যে-বারান্দায় লণ্ঠন জ্বলছিল, সেখান থেকে কেউ হেঁড়েগলায় ধমক দিল, চো-ও-প সব! চো-ও-প!
হল্লাটা থেমে গেল। তখন সে ঘোড়ার কাছে এল। হাতের লণ্ঠন তুলে পণ্ডিতমশাইকে দেখে বলল, ডাক্তারবাবু, আপনার ব্যাগ দেখছিনে যে?
এবার পণ্ডিতমশাই অতিকষ্টে শুধু বললেন,–জল।
লোকটা হাঁক ছাড়ল, ওরে, জল নিয়ে আয়!
তক্ষুনি এক ঘটি জল এসে গেল। পণ্ডিতমশাই টের পেলেন জলটা বেজায় ঠান্ডা-হিম! তা হোক! ঢকঢক করে খেয়ে চোখে-মুখে ছড়িয়ে একটু সুস্থ হলেন। বললেন,–আমাকে নামাও বাবাসকল! তারপর সব বলছি।
কয়েকজন মিলে তাকে চ্যাংদোলা করে নামাল। মনে হল, গায়ের চাষি মানুষজন দিনমান জলকাদায় মাঠে কাজ করেছে, তাই এখনও হাতগুলো জলটার মতোই ঠান্ডা হিম।
লণ্ঠনের আলোটা খুব কম। স্পষ্ট করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। যেটুকু দেখা গেল, বারান্দাটা পাকা। বাড়িটাও পাকা ও দোতলা। কিন্তু পলেস্তারাখসা পুরোনো বাড়ি। জরাজীর্ণ অবস্থা বোঝা যায়। বারান্দাতেও ফাটল ধরেছে। লণ্ঠনধারী লোকটি ঢ্যাঙা, রোগাটে গড়ন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। প্রৌঢ় বলা চলে। মাথায় কাঁচাপাকা সিঁথে করা লম্বা চুল। ঘরে পণ্ডিতমশাইকে ঢুকিয়ে পিছু ফিরে বললেন,–ওরে, ডাক্তারবাবুর ঘোড়াটা দেখিস!
বাইরে থেকে সাড়া এল,–দেখছি বাড়ুজ্যেমশাই! ভাববেন না।
পণ্ডিতমশাই নমস্কার করে বললেন, আপনি ব্রাহ্মণ?
পালটা নমস্কার করে তিনি বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি?
পৈতে দেখিয়ে পণ্ডিতমশাই করুণ হাসলেন। বললেন,–আর বলবেন না।
যাচ্ছিলুম একখানে, এসে পড়লুম আর একখানে। ওই পাষণ্ড টাট্টু…
কথা কেড়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন,–শুনেছি বটে! আপনাকে না দেখলেও যেমন আপনার কথা শুনেছি, তেমনি আপনার টাট্টুর কথা শুনেছি। আপনি নাকি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি! কী সৌভাগ্য, আপনাকে পাওয়া গেল ডাক্তারবাবু!
পণ্ডিতমশাই হাত নেড়ে বললেন,–গণ্ডগোল হয়ে গেছে। গণ্ডগোল হয়ে গেছে।
কী গণ্ডগোল বলুন তো ডাক্তারবাবু? ব্যাগটা পড়ে গেছে তো? এক্ষুনি লোক পাঠাচ্ছি খুঁজতে। আপনি আগে রুগিকে দেখুন। আপনি চোখে দেখলেই আদ্ধেক সেরে যাবে। বাকি আদ্ধেক ইঞ্জেকশনে। আগে একটু জিরিয়ে নিন।
পণ্ডিতমশাই একটা নড়বড়ে চেয়ারে ধপাস করে বসে বললেন,-না-না! আপনি ভুল করছেন। আমি বঁটু-ডাক্তার নই।
অদ্ভুত হেসে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন,–তা বললে কি চলে? এলাকা জুড়ে প্রবাদবাক্য চালু হয়ে গেছে জানেন তো?
যেখানে দেখবে টাট্টু
পিঠে ডাক্তার বাঁট্টু।
ঘুরে খটখট শব্দ
শুনে আন্ত্রিক জব্দ৷৷
পণ্ডিতমশাই জোরে মাথা নেড়ে বললেন, ভুল! ভুল! আমি হলুম ভেঁটু ভটচাজু।
বাঁড়ুজ্যেমশাই জোরে মাথা নেড়ে বললেন,-তা বললে চলে? পায়ে হেঁটে এলে বুঝতুম, বাটুবাবুর বদলে ভেঁটুবাবুই না হয় এসেছেন।
পণ্ডিতমশাই রাগ করে বললেন, খবরদার, ভেঁটু বলবেন না!
এই সময় বাইরে কে খ্যান-খ্যান গলায় চেঁচিয়ে উঠল, বাঁড়ুজ্যেমশাই, আপনার জামাই টাট্টুর পিঠে চেপে পালিয়ে যাচ্ছেন!
বাঁড়ুজ্যেমশাই হাঁক ছাড়লেন, ধর! ধর! ধরে আন!
আবার হল্লার শব্দ। অন্ধকারে ধাপধুপ শব্দে দৌড়াদৌড়ি। ধর! ধর! পালাল! পালাল!
পণ্ডিতমশাই বললেন,–ওই যাঃ! ঘোড়াটা।
তাঁকে থামিয়ে বাড়জ্যেমশাই বললেন,–ভাববেন না। এক্ষুনি ধরে ফেলবে।
–কিন্তু ব্যাপারটা কী? আপনার জামাইবাবাজি অমন করে পালালেন কেন?
গম্ভীর হয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়। আন্ত্রিক রোগের ভয় হয়েছে বাবাজির। পালানোর ধান্দায় আছে টের পেয়ে পেছনে লোক লাগিয়ে রেখেছিলুম। এই সুযোগে কেটে পড়েছে। কিন্তু যাবে কোথায়?
বলে তিনি পা বাড়ালেন ভেতরের দিকে। কই, আসুন। আগে রুগি দেখে নিন। তারপর প্রেসক্রিপশন, ইঞ্জেকশন ওসব হবে। আসুন, আসুন!
পণ্ডিতমশাই মরিয়া হয়ে বললেন, আমি ডাক্তার নই। যজমেনে-বামুন।
–তাতে কী? আমরাও যজমেনে বামুন ছিলুম। নইলে এই মুখদের গ্রামে কী কেউ বাস করতে আসে? আসুন? আসুন! যজমেনে বামুনেরা কি আজকাল ডাক্তার হচ্ছে না?
পণ্ডিতমশাই কাঁদকাঁদ হয়ে বললেন,–কিন্তু আমি যে ডাক্তারির কিসসু জানিনে।
জানার দরকার নেই। চাপা গলায় বাড়জ্যেমশাই বললেন, আপনাকে দেখলেই গিন্নির আন্ত্রিক সেরে যাবে। পথ তাকিয়ে শুয়ে আছেন। খালি বলেন, কই! বঁটু-ডাক্তার তো এলেন না! ওকে নাকি কল দিয়ে আসিনি বলে আমাকে শাসান। আমার হয়েছে জ্বালা।
ফিসফিস করে এসব কথা বলতে বলতে সিঁড়িতে উঠছিলেন তিনি। একটা হাতে পণ্ডিতমশাইয়ের একটা হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেছেন। অন্য হাতে লণ্ঠন। ওপরতলার বারান্দায় উঠে পণ্ডিতমশাই বললেন, আপনার হাতটা বিচ্ছিরি ঠান্ডা কেন বলুন তো?
বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, যা বিষ্টিবাদলা আর আন্ত্রিক।
–আন্ত্রিকের সঙ্গে ঠান্ডার কী সম্পর্ক?
পণ্ডিতমশাইয়ের দিকে ঘুরে তিনি বললেন,–চুপ! চুপ! ওসব কথা বলতে নেই।
অন্ধকার ঘরের ভেতর প্রকাণ্ড সেকেলে খাট। তাতে গলা অবধি চাদর মুড়ি দিয়ে চিত হয়ে এক ভদ্রমহিলা শুয়ে আছেন। বাঁড়ুজ্যেমশাই লণ্ঠনটা তুলে ধরে বললেন,–ওগো, শুনছ? বাঁট্টুবাবু এসেছেন!
বাঁড়ুজ্যেগিন্নি চোখ খুলে তাকালেন। তারপর একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন।
বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, নাড়ি দেখতে বলছে। দেখুন তো! নইলে কেলেঙ্কারি বাধাবেন।
পণ্ডিতমশাই নাড়ি দেখতে জানেন না। কিন্তু উপায় নেই। নাড়ি দেখার ভঙ্গিতে বাঁড়ুজ্যেগিন্নির হাতটা ধরতেই নিজের হাত হিম হয়ে গেল। কী ঠান্ডা! চোখদুটোই বা অমন নিষ্পলক কেন?
