বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, নাড়ি টের পাচ্ছেন?
পণ্ডিতমশাই ভয়েভয়ে বললেন,–পাচ্ছি, আবার পাচ্ছি না। কিন্তু এঁর হাত দেখছি আপনার চেয়েও ঠান্ডা!
ফিক করে হেসে বড়জ্যেমশাই বললেন,–তা তো হবেই। বুঝলেন না? আমার তিনদিন আগে ফেঁসে গেছেন।
পণ্ডিতমশাই অবাক হয়ে বললেন,–কেঁসে গেছেন মানে? ওই তো দিব্যি তাকাচ্ছেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন।
অভ্যেস! বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, ডাক্তার দেখলেই হাত বাড়ানো অভ্যেস। কথায় বলে অভ্যেস যায় না মলে।
–মরলে–মানে মৃত্যু হলে?
–আবার কী?
পণ্ডিতমশাই এক-পা দু-পা পিছোতে-পিছোতে বললেন, তার মানে উনি মড়া?
বাসি। আমার চেয়েও তিনদিনের বাসি।
–সর্বনাশ!
বাঁড়ুজ্যেমশাই মুচকি হেসে বললেন, সর্বনাশ কীসের? যতক্ষণ না আপনার ব্যাগ খুঁজে আনছে ওরা, বসুন এখানে। ততক্ষণ আপনাকে বেহালা বাজিয়ে শোনাই বসুন। বসুন! ওই দেখুন দেওয়ালে আমার বেহালা ঝুলছে। সাধে কি এমন চুল রেখেছিলুম? বেহালা বাজালে ঠিক এইরকম চুল রাখতে হয়।
পণ্ডিতমশাই কঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আপনি বেহালা বাজান নাকি?
বাজাতুম!–বেহালা পেড়ে নিয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, যাত্রাদলে বেহালা বাজাতুম।
–বাজাতুম! তার মানে?
–দল উঠে গেল।
–কেন? কেন?
আবার কেন? আন্ত্রিক! আন্ত্রিকে গাঁসুষ্ঠু লোক বাকি কথাটা শোনা গেল না বেহলার কাঁক-কো সুরে। সুরটা কেমন যেন রাতবিরেতে বাঁশবনের শব্দর মতো, অস্বস্তিকর।
ওদিকে বাঁড়ুজ্যেগিন্নির সেই হাতটা একই অবস্থায় বেরিয়ে উঁচু হয়ে আছে তো আছেই। চোখদুটো পণ্ডিতমশাইয়ের দিকে। পণ্ডিতমশাই ততক্ষণে যা বোঝবার বুঝে গেছেন। যেই বাড়জ্যেমশাই বেহালা বাজাতে-বাজাতে সুরের আবেগে চোখ বুজেছেন, অমনি তিনি পা টিপে টিপে দরজার কাছে।
বাঁড়ুজ্যেগিন্নি চির্চি করে বলে উঠলেন,–পালিয়ে যাচ্ছে যে!
বাঁড়ুজ্যেমশাই সুরে তন্ময় হয়ে আছেন। শুনতে পেলেন না। সেই সুযোগে পণ্ডিতমশাই পড়ি-কি-মরি করে বাইরে এবং সিঁড়ি দিয়ে অন্ধকারে গড়াতে-গড়াতে নিচে।
তারপর বেরিয়েই দৌড়। সেই টাট্টুর মতো দৌড়। একেবারে দিশেহারা।
একটু পরে পেছনে হপ্পা শুনলেন, ধর! ধর! পালাচ্ছে! ডাক্তার পালাচ্ছে।
অমাবস্যার রাতে পণ্ডিতমশাই রামনাম জপতেজপতে জলকাদা ভেঙে দৌড়তে থাকলেন।…
ভোর হয়ে আসছে।
গায়ে আর এতটুকু জোর নেই পণ্ডিতমশাইয়ের। ধুতি-ফতুয়া কাদায় বিচিত্তির। চুলে কাদা, হাত-পায়ে কাদা। থপথপ করে পা ফেলে হাঁটছেন। মাঝে-মাঝে একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন।
দিনের আলো আরও একটু পরিষ্কার হল। কঁচা রাস্তার দুধারে গাছ। ধানক্ষেত। একটা গাছের তলায় কেউ বসে ছিল। তাকে দেখামাত্র ওরে বাবা বলে দৌড়নোর উপক্রম করল সে।
পণ্ডিতমশাই হাত তুলে চেঁচিয়ে বললেন, মানুষ! মানুষ! আমি ভূত নই! মানুষ!
এক যুবক। পরনের প্যান্ট-শার্টের অবস্থা পণ্ডিতমশাইয়ের মতো। সে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, মা কালীর দিব্যি?
পণ্ডিতমশাই বললেন, মা কালীর দিব্যি!
যুবক সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকিয়ে বলল, আসা হচ্ছে কোথা থেকে?
–বেহালা বাজিয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের বাড়ি থেকে।
ওরে বাবা! দিনের বেলা এতদুরেও লোক পাঠিয়েছে! –বলে যুবকটি আবার দৌড়নোর জন্য পা বাড়াল।
পণ্ডিতমশাই ঝটপট বললেন,-বাবাজি! তোমায় চিনেছি। তুমিই তাহলে বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের সেই পলাতক জামাই? শোনো, শোনো, আমি সত্যিই মানুষ।
–তা হলে রামনাম করুন।
–রাম রাম রাম রাম রাম…
বাঁড়ুজ্যের জামাই ফিক করে হেসে বলল, –থাক, থাক। বুঝেছি। তাহলে আপনিই সেই বাঁট্টুবাবু-ডাক্তার?
–ধুস! আমি ভেঁটু ভটচাজ। লোকে বলে পণ্ডিতমশাই। বাঁটু-ডাজারের টাট্টু চুরি করেই তো বিপদে পড়েছিলুম!
বিপদ তার চেয়ে আমারই বেশি, পণ্ডিতমশাই!–বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের জামাই করুণ মুখে বলল, অবস্থা বুঝুন! গাঁসুদ্ধ মড়া। আমার শ্বশুরমশাই, শাশুড়িঠাকরুন পর্যন্ত। অথচ আমাকে নড়তে দেবেন না শ্বশুরমশাই। কারণ আমি যে ঘরজামাই। আমাকে ভিটে আগলাতে হবে।
এতক্ষণে প্রাণভরে হাসতে পারলেন পণ্ডিতমশাই। বললেন,–তা বাবাজি, টাষ্ট্রব্যাটাচ্ছেলে কোথায় গেল?
–বলা কঠিন। অন্ধকারে আমাকে পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে উধাও।
–চলো, বাবাজি! কথা বলতে বলতে এগোই।
পণ্ডিতমশাই। আমার শ্বশুরমশাই আর গাঁয়ের লোক যে ভূত হয়ে রইল?
পণ্ডিতমশাই বললেন,–ভেবো না। গয়ায় তোমাকে নিয়ে গিয়ে পিণ্ডদান করালেই হল। সব পৃথিবী ছেড়ে প্রেতলোকে চলে যাবে। কিন্তু বাবাজি, বউমাকে তো দেখলুম না?
–আমার মামাশ্বশুর গয়ায় স্টেশনমাস্টার। এখন মনে হচ্ছে, ভাগ্নির পিণ্ড দিয়েছেন। তাই আমিও আপনার বউমাকে দেখতে পাইনি।
এবার পাকারাস্তার মোেড় এসে গেল। রাস্তা চিনতে পেরে পণ্ডিতমশাই বললেন,–চলো বাবাজি। আপাতত আমার বাড়ি গিয়ে দুমুঠো খাবে। তারপর দুপুরের ট্রেনে দুজনে গয়াযাত্রা করব।
গ্রামের দিঘিতে স্নান করে জলকাদা ধুয়ে নিয়ে দুজনে ঘাটে নামলেন। নেমেই পণ্ডিতমশাইয়ের দৃষ্টি গেল ওপারের জলের ধারে। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,–ওই দ্যাখো! ওই সেই পাষণ্ড পামর চতুষ্পদ হতচ্ছাড়া! রামছাগল!
বাঁট্টু-ডাক্তারের সেই টাট্টুই বটে। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে গম আর ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে। সবে বরাদুর উঠেছে। বুদ্ধিমান টাট্টু। দিব্যি চান করেও নিয়েছে।
বিবেকবধের পালা
রিপদ মনমরা হয়ে বেড়াচ্ছে দেখে সদাশিববাবু জিগ্যেস করলেন,-কী হে হরিপদ? অসুখবিসুখ নাকি?
