তবে সবখানেই আন্ত্রিক রুগি। বিষ্ণুপুরের লোকেরা খুশিই হয়। ডাক্তারও রুগি পেয়ে খুশি হন।
পণ্ডিতমশাই গড়নে বাঁট্টুবাবুর দোসর। পরনে অবশ্য খাটো ধুতি আর হাতকাটা ফতুয়া। মাথায় দেখার মতো টিকি। স্কুলে রিটায়ার করেছেন কবে। তারপর থেকে পেশা যজমানি। এ-গাঁ সে-গাঁ থেকে পুজোআর্চায় ডাক আসে। তাই তারও বাহনের অভাবে বড় অসুবিধে। জলকাদা ভাঙা এবয়সে কষ্টকর।
বাঁট্টুডাক্তারের টাট্টু নিয়ে মুখে যতই রসিকতা করুন, ব্যাপারটা দেখার পর তাকেও ঘোড়ারোগে ধরেছিল। ভাবতেন, যেমন-তেমন একটা ঘোড়া পেলে ভালো হয়। কিন্তু ঘোড়ার যা দাম, তার পক্ষে ঘোড়া কেনা সম্ভব নয়। এক ভরসা, শীতের শেষে পাহাড়ি মুলুকের জাঁতাওয়ালারা যদি আসে এবং দৈবাৎ একটা রোগাভোগা ঘোড়া কম পয়সায় পেয়ে যান, ডাক্তারবাবুর মতোই।
পেলে দানাপানি খাইয়ে তাজা করে ফেলবেন। বাঁট্টুবাবুর মতো মাঠে কি জলার ধারে চরে নিজের আহার নিজেকে খুঁজতে দেবেন না। ডাক্তার বড় কঞ্জুস!
তখন সদ্য শরৎকাল চলেছে। বিচ্ছিরি বিষ্টিবাদলা, জলকাদা। কবে ফাল্গুন আসবে, তখন পাহাড়ি লোকেরা এসে যাবে। আজকাল আঁতার চল কমে গেছে। তবে শিল-নোড়ার চাহিদা আছে। পণ্ডিতমশাই প্রতীক্ষায় ছিলেন।
দেখতে-দেখতে কালীপুজো এসে গেল। প্রায় ছকিলোমিটার দূরে কালীপুরে এক যজমানবাড়ি আছে। পণ্ডিতমশাই তাদের কালীপুজোর পুরুত। প্রত্যেক বছর অবশ্য গোরুর গাড়ি পাঠায়। এবার ওই এলাকায় বন্যা হয়েছিল। রাস্তা ভেঙে-টেঙে ধুয়ে গেছে। জলকাদায় গাড়ি আসবে না।
কিন্তু তোক তো আসবে। পায়ে হেঁটেই যাবেন বরং। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল এল। যজমানবাড়ি থেকে লোক এল না। বংশানুক্রমে যজমান ওরা। এমন তো হওয়ার কথা নয়। বন্যায় মূর্তি গড়িয়ে পুজো না করতে পারুন, শাস্ত্রে ঘটপুজোর বিধি আছে না! গৃহদেবীর বাৎসরিক পুজো না হলেই অকল্যাণ। দিনে দিনে পাষণ্ড, নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে লোকেরা। পণ্ডিতমশাই ভাবলেন, নির্বোধ। তাই শাস্ত্রবিধি জানে না। বরং নিজে গিয়ে ব্যবস্থা করবেন পুজোর। আজই অমাবস্যা। পণ্ডিতমশাই বেরিয়ে পড়লেন। দিন ফুরিয়ে আসছে। আর তো দেরি করা যায় না। অতখানি পথ।
গ্রামের শেষে দিঘি। দিঘির পাড় দিয়ে পায়ে-চলা পথ। পণ্ডিতমশাই হঠাৎ দেখতে পেলেন, বাঁট্টুবাবুর টাট্টুটি জলের ধারে তখনও ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে। অমনি থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন।
জলকাদা ভেঙে বাঁট্টুডাক্তার যদি কাহা-কঁহা মুল্লুক ওই টাট্টুর পিঠে চেপে ঘুরতে পারেন, তিনিই বা পারবেন না কেন? বেগড়বাই করলে ছাত্রদের যেমন কান টেনে শাস্তি দিতেন এবং আকর্ণ হেসে বলতেন, কান টানলেই মাথা আসে, মাথা এলেই বুদ্ধি আসে, তেমনি টাট্টুব্যাটার কান টেনে শায়েস্তা করবেন।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে পণ্ডিতমশাই নেমে গেলেন। হাতে একটি যষ্টি আছে। সাপখোপের ভয়, জলকাদায় আছাড় খাওয়ারও ভয়। সেজন্যই এই যষ্টি। আস্ত বাঁশের খেটে। এটাই ছিপটির কাজ দেবে।
ঘোড়াটিকে গুঁতো মেরে জলের ধার থেকে ওঠালেন। দেখলেন, বেশ শান্ত মেজাজের প্রাণী তো! আসলে বাঁট্টুডাক্তার খামোকা ওকে ছিপটি মারতেন বলেই অমন করে দৌড়ত।
পণ্ডিতমশাই তার গায়ে হাত রেখে আদর করে সাধুভাষায় বললেন,–বংসে! পুর্ণকর্মে গমন করিলে পুণ্যলাভ হইবে। প্রচুর চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় হেঁ-হে-হেঁ…! তোমার উচ্চৈঃশ্রবার ন্যায় সুচিক্কন বপু হইবে, হে-হে-হেঁ…!
টাট্রটি বোধ করি আনন্দে বিকট হ্রেষাধ্বনি করল, চিঁ হিঁ হিঁ হিঁ… এ যাবৎ তার হ্রেষাধ্বনি শোনা যায়নি। পণ্ডিতমশাই এক লাফে তার পিঠে চাপলেন। এমন যার হাঁকডাক, তার গায়ে জোর আছে বইকী!
লাগামছাড়া টাট্টু। আচমকা পিঠে ওজনের হেরফের টের পেয়ে থাকবে। তক্ষুনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দৌড়ল। পণ্ডিতমশাই অমনি ঝুঁকে তার গলা জড়িয়ে না ধরলে আছাড় খেতেন। সামলে নিয়ে তাকে কালীপুরমুখী করতে লাঠির গুতো মারলেন। টাট্টু আরও ভয় পেয়ে দিশেহারা হয়ে দৌড়ল।
তারপর আর থামবার নাম নেই। আবছা আঁধার, জলকাদা ভেঙে পক্ষীরাজের মতো যেন ডালা মেলে উড়ছে। দেখতে-দেখতে আঁধার ঘনিয়ে এল। পণ্ডিতমশাই তাকে যত থামানোর জন্য তো মারেন, তত তার গতি বাড়ে। শেষে তিনি হাল ছেড়ে দিলেন।
অমাবস্যার রাত্তির। ঘুটঘুটে রাত্তির। দূরে একটা আলো জুগ-জুগ করছিল। ঘোড়াটা সেই আলোর দিকেই ছুটছে মনে হল পণ্ডিতমশাইয়ের। ততক্ষণে ঝাঁকুনিতে তার কোমরে ব্যথা ধরে গেছে। হাড় মটমট করে নড়ছে। জীবনে কখনও ঘোড়ায় চড়েননি। তাও জিন নেই ঘোড়ার পিঠে, পাদানি নেই। ঝুলন্ত পা দুখানিও জল কাদা কাটাখেচে একেবারে বিচিত্তির। হাতের লাঠিটাও কখন গেছে পড়ে। দু-হাতে ঘোড়ার গলা আঁকড়ে উবু হয়ে আছেন পণ্ডিতমশাই।
আলোর কাছাকাছি গিয়ে বাঁট্টুবাবুর টাট্টুর গতি কমল।
একটা গ্রামই বটে। দুধারে ঘরবাড়ি আবছা দেখা যাচ্ছে। একটা বারান্দায় লণ্ঠন জ্বলছিল। ঘোড়াটি সেখান গিয়ে থামল এবং বিকট ডাক ছাড়ল, চি হি হি হি!
অমনি কারা চেঁচিয়ে উঠল, এসে গেছেন! ডাক্তারবাবু এসে গেছেন!
তারপর চারদিকে হল্লাএকটা সাড়া পড়ে গেল। ওরে, ডাক্তারবাবু এসে গেছেন! ইঞ্জেকশন নিবি তো চলে আয়!
পণ্ডিতমশাই কথা বলার চেষ্টা করলেন। গলা শুকনো। কথা বেরোল না।
