গোবর্ধন বলল,–শুনলেন দাদা, শুনলেন ব্যাটার আস্পর্ধার কথা?
গলা চড়িয়ে বললুম,–ভগলু! তুমকো হাম আভি অ্যারেস্ট করে গা।
যস্মিন দেশে যদাচার। যে জায়গায় এসে পড়েছি, তাতে তাল দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমার শাসানি শুনে ভগলু তার গাছের আস্তানা থেকে হিহি করে হেসে বলল,-চলা আও না! আও বাঙালিবাবু!
বৃদ্ধ বললেন, আপনাকে চ্যালেঞ্জ করছে রামবাবু, শুনছেন তো?
বললাম, দাঁড়ান, দেখাচ্ছি মজা ওকে।
উঠে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ওই হচ্ছে ভেগে পড়ার মোক্ষম সুযোগ। এমন সময় অন্ধকারে কবরখানার দিকে চ্যাঁচিমেচি শোনা গেল,-কেষ্টা! গোবরা! দাদুমণি! চলে এসো শিগগির! ভোগলে ব্যাটার ঠ্যাং ধরে ফেলেছি। সেই সঙ্গে ভগলুরও চ্যাঁচিমেচি চলেছে,–ছোড় দে! ছোড় দে হরিয়া! হাম গির যায়ে গা! গির যানে সে হাম ফজলু খাঁকা উপরমে গিরেগা। উও কসাই আছে। হামকো জবাই করেগা।
হ্যাঁ–গাছের নিচে এক কসাই ফজলু খায়ের কবর! তার ওপর পড়লে গলায় ছুরি চালিয়ে দেবে। তাই ভগলু ত্রাহি ত্রাহি আর্তনাদ করছে। কিন্তু হরি তার ঠ্যাং ছাড়ার পাত্র নয়। এদেরও ডাকছে।
বৃদ্ধ, কেষ্টা আর গোবর্ধন ঝপাং ঝপাং করে জলে লাফিয়ে পড়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হল। লণ্ঠনটা জ্বলছে। চায়ের কাপপ্লেট পড়ে আছে। আমিও ঝাঁপ দিলুম তবে গেটের দিকে।
বৃষ্টিটা ছেড়েছে এতক্ষণে। জল ভেঙে প্রাণপণে এগিয়ে গেলুম যেদিক থেকে এসেছি, সেই দিকে! একখানে একটা বাড়ির বোয়াকে লণ্ঠন দেখলুম। কিন্তু আর সাহস হল না তাকাতে। যদি আবার…
বোতল যখন কোকিল হয়?
সকালে থলে হাতে বাজারে যাচ্ছেন বৈকুণ্ঠবাবু! রাস্তায় অনেক দিন বাদে দেখা হল ঘোঁতনবাবুর সঙ্গে। এই যে ঘোঁতন। কেমন আছো? অ্যাদ্দিন ছিলে কোথায় হে? আঁ? ব্যাপারটা কী? ইত্যাদি প্রশ্নসূচক বাক্যে অনর্গল জর্জরিত করতে থাকলেন ঘোঁতনবাবুকে! বৈকুণ্ঠবাবুর বরাবর এই অভ্যেস। অনর্গল কথা বলতে পারেন।
ঘোঁতনবাবু কিন্তু কোনও কথাই বলছেন না। চাউনিটা ভারি বিমর্ষ। টাক চুলকোচ্ছেন আর চুলকোচ্ছেন এবং মাঝে-মাঝে কান খাড়া করে কী শুনছেন। তখন মুখের ভাবটা বিকৃত দেখাচ্ছে।
তখন বৈকুণ্ঠবাবু তার পেটে আঙুলের গুঁতো মেরে বললেন,-মুখে কি বোবায় ধরল ঘোঁতন? কথা বলছ না কেন? সব জিনিসের দাম বেড়েছে বলে বুঝি কথারও দাম বাড়াতে চাইছ?
গুঁতো খেয়েই যেন মুখে কথা ফুটল ঘোঁতনবাবুর! একটু ম্লান হেসে বললেন, এমন সময় তুমি আমাকে জেরা করছিলে, যখন আমার জবাব দেওয়ার উপায়ই ছিল না–এখন যা জিগ্যেস করবে করো, বলছি।
অবাক হয়ে বৈকুণ্ঠবাবু বললেন, তার মানে, এতক্ষণ তো খালি টাক চুলকোচ্ছিলে ভায়া।
ঘোঁতনবাবু চাপাগলায় বললেন, না। তখনি আমি কোকিলের ডাক শুনছিলুম, বুঝলে? তোমার গুঁতো খেয়ে সে-ডাক থাকল।
বলো কী! –বৈকুণ্ঠবাবু হতভম্ব হয়ে বললেন,–এ হেঁয়ালির অর্থ কী ভায়া? নাকি রসিকতা করছ? তুমি তো কোনওদিনই রসিক লোক ছিলে না!
সত্যি বলছি বৈকুণ্ঠ। কোকিলের ডাক শুনছিলুম। –ঘোঁতনবাবু গম্ভীরমুখে বললেন, সেই কলেজ স্ট্রিটের মোড় থেকে ডাকতে শুরু করেছে। এই বৈঠকখানায় এসে থামল। তাও ভাগ্যিস তুমি গুতো মারলে, তাই। নইলে মৌলালির মোড় অবধি সমানে ডাক চালিয়ে যেত।
বৈকুণ্ঠ আকাশ থেকে পড়তে-পড়তে বললেন,–কোকিল! কার কোকিল? কীসের কোকিল? কোথায় কোকিল?
এবার ঘোঁতনবাবু বৈকুণ্ঠবাবুর একটা হাত ধরে টানলেন।সে এক ইতিহাস ভাই বৈকুণ্ঠ। একটু নিরিবিলিতে এসো। সংক্ষেপে মোটামুটি বলছি।
বাজার করে নিয়ে গেলে রান্না হবে এবং তাই খেয়ে বৈকুণ্ঠ আপিস যাবেন। অতএব তাড়া ছিল। কিন্তু ঘোঁতনের মতো রাশভারী মানুষ কোকিল-টোকিল নিয়ে রসিকতা করবেন, এ অসম্ভব। নিশ্চয় গুরুতর এবং রহস্যময় কিছু ঘটেছে। তাই বৈকুণ্ঠ আড়চোখে হাতের ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে একটু নিরিলিতে গেলেন ওঁর সঙ্গে।
তারপর ঘোঁতনবাবু যা বললেন, তো শুনে তো আঁতকে উঠলেন। ব্যাপারটা হয়েছে এই :
ইদানীং ঘোঁতন ধর্মেকর্মে মন দিয়েছিলেন। ওঁর সেকেন্ডহ্যান্ড শিশি-বোতলের ব্যবসাটা পৈতৃক। সেই ব্যবসাতে হঠাৎ একগুচ্ছের লোকসান খেয়ে সামলে উঠতে পারেননি। মনের দুঃখে কিছুদিন নানান তীর্থে দেবসন্দর্শনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। একদিন দক্ষিণ ভারতে এক তীর্থে পুকুরের ঘাটে শুয়ে আছেন। সেই সময়ে স্বপ্নে দেখলেন, জটাজুটধারী প্রকাণ্ড চেহারার এক সাধু এসে তাঁকে একটা বোতল দিয়ে বললেন, এইটে নিয়ে বাড়ি চলে যা। ঘুম ভেঙে ঘোঁতন কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। একেবারে দুপুরবেলা। মন্দিরের ছায়া ঘাটে এসে পড়ছে। সে ঘাটের ধাপে ঠান্ডা ছায়ায় তিনি ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
তারপর তার চোখে পড়ল পায়ের কাছে নিচের ধাপে একটা বোতল গড়াতে গড়াতে জলের দিকে যাচ্ছে। অমনি হাত বাড়িয়ে সেটাকে ধরে ফেললেন।
কালো কুচকুচে লম্বা বোতল, খালি। শুঁকে দেখলেন, ভেতরে কেমন একটা মিঠে গন্ধ। মনের জ্বালা জুড়িয়ে গেল। বারবার শুকলেন। ওঁকে আশ মেটে না, এমন অবস্থা।
কিন্তু হায়! তখন যদি জানতেন এই বোতলই তাঁর কাল হবে! সাধু দুষ্টুমি করে কী বিপদে না তাকে ফেলে দিয়েছেন।
বোতলটা পকেটস্থ করে মহানন্দে চলেছেন ঘোঁতন। মনে হচ্ছে এই পবিত্র বোতল তার চিৎপুরের শিশি-বোতলের দোকানে প্রতিষ্ঠা করলেই ব্যবসা আবার হু হু করে ফুলে উঠবে। হ্যাঁ, সোনার না হোক, আপাতত একটা চাদির পালঙ্ক তৈরি করে তার ওপর শ্রীশ্রীবোতল-দেবকে শুইয়ে রাখবেন এবং দুবেলা ধুপ চন্দন ফুল দিয়ে পুজো করবেন। জয় বাবা বোতলদেব। বোতলদেবায় নমঃ।
