–কোথায় যেন যাবেন বললেন বাবু?
আবার সেই কথা? গর্জে বললুম, রোখ, রোখ! আমি এখানেই নামব।
–এই যে এসে পড়েছি, বাবু! একটু সবুর করুন।
–না। এখানেই নামিয়ে দাও।
রিকশোওলা রিকশো থামাল। বলল, ওই তো পিলখানা আলো জুলজুল করছে।
হাঁটুজলে বৃষ্টির মধ্যে নেমে ওর হাতে পাঁচটাকার নোট গুঁজে দিয়ে সামনে বাঁহাতি আলো লক্ষ করে এগিয়ে গেলুম। রিকশোলা রিকশো ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। আর বুঝতে অসুবিধা হল না যে লোকটা কানে কম শোনে। বলছি থানার কাছে, সে শুনেছে পিলখানার কাছে।
কিন্তু পিলখানা যে বলে গেল, সে আবার কী জিনিস? এ নাম তো কস্মিন কালে শুনিনি। বাঁ হাতের গেটের ভেতর একটা উঁচু তিনদিক খোলা দালানের চত্বরে লণ্ঠন সামনে রেখে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে আছেন। মাথায় টাক। মুখে অমায়িক ভাব। জায়গাটা ঠাকুর দালান বলে মনে হয়। গেটের কাছে আমাকে দেখা মাত্র তিনি বলে উঠলেন, কী সৌভাগ্য! আসুন আসুন!
আমি তো অবাক। ভাবলুম, নিশ্চয় চেনেন-টেনেন কোনও সূত্রে। ছাদের তলায় তো পৌঁছনো যাক। বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে যাচ্ছি।
ভদ্রলোক একই ভঙ্গীতে বললেন,–বসুন রামবাবু, তখন থেকে আপনার অপেক্ষা করছি। তবে বৃষ্টিটাও বড্ড বেশি আজ। বলে হাঁক দিলেন মুখ ঘুরিয়ে, কেষ্ট! অ কেষ্ট। বড়বাবু এসেছেন রে! শিগগির চা নিয়ে আয়।
সর্বনাশ! আমাকে কোন রামবাবু ওরফে বড়বাবু ভেবে বসেছেন। রিকশাওলা কানে কালা। আর ইনি চোখে কম দেখেন নাকি? ঝটপট বললুম, দেখুন, আপনার বোধহয় ভুল হচ্ছে। আমি রামবাবু নই। রিকশোওলা ভুল করে আমাকে থানার বদলে পিলখানায়–
কথা কেড়ে খি-খি করে হাসলেন বৃদ্ধ। নানা। ভুল করেনি। ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়েছে। অ কেষ্টা, চা কৈ রে?
কী মুশকিল! কথাটা শুনুন। আমি রামবাবু নই।
পেছনদিকের দরজা খুলে এক মূর্তির উদয় হল। কালো কুচকুচে গায়ের রং। লিকলিকে পাঁকাটি গড়ন। পরনে হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি। সাদা দাঁত বের করে বলল,–বড়বাবু বরাবর এইরকম বলেন। বুঝলেন দাদুমণি? বসুন, বসুন–চা খান। পরে কথা হবে।
সে এককাপ চা প্লেটসুদ্ধ এনে লাল মসৃণ মেঝেয় রাখল। তারপর সেইরকম হেসে চলে গেল। বৃদ্ধ বললেন,–বসুন। কাজের কথা সেরে নেওয়া যাক চা খেতে খেতে।
বেগতিক দেখে বললুম, প্লিজ শুনুন। প্রথম কথা আমি রামবাবু নই। দ্বিতীয় কথা, আমি ভুল করে পিলখানায় চলে এসেছি। রিকশোলা–
ভুল কীসের? পিলখানার এখন সে দিন নেই, তাই! এক সময় এখানে নবাবের তিরিশটা হাতি বাঁধা থাকত! তাই পিলখানা নাম। পিল মানে হল গিয়ে হাতি এলিফ্যান্ট। বৃদ্ধ আবার খি-খি করে হাসলেন। এখন হাতি নেই। তার বদলে আমরা আছি। আমি, কেষ্টা, গোবর্ধন, আর ওই হরি। হরি একটু পরে আসবে। হরি না হলে জমে না! অ গোবরা, দেখে যা কে এসেছেন!
পেছনের দিকে কোত্থেকে কেউ খ্যানখেনে গলায় বলল,–কে, দাদুমণি?
বৃদ্ধ বললেন, রামবাবুরে রামবাবু! মানে–আমাদের বড়বাবু। বুঝলি তো?
–যাচ্ছি, দাদুমণি!
ওরে অ কেষ্টা, হরিকে গিয়ে বল রামবাবু এসে গেছেন।
আমি ভাবলুম, ভুলটা যখন ভাঙছে না এঁদের, না ভাঙুক। বৃষ্টিরাতে এককাপ গরম চা ছাড়ি কেন? তারপর ব্যাপারটা কোথায় গড়ায়, দেখা যাক!
চা খেতে থাকলুম। বৃদ্ধ বললেন,–হ্যাঁ-যেজন্য খবর দিয়েছিলুম। ওর আসার আগে তার গোড়াপত্তন করা যাক। কথা হল ওই ভগলু কে নিয়ে।
–ভগলু কে?
–সেটাই তো বুঝতে পারছি না। শুনেছি, ওপাশের ওই কবরখানার একটা গাছে কোত্থেকে এসে আড্ডা নিয়েছে। তা–
–গাছে গাছে কেন?
–মাটি জুড়ে তো কবর। মুসলমানরা ওকে থাকতে দেবে কেন? ও তো হিন্দু। তাই খুব ঝগড়া হয়েছিল। শেষে রফা হয়েছে, গাছে তো আর কবর নেই। কাজেই গাছে ভগলু আস্তানা করতেই পারে।
–বেশ! তারপর?
–তা ভগলুর নাকি গাছে থেকে বৃষ্টিতে ভিজে খুব কাশি হচ্ছে। সারারাত খকখক করে কাশে। তাই আমাদের এই পিলখানায় আশ্রয় চায়। এদিকে কেষ্টাদের তাতে আপত্তি। ভগলুটা নাকি বেজায় নোরা। ভগলু সেটা বুঝতে পেরে রোজ রাতে ঢিল ছুঁড়ছে। তিষ্ঠোনো যায় না।…
বলার সঙ্গে-সঙ্গে খুট করে একটা ঢিল পড়ল তফাতে। তিন দিক খোলা ঠাকুরদালানের মণ্ডপের মতো চত্বর। ঝটপট সরে বসলুম। বৃদ্ধ চেঁচিয়ে উঠলেন, এই শুরু হল! কেষ্টা! গোবরা!
কেষ্টাকে দেখেছি। গোবরাকে দেখলুম। একটা প্রকাণ্ড কুমড়ো বললেই চলে। পরনে কেষ্টার মতোই হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি। দুজনে এসেই চত্বরের একদিকে দাঁড়িয়ে ঘুষি পাকিয়ে অন্ধকারের দিক লক্ষ করে চেঁচাতে থাকল, ভগলু দাঁতের পাটি খুলে নেব বলে দিচ্ছি।
বৃদ্ধ উত্তেজিতভাবে বললেন, দেখলেন তো স্বচক্ষে, রামবাবু? এজন্য আপনাকে ডাকা। এর বিহিত না করলে তো থাকা যায় না।
অনুমান করলুম, ওদিকটাই তাহলে কবরখানা। তার মানে ওটা গোবরা গোরস্তান এবং তার মানে আমাকে রিকশোওলা উল্টো দিকে এনে ফেলেছে। এবং তার মানে…
না। মাথা ঠিক রাখতে হবে। বললুম,–আপনারা শান্ত হোন। আমি দেখছি ব্যাটাকে!
কেষ্টা আমার কথা শুনে সাহস পেল যেন। ফের চাচাল ভগলুর উদ্দেশে। কী হচ্ছে রে ভোগলে! দাঁড়া রামবাবু যাচ্ছে! কে সে জানিস তো? বেনে-পুকুর থানার বড়বাবু! তোকে বেঁধে গুঁতো মারতে মারতে হাজতে নিয়ে যাবে।
অন্ধকার থেকে ভগলুর কথা ভেসে এল,–আরে যা যা! কেত্তা দারোগা হাম দেখ লিয়া। বিহার মুল্লুককা কেত্তা দারোগাভি এ ভগলুকে দেখা, তো তেরা বাঙালি দারোগাবাবু!
