গানটা বাদ। তার বদলে ঘাতক বলবে, সেনাপতিমশাই। এই বালককে আমি বরং গহন অরণ্যে নিয়ে গিয়ে গোপনে বধ করি। সেনাপতি বলবেন, তাই হোক তবে।
ঘাতক খ তুলতেই হরিপদ চঞ্চল হল। বহু বছরের অভ্যাস। গলাটা ভালোই ছেড়েছে। অসুবিধে হয়নি। খামোকা গান বাদ দেওয়া কেন?
আশেপাশে নকল হরিপদ অর্থাৎ সেই বদমাশ ভূতটাকে দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং…
হরিপদ দৌড়ে আসরে ঢুকে গেয়ে উঠল–মেরো না, মেরো না…
সঙ্গে সঙ্গে উমাপদ ম্যানেজার ছড়ি তুলে চ্যাঁচিলেন–ঢুকেছে! ঢুকেছে! মার মার। আসরের এদিক-ওদিক থেকে কারা দৌড়ে এল। তারপর হরিপদর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই মিলে।
হরিপদ ভাঙা গলায় পেঁচিয়ে উঠল,–আমি! আমি! আমি আসল হরিপদ!
কে শোনে কার কথা! কনকপুরের নায়েবমশাইরা কিংবা শ্রোতারা তো কিচ্ছু জানে না। এভাবে বেমক্কা আসর পণ্ড হচ্ছে দেখে তারা হইহই করে উঠল। আসরে ঢুকে লোকগুলোকে ধাক্কা মেরে হটাল। হরিপদ বেগতিক দেখে উঁচু তক্তাপোশের আসর থেকে গড়িয়ে ক্লারিওনেটওয়ালার কোলে পড়েছিল। সেখান থেকে একেবারে তাপোশের তলায়।
বুদ্ধি করে এখানে ঢুকেছিল বলেই তেমন হাড়গোড় ভাঙেনি।
.
তবে সেই শেষ। হরিপদ বিবেকগিরি নাক কান মলে ছেড়েছে। সবাই জানে, আর হরিপদ বিবেক গায় না। কাজেই নকল হরিপদেরও আবির্ভাব ঘটে না কোনও আসরে। সুযোগ পায় না ঢোকার। তার চেয়ে বড় কথা, খবরটা সবাই জেনে গেছে। লোভের বশে নকল সেজে আসরে ঢুকলে কী অবস্থা হবে, টের পেয়ে গেছে সেই অপদেবতা।
কিন্তু এই নকল হরিপদটা কে? ভূত তো বটেই। কিন্তু কার আত্মা?
সদাশিববাবু অনেক ভেবে-চিন্তে বললেন, মনে হচ্ছে, এ ব্যাটা সেই বাঁকা বাউরি। বুঝলে হে হরিপদ! আমাদের ছেলেবেলায় সেই বিবেক গাইত। রোগে ভুগে মারা পড়েছিল। কিন্তু অভ্যেস যাবে কোথায়? তুমি নিরীহ সরল মানুষ দেখে তোমাকে অমনি করে ঠকাত। বুঝলে তো?
হরিপদ বলল, আর বুঝিনি? সেইজন্যেই তো বিবেক হচ্ছি না। এবার থেকে আমি বরং ঘাতকের পার্টটাই করব।…
বৃষ্টিরাতের আপদ-বিপদ
আমাদের গোরাচাঁদ রোডে একপশলা বৃষ্টিতেই হাঁটু জল জমে। এদিনে বিকেল মাচারটে থেকে রাত আটটা অব্দি একটানা বৃষ্টি। খবরের কাগজের আপিসে চাকরি করি। রাত নটায় ডিউটি শেষ। বেরিয়ে দেখি, বৃষ্টি বন্ধ। কাতারে কাতারে লোক বাস-ট্রামের অপেক্ষায় এসপ্লানেড জুড়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। ভাগ্য ভালো। একটা বাসে গোত্তা মেরে ঢুকে গেলুম। আধঘন্টা পরে যখন গোরাচাঁদ রোডে বাস থামল, নেমেই দেখি অথৈ সাগর।
বাড়ি পর্যন্ত এত জল ঠেলে এগোতে হলে নির্ঘাত নিউমোনিয়া হবে। এক রিকশাওলা পাঁচ টাকা দর হাঁকল। পাঁচমিনিটের হাঁটার রাস্তার জন্য পাঁচটাকা। দায়ে পড়ে রাজি হয়ে চেপে বসলুম। রিকশাওলা টান দেওয়ার আগে ফের বলল,–কোথায় যেন যাবেন বললেন বাবু?
–থানার কাছে।
রিকশো এগোলো। একে জল, তার ওপর লোডশেডিং। টিপটিপ করে ফের বৃষ্টি ঝরাও শুরু হয়েছে। হুড তোলা আছে। পর্দাটাও নামিয়ে দিতে হল। অন্ধকারে চারদিকে খালি ঝপাংঝপাং জলের শব্দ। মাঝেমাঝে মোটর গাড়ির মৃত্যুকালীন শ্বাস টানার মতো ঘড়ঘড়ানি। একঝলক করে আলো। পর্দার ফাঁকে নোংরা নর্দমা উপচানো জলের বিদঘুঁটে হাসিমুখ। কিন্তু চলেছি তো চলেছি। বাড়ি সমান দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। ভাবছি, আহা বেচারা বিকশোওলা! পেটের দায়ে এই অমানুষিক খাটুনি খাটছে। মানুষ হয়েও জানোয়ারের মতো গাড়ি টানছে। আর আমি নবাব খাঞ্জা খায়ের মতো বসে আছি। খারাপ লাগছে, অথচ উপায় কী? একটু জলে ভেজা সহ্য হয় না। সপ্তায় দুদিন স্নান করি। একটুতেই ঠান্ডা লেগে দাঁতের গোড়া ফোলে। সর্দিকাশি এসে হামলা করে।
কিন্তু ব্যাপারটা কী? এখনও বাড়ি পৌঁছনো যাচ্ছে না কেন? পর্দার ফাঁকে উঁকি মেরে কিছু ঠাহর হল না। ঘুটঘুঁটে আঁধার। বললুম,–কোথায় এলুম হে?
রিকশোওলা বলল,–কোথায় যাবেন বললেন, যেন বাবু?
খাপ্পা হয়ে বললুম,–থানার কাছে। কতবার বলব বলোতো?
–আচ্ছা বাবু আচ্ছা। এবারে বুঝে গেছি।
–কী উজবুক লোক রে বাবা! কোথায় যাবে বোঝেনি, অথচ দর হেঁকে বসেছে পাঁচটা টাকা। পরক্ষণে ফের মায়া হল। আহা বেচারা! পেটপুরে খেতে পায় না, তাই জলের ভেতর রিকশো টানতে কষ্ট হচ্ছে। তার ওপর রাস্তার যা অবস্থা। খানাখন্দ পায়ে-পায়ে। চাকা গড়ানন সহজ তো নয়।
কতক্ষণ পরে আবার পর্দার ফাঁকে উঁকি দিলুম। তেমনি নিরেট আঁধার। কোথাও একচিলতে আলো নেই! আঁধারে জলের ঝপাং ঝপাং শব্দ। লোকেরা জল ভেঙে হাঁটছে। মাঝে-মাঝে রিকশোর ঠংঠং। কিন্তু তাহলেও এত দেরি হওয়া তো উচিত নয়। সন্দেহ হল, ঠিক শুনেছে কিনা রিকশোওলা–হয়তো বাড়ি ছাড়িয়ে বেনে পুকুর বাজারের কাছে এসে গেছি। তাই বললুম, কী ব্যাপার হে? এখনও পৌঁছনো গেল যে! ঠিক পথে যাচ্ছ তো?
রিকশোওলা বলল,–কোথায় যেন যাবেন বললেন বাবু?
যা ব্বাবা! এ যে দেখছি ভুলো মনের রাজা। খাপ্পার চূড়ান্ত হয়ে বললুম, কতবার বলব তোমাকে? অ্যাঁ? কানে শুনতে পাওনা নাকি? থানার কাছে–এ। থা—না—র—কা–ছে–এএ! চেঁচিয়ে ওর কানে ঢোকাতে চাইলুম। থানা বোঝো? থানা?
–আজ্ঞে। বুঝেছি।
বৃষ্টিটা বেড়ে গেল এতক্ষণে। কুঁকড়ে বসে রইলুম। আবার অন্ধকার জলে নানারকম শব্দ। ঠং-ঠং রিকশোর আর্তনাদ। খানাখন্দে চাকা আটকে যাচ্ছে মাঝে-মাঝে। আরও কিছুক্ষণ পরে চেঁচিয়ে বললুম,–এখনও থানার কাছে পৌঁছতে পারলে না? ব্যাপারটা কী?
