ওদিকে প্রথম সিন শুরু হয়েছে। সাজঘরের দিকে কে ডাকাডাকি করছে, হরিপদ! হরিপদ কোথায় গেল! ও হরিপদ!
হরিপদর তখন শোচনীয় অবস্থা। এ কী সর্বনাশ হল তার।
সেই সময় আচমকা আসরে কেউ গান গেয়ে উঠেছে–আমার মায়ের রূপ দেখে যা–এবং সঙ্গে সঙ্গে আসর চুপ। টুঁ শব্দটি আর নেই।
হরিপদ ঘুরে দেখে শিউরে উঠল,–হ্যাঁ, আসরে অবিকল আরেক হরিপদ তিড়িং করে নেচে গান ধরেছে তারই গলায়। হুবহু এক চেহারা, পোশাক, গলার স্বর এক। এতটুকু তফাত নেই। দেখতে-দেখতে প্রথম মুহূর্তের ভয়টা কেটে গেল হরিপদর। রাগ হল। রাগটা বাড়তে থাকল। দাঁতে দাঁতে চেপে হরিপদ আসরের নকল হরিপদর দিকে হিংস্র চোখে তাকাল।
তারপর সে এক লাফে নির্জন অন্ধকার জায়গাটা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসরে ঢোকার পথে গিয়ে পড়ল এবং চেঁচিয়ে বলার চেষ্টা করল আমি না আমি না।
গলার স্বর বেরুল না। তাকে লোকেরা ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। তার দিকেওদের চোখ থাকার কথা না। সবার চোখ এখন আসরে। এ কোন ব্যাটা পাগল ছাগল আসার পণ্ড করতে চাইছে রে বাবা!
হরিপদ আছাড় খেয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ দেখল শেষ দিকটায় একটা বাড়ির বারান্দায় বসে সদাশিববাবু যাত্রা শুনছেন। মরিয়া হয়ে দৌড়ে গেল হরিপদ।
খুডোমশাই বলে যে ডাকবে, তার উপায় তো নেই। সে সটান হুমড়ি খেয়ে পাশে বসে ওঁকে খুঁচিয়ে দিল। সদাশিববাবুর মন এখন আসরে। বিরক্ত হয়ে কনুইয়ে গুঁতো মারলেন। হরিপদ তাতে দমল না। ফের হামাগুড়ি দিয়ে ওঁর সামনে যাবার চেষ্টা করল। সদাশিববাবু এবার পাশ থেকে ছড়িটা তুলে চাপা গলায় বললেন, কে র্যা? খালি ভেড়ার মতো গুতোচ্ছে? দেব পেটটা ফাঁসিয়ে।
হতাশ হয়ে হরিপদ লোকের পেছন ঘুরে সাজঘরের কাছে গেল, নকল হরিপদর গান শেষ। ফিরে আসছে। হরিপদ তাকে ধরে ফেলবে বলে ওৎ পেতে রইল। ভূত হোক, আর যাই হোক হাতাহাতি করে একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।
নকল হরিপদ আসর থেকে এসেই লোকের পেছন দিকে নিরিবিলি অন্ধকার জায়গাটায় চলে গেল। তারপর বেনিয়ানের পকেট থেকে বিড়ি বের করে দেশলাই জ্বেলে ধরাল। টানতে থাকল।
হরিপদ পা টিপে টিপে তার কাছে গেল। তারপর পেছন থেকে দুহাতে জাপটে ধরল। ফ্যাঁসফেঁসে গলায় অতি কষ্টে বলল-তবে রে ব্যাটা ঘুঘু।
নকল হরিপদ বলল–আঃ! হচ্ছেটা কী? এ কি ইয়ার্কির সময়?
এদিকে হরিপদ ওকে জাপটে ধরেই টের পেয়েছে, নকল হরিপদর গা বরফের চেয়ে হিম। সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছে। দুহাত জমে গেছে ঠান্ডায়। দাঁত ঠকঠক করে কাঁপছে।
নকল হরিপদ হাসতে-হাসতে সাজঘরের দিকে চলে গেল। আসল হরিপদ দেখল, কাপুনি থামছে না। কী শীত কী শীত। অগত্যা সে বাড়ির দিকে দৌড়ল, এক্ষুনি লেপ ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়া দরকার।
.
গাঁয়ের শেষ দিকটায় হরিপদর বাড়ি। পিসিমার হাতে মানুষ হয়েছে সে। বাড়িতে বলতে লোক ওই দুজন। বেলা অব্দি হরিপদ সেদিন শুয়ে আছে লেপ মুড়ি দিয়ে। পিসিমা ওঠাতে গিয়ে দেখলেন, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। তাই ডাক্তার ডাকতে গেছেন।
কিছুক্ষণ পরে পিসিমার মুখে শুনেই যাত্রাদলের লোকেরা ব্যস্ত হয়ে গেল। ম্যানেজার উমাপদবাবু এলেন। সদাশিবখুড়োও এলেন।
উমাপদবাবু বললেন,–জুর যে হবে, তা আসরে চোখ দুটো দেখেই সন্দেহ হয়েছিল, কেমন লাল দেখাচ্ছিল। তবে এ আসরে যা গান গেয়েছে হরিপদ, এবার না কলকাতা থেকে ডাক আসে।
সদাশিব ডাকলেন,–ও হরিপদ! কেমন বোধ করছ?
হরিপদ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল, যান। আর দয়া দেখাতে হবে না। খুব চিনে ফেলেছি সবাইকে।
সদাশিববাবু অবাক। উমাপদ বললেন, সৰ্ব্বনাশ! তোমার গলা ধরে গেছে দেখছি। পরশু এক আসর বায়না আছে কনকপুরে, কী হবে?
হরিপদ তেমনি ফাঁসফেঁসে গলায় বলল, কেন? গত রাতে যে আসর চালিয়েছে, সেই চালাবে, আপনার ভাবনা কী ম্যানেজারবাবু?
উমাপদ কী বলতে যাচ্ছিলেন, সদাশিববাবু চোখ ইশারা করলেন। তারপর বললেন,–ও হরিপদ, তাহলে কাল রাতের আসরে তুমি কখানা গান গেয়েছিলে?
হরিপদ বুড়ো-আঙুল দেখিয়ে বলল,–একখানাও না। ও-ব্যাটা সবগুলো গেয়েছে। দেখছেন না, আমার গলার অবস্থা।
সদাশিববাবু চিন্তিত মুখে বললেন, তাহলে তো ভাবনার কথা। তোমার সত্যি বড় বিপদ।
উমাপদ হতভম্ব। বললেন, ব্যাপারটা কী?
বাইরে এসো। বলছি। বলে সদাশিববাবু উপাপদকে ডেকে নিয়ে গেলেন।
.
সামান্য ঠান্ডা লাগা জ্বর। দুদিনেই ছেড়ে গেল। ওষুধ খেয়ে গলা ছাড়ল। সেদিনই কনকপুরে আসর! হরিপদকে যেতেই হল। সে খানতিনেক গান কোনওরকমে গাইবে। বাকি গান বাদ।
আসর যথাসময়ে শুরু হয়েছে। উমাপদ তক্কেতক্কে আছেন। দলের লোকও তাঁর কথামতো তৈরি আছে।
পরপর তিনখানা গান হরিপদ গেয়ে এল। তারপর তৃতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে বিবেকের গান বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কথাটা গোপন রাখা হয়েছে নায়েকমশাই অর্থাৎ কনকপুরে যারা বায়না দিয়েছেন, তাঁদের কাছে। হরিপদ গানের পর সাজঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সেও তক্কেতক্কে আছে তৃতীয় অঙ্কে যদি নকল হরিপদ বিবেক সেজে গাইতে ঢোকে, উমাপদ এবং তার লোকজনের সঙ্গে সেও ধুন্ধুমার বাধাবে। অর্থাৎ নকল হরিপদকে সবাই মিলে রামধোলাই দেবে। কথায় বলে, মারের চোটে ভূত পালায়। কাজেই এই ব্যবস্থা।
সেই সিনটা এসে গেল। কুচক্রী সেনাপতি ঘাতককে আদেশ দিচ্ছেন, বধ করো বধ করা এই উদ্ধত বালককে! ঘাতক খ তুলেছে। এই সময় বিবেকের গান ছিল : মেরো না মেরো না, ও যে শিশু অসহায়…।
