কী? আমার বেড়াল তোমার শত্রুর? –ইতির মা রুখে দাঁড়ালেন।
বৈকুণ্ঠবাবু বললেন, আরে না, না। বেড়াল না।
–তবে কী? কুকুর?
–না। ওই শুনতে পাচ্ছ না?
বৈকুণ্ঠবাবু কান পেতে শান্তভাবে দাঁড়িয়েছেন এবার। ফের বললেন,–ওই শোনো কুউ কুউ করে ডাকছে না? কু কু কু কু কুহু কুহু কুহু কুহু কুউ-উ-উ।
ইতির মা হেসে ফেললেন।তাই বলল। কোকিল ডাকছে? তা অমন চাচাচ্ছ কেন?
ইতি বুদ্ধিমতীর মতো বলল,–ও বাবা, এটা যে বসন্তকাল। বইয়ে লেখা আছে বসন্তকালে কোকিল ডাকে, দেখবে, বইটা আনব?
বৈকণ্ঠবাবু উদ্বিগ্নমুখে বললেন, কিন্তু কোকিলটা ডাকছে কোথায় দেখো তো?
ইতির মা কান পেতে শুনে বললেন, কই, কোকিল ডাকছে না তো!
–তাহলে ওই যে কুউ কুউ কুহু কুঃ কুঃ–
মলো ছাই। রেললাইনে ইঞ্জিন হুইসিল দিচ্ছে। কানের মাথা খেয়েছ এ বয়সেই? বলে ইতির মা রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলেন। সেখানে গিয়ে গজগজ করতে থাকলেন, কী শুনতে কী শুনছে দেখো তো! এরপর কবে কী দেখতে কী দেখে হুলুস্থুল বাধাবে। এরই মধ্যে বাহাতুরে ধরে গেল মানুষটাকে।
হ্যাঁ তাই বটে। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন বৈকুণ্ঠবাবু। শেয়ালদা স্টেশনের শান্টিং ইয়ার্ডে একটা ইঞ্জিন হুইসিল দিচ্ছে। দেখে আশ্বস্ত হলেন। শুনেও তৃপ্তি পেলেন। বাথরুমে ঢুকে মনের আনন্দে ছেলেবেলার মতো বলে উঠলেন কু-ঝিক্ কু-ঝি, কু ঝিক ঝিক মি মি মিক্–।
একটু পরে স্নান করে খেতে বসে বললেন, তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে বলছিলুম। শোনো কী হয়েছে। সেই ঘোঁতন চক্কোত্তিকে মনে পড়ছে? সেই যে চিৎপুরে জগদম্বা বোতল ভাণ্ডার আমাদের ফটিকের জ্যাঠশ্বশুর।
ইতির মা পাতে গরম ডালের বাটি উপুড় করে দিয়ে বললেন,-হ্যাঁ বুঝেছি। ফটিক কাল দুপুরে এসেছিল। বলল, জ্যাঠশ্বশুরের মাথার দোষ হয়েছে। ব্যবসায় লোকসান খেয়ে মনে খুব আঘাত পেয়েছিলেন। এখন নাকি খাওয়াদাওয়া ছেড়ে খালি পথে-পথে টোটো করে যোরেন। জোর করে ধরে আনতে হয়। শুনে খুব দুঃখ হল। অমন শান্ত আর ভদ্র স্বভাবের মানুষটা। হ্যাঁ গো, একবার গিয়ে দেখে এসো না! তোমার সঙ্গে তো খুব খাতির ছিল।
বৈকুণ্ঠবাবু এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। তাই বটে! সেইজন্যেই ঘেতনবাবুকে কেমন যেন দেখাচ্ছিল। পরম নিশ্চিন্ত হয়ে গরম ভাত গিলতে থাকলেন বৈকুণ্ঠবাবু। বাপস, ঘোঁতন তার মাথায় সেই বোতল ওরফে কোকিলটা প্রায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। পাগল আর বলে কাকে। আসলে হচ্ছে কিনা-কুঝিক ঝিক-কু-ঝিক ঝিক্কু ঝিক ঝিক্ আর ভুল করে শুনেই ফেলতেন, কুহু কুহু কুউ কুউ। খুব বাঁচোয়া, বোতলের যদি বা কোকিল হয়ে যাওয়া সম্ভব, ইঞ্জিনের তা সম্ভব নয়।, বড়জোর ইঞ্জিনের পক্ষে হাতি হয়ে যাওয়া সম্ভব বটে। তবে একটু মুশকিল আছে। বৈকুণ্ঠবাবু আনমনে ভাতের গ্রাস মুখে দিয়ে ভাবছিলেন, কোকিল মাথায় ঢুকলে মোটামুটি একটা জায়গা পেয়ে যাবে। কিন্তু হাতি? ওরে বাবা, মাথায় হাতি ঢুকে পড়লে সে কঠিন ব্যাপার! অত জায়গা কোথায়?
বৈকুণ্ঠবাবু দুরুদুরু বুকে পাত থেকে উঠে পড়লেন। বললেন, ইতি, পুবের জানলাগুলো ভালো করে আটকে দে তো মা। খালি দিনরাত্তির কু ঝিক ঝিক আর কু ঝিক ঝিক্।
ভয়ভুতুড়ে
খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। বড় অদ্ভুত বিজ্ঞাপন।
সস্তায় ভূত কিনুন!
বাচ্চা ভূত মাত্র পঞ্চাশ পয়সা
ধেড়ে ভূত মাত্র এক টাকা
জাল ভূত নয়। একেবারে আসল ভূত!!
ভূতনাথ অ্যান্ড কোং
১/১ কালোবাজার স্ট্রিট
(লালবাজারের উল্টোদিকে)
কলকাতা
ভাগ্নে নেপাল তার মামা নকুলেশ্বরকে বলল,–ও মামা, ভূত কিনবেন? এই দেখুন, কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছে।
নকুলেশ্বর বললেন, তাই নাকি? দেখি, দেখি!
বিজ্ঞাপন পড়ে নকুলেশ্বর নেচে উঠলেন। তার নানারকম জন্তুজানোয়ার এবং পাখি পোর শখ আছে বরাবর। বাড়ির ছাদে আস্ত একটা চিড়িয়াখানা বানিয়ে ফেলেছেন। সেখানে এখন বাঘ-ভালুক না থাকলেও ছোট-ছোট জন্তু অনেক আছে। বাঘ-ভালুক একসময় ছিল। তাদের খোরাক জোগাতে না পেরে সার্কাস কোম্পানিকে বেচে দিয়েছিলেন। এখন আছে গোটা দুই খরগোশ, একটি হরিণের বাচ্চা, একটা খেকশিয়াল, একটা ভোদড়, দুটো বেজি আর পাঁচটা গিনিপিগ। পাখিও আছে কয়েকরকম। মামা-ভাগ্নে তাদের নিয়েই থাকেন।
নকুলেশ্বরের বরাবর সাধ ছিল, একটা ভূত রাখবেন চিড়িয়াখানায়। কিন্তু ভূত পাবেন কোথায়? ভাগ্নেকে নিয়ে কত জায়গায় ঘুরেছেন শ্মশানে, পোড়ো-বাড়িতে, চিলেকোঠায়। ভূত পাননি। এখন কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লেন দুজনে।
অনেক খুঁজে ভূতনাথ অ্যান্ড কোং বের করলেন। একটা বিরাট পুরোননা বাড়ির ভেতর অনেক ঘোরালো সিঁড়ি বেয়ে অনেক করিডর পেরিয়ে তিনতলায় কোনার দিকে একটা ছোট্ট ঘরের দরজায় কোম্পানির নাম দেখতে পেলেন।
টুলে বেয়ারা বসেছিল। বলল, চলিয়ে যান অন্দরমে।
বেয়ারার কালো কুচকুচে চেহারা, রোগা-পটকা গড়ন। গোঁফটা প্রকাণ্ড। নেপাল ও নকুলেশ্বর চোখাচোখি করলেন। তার মানে, বেয়ারাটা মানুষ বটে তো? বলা যায় না।
ঘরের ভেতর আলো নেই। আবছা আঁধার। ঢুকে কিছু দেখতে পেলেন না নকুলেশ্বর। আর কেমন একটা চিমসে গন্ধ। নেপাল ফিসফিস করে বলল, ভূতের গায়ে কেমন গন্ধ মামা। বড় বিচ্ছিরি।
নকুলেশ্বর বললেন,-তা তো হবেই। কিন্তু ঘরে যে কাকেও দেখতে পাচ্ছিনে।
