করিয়ে রাখেন। তাকে, আলমারিতে, মেঝেয়, বস্তায় অজস্র শিশি-বোতল।
এ পর্যন্ত সব ভালোয়-ভালোয় চলছিল। এরপর শুরু হল গোলমেলে ব্যাপার। এক সন্ধ্যাবেলা প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমেছে। দেখতে-দেখতে রাস্তায় জল জমে উঠল। সেই জল ঘোঁতনবাবুর জগদম্বা বোতল ভাণ্ডার-এর চৌকাঠে এসে উঁকি মারল। তখন তিনি তাপোশে ঠ্যাং তুলে বসলেন এবং মনেমনে বোতলায় নমঃ, কোকিলায় নমঃ জপ শুরু করলেন। তখন বৃষ্টির জল দোকানের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। তারপর আর বেরুবার নামগন্ধ নেই। কত কষ্টে যে তাড়ালেন কহতব্য নয়। তাঁ, বোতলবাহিনীর সাহায্যেই তাড়িয়েছিলেন।
তো এদিনও সেই অবস্থা প্রায় তারপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো তক্ষুনি লোডশেডিং। ব্যস! দোকানপাট, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বিলকুল অন্ধকার। চিকুর হেনে বাজ ডাকছে এবং বৃষ্টি সমানে ঝমঝমিয়ে পড়ছে তো পড়ছেই। লোজনেরা কোথায় মাথা বাঁচাতে ঢুকে পড়ছে। এসব সময় দোকানে চোর-ডাকাতের হামলার ভয় আছে। তাই ঘোঁতনবাবু যথারীতি মোমবাতি জ্বেলে দরজা বন্ধ করে বসে রইলেন।
আর সেই সময় অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খাঁচার কোকিলদেব গান গেয়ে উঠলেন, কুউ-কুউ-কুউ- কুহু কুহু…কুহু কুক্কু কু কুকু!
আর সঙ্গে সঙ্গে হল কী–তাকে, আলমারিতে, বস্তায়, মেঝেয় যেখানে যত কালো বোতল ছিল, সব কোকিলের গলায় কুহু গাইতে শুরু করল।
দেখাদেখি রংবেরঙের অন্য শিশি-বোতলগুলোও নানান পাখির ডাক ডেকে উঠল। কিচির মিচির-কিচির মিচির–চু চিক্ চিক্ চিক্ চিকি চিকি চিকি-কুছ কুছ—ক্রিরররর ক্রু ক্রু–কি কি কিচুক চুক চুক চাঁকুক্ চাঁকুক্ চাকু চ্যাঁক চ্যাঁক!
ঘোঁতনবাবু যেদিকে ঘোরেন, দেখতে পান ঘরভর্তি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখপাখালি। দোয়েল, শ্যামা, শালিক, ফিঙে, ছাতার, টিয়া, চন্দনা, মৌটুসি, কাদাখোঁচাকতরকম পাখি! আর তাদের মধ্যে গলা চড়িয়ে গান ধরেছে ওই কোকিলগুলো। গণ্ডয়-গণ্ডায় কোকিল। খাঁচার কোকিল অর্থাৎ শ্ৰীশ্ৰীবোতলদেব ওরফে শ্রীশ্রীকোকিলেশ্বর যেন টুকটুকে মুখে মুচকি হাসছেন এবং গাইছেন। বাকি কোকিলরা সুর ধরেছে।
ভয় পেয়ে এক লাফে এগিয়ে দরজা খুলে দিলেন ঘোঁতনবাবু। আর অমনি ঝাঁকে ঝাকে পাখপাখালি ফরফর করে দরজা দিয়ে বেরুতে শুরু করল। ঘেতনবাবু বেগতিক দেখে চোখ বুজে এক পাশে সরে এলেন এবং ভয়ে বসে পড়লেন। আধমিনিটের মধ্যে ঘর খালি হয়ে গেল। শুধু রইল খাঁচায় বন্দি সেই শ্রীশ্রীকোকিলেশ্বর ওরফে শ্ৰীশ্ৰীবোতলদেব কিংবা বোতলেশ্বর, যিনিই হোন। পালাতেন নিশচয়ই-কিন্তু খাঁচায় বন্দি বলেই পারলেন না।
