–কী মুশকিল! আমি হাসপাতালেও যাইনি। আপনাদের সেই জানঘর কিংবা লাসকাটা ঘরেও আমায় ঢোকানো হয়নি। আমি যাচ্ছি অনেক বছর পরে জন্মভূমি দেখতে।
ভদ্রলোক ধমক দিলেন,–চালাকি হচ্ছে? আমরা মড়া চিনি না? কী রে ওহিদ, বল না বাবা!
ওহিদ ফাঁচ করে হাসল। স্যারকে দেখেই চিনেছিলুম। নইলে কেনই বা নিজে গিয়ে সাধব?।
রেগে গিয়ে বললুম, আমি মড়া নই, জ্যান্ত মানুষ। নাড়িটা টিপে দেখুন না।
ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বললেন,-ারে ওহিদ, তাহলে কি ভুল করেছিস বাবা?
ওহিদ জোর গলায় বলল, আমার ভুল হতেই পারে না। এতকাল মড়া ঘাটছি।
ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে বললেন–দেখি, আপনার নাড়ি দেখি। বলে খপ করে আমার হাতের কব্জি ধরে ফেলতেই টের পেলুম, কী ঠান্ডা বরফের মতো ওঁর হাতটা। আর চোখের ওই দৃষ্টিআবছা জ্যোৎস্নায় জুলজলে নীল দুই চোখের দৃষ্টি।
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলন্ত রিকশো থেকে লাফ দিলুম। আছাড় খেয়েই উঠে পড়লুম! তারপর দিগ্বিদিক না দেখে দৌড়-দৌড়। পেছনে ওরা চেঁচাতে থাকল– ধর ধর। পালাল পালাল।
স্টেশনের আলো লক্ষ করে দৌড়াচ্ছিলুম। হাঁফাতে-হাঁফাতে যখন সেই চায়ের দোকানে পৌঁছলুম, বিজ্ঞ চা-ওলা হেসে বলল, জানতুম। তখন নিষেধ করলুম, শুনলেন না। সোজা ধর্মশালায় চলে যান। সকালে রওনা হবেন।
বাঁট্টুবাবুর টাট্টু
ঘোড়া ইজ ঘোড়া বাঁট্টুবাবু-ডাক্তার খাপ্পা হয়ে বললেন। এইচ ও আর এস ই হর্স; খবরদার! আর কক্ষনও আমার ঘোড়াকে টাট্টু-ফাটু বলবে না।
পণ্ডিতমশাই ফিক করে হেসে বললেন,–এই চতুস্পদ বক্ৰগতি বামন প্রাণীটিকে যদি ঘোড়া বলতে হয়, তা হলে সিঙ্গিমশাইয়ের রামছাগলটিও ঘোড়া!
বাঁট্টুবাবু-ডাক্তার তেড়েমেড়ে বললেন, তুমি পণ্ডিতমূর্খ! রামছাগলের শিং থাকে। আমার ঘোড়ার শিং আছে?
ছিল। তুমি তো ডাক্তার। অস্ত্রচিকিৎসা করে কেটে দিয়েছ।–পণ্ডিতমশাই ডিবে বের করে একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন এবং বিকট হাঁচলেন।
হয়তো হাঁচির শব্দেই ভয় পেয়ে আচমকা টাট্টু ঘোড়াটি পিঠে ডাক্তারবাবু সমেত প্রায় দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গেল। পণ্ডিতমশাই খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। ভিড় করে দাঁড়িয়ে যারা তর্কাতর্কি শুনছিল, তারাও হাসতে লাগল।
বাঁট্টুবাবুর আসল নামটা কী, এখনও অনেকে জানে না। বেঁটে গালা-্গোব্দা মানুষ বলে সবাই বাঁট্টুডাক্তার বলে। এই গ্রামের সরকারি দাঁতব্য চিকিৎসালয়ে তিনি বদলি হয়ে এসেছেন। এলাকার অবস্থা শোচনীয়। না রাস্তাঘাট না কিছু। বিষ্টিবাদলা হলেই জলকাদা। সাইকেলও চলে না। তাই বুদ্ধি করে ডাক্তারবাবু ঘোড়াটি কিনেছেন।
গুজব আছে, দূরের পাহাড়ি মুল্লুক থেকে ঘোড়ার পিঠে জাতা-শিল-নোড়া চাপিয়ে এ-তল্লাটে যারা বেচতে আসে, তাদের কাছেই নাকি বাঁট্টুবাবু ঘোড়াটি কিনেছেন। হাড়জিরজিরে একটা টাট্টুই বটে। নড়বড় করে দৌড়য়। এ-ও শোনা যায়, টাট্টু ঘোড়াটির স্বভাব বেয়াড়া বলেই আঁতাওয়ালারা তাকে কম দামে বেচে দিয়ে যায়। কেউ বলে পাঁচ টাকায়, কেউ বলে মাত্র দুটাকায়। আবার কেউ বলে, জাতাওয়ালাদের আন্ত্রিক রোগ হয়েছিল। তারই ভিজিট।
তবে এটা সত্যি, ডাক্তারবাবুর একটা ঘোড়ার খুব দরকার ছিল।
সেবার দেশে খুব আন্ত্রিক রোগের প্রাদুর্ভাব। গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে মানুষ মরছে। ডাক্তারবাবুর দম ফেলার ফুরসত নেই। ওই টাট্টুর পিঠে চেপে গায়ে-গাঁয়ে চিকিৎসা করে বেড়াচ্ছেন। লোকে তারিফও করে, এমন ডাক্তার বহুকাল তারা দ্যাখেনি। খুব শিগগির তিনি দারুণ পপুলার হয়ে উঠেছেন এলাকায়।
বাঁট্টুবাবু এমনিতে হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু কেউ তার ঘোড়ার বদনাম করলে বেজায় চটে যান। স্কুলের প্রাক্তন সংস্কৃতশিক্ষক পণ্ডিতমশাইয়ের সঙ্গে তার বেশ ভাব। পণ্ডিতমশাই বাইরে-বাইরে কাঠখোট্টা, ভেতর-ভেতর কিন্তু ভারি রসিক। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা হলেই ফিক করে হেসে বলেন, ওহে ডাক্তার, কিঞ্চিৎ শাস্ত্রবাক্য শ্রবণ করো।
–সময় নেই। কলে যাচ্ছি।
আহা, শাস্ত্রবাক্য শ্রবণে পুণ্য হয়।–পণ্ডিতমশাই আকৰ্ণ হেসে বলেন, দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত, মতান্তরে উচ্চৈঃশ্রবা। শিবের বাহন ষণ্ড। লক্ষ্মীর বাহন পেচক। গণেশের বাহন মূষিক। কার্তিকের বাহন ময়ূর। সরস্বতীর বাহন রাজহংস। শীতলার বাহন গর্দভ। আর বাঁটুর বাহন টাট্টু!
ডাক্তারবাবু বাঁকা হেসে বলেন,–তুমি খুব ভোজনরসিক শুনেছি। সিঙ্গিবাড়ির বুড়োসিঙ্গির শ্রাদ্ধে একশো আটখানা পান্তুয়া খেয়েছিলে। কিন্তু সাবধান! এটা আন্ত্রিকের সময়। আন্ত্রিকে ধরলে তখন, দেখছ তো? ব্যাগ খুলে প্রকাণ্ড ইনেশন-সিরিঞ্জ বের করে দেখান।
পণ্ডিতমশাইয়ের ইঞ্জেকশনকে বড় ভয়। ঝটপট গম্ভীর হয়ে বলেন, কিমাশ্চর্য! আমি তো তোমার স্তুতিই করলুম! নিন্দার ছলে স্তুতি! টাট্টুপৃষ্ঠে বাঁটু। কেমন অনুপ্রাস অলঙ্কার দিলুম, ভাবো।
ডাক্তার আর-একদফা শাসিয়ে টাট্টু ছোটান। বেঁটে গোস্বা মানুষের বেঁটে, বোগা টাট্টু ঘোড়াটি নড়বড় করে বক্ৰগতিতে অর্থাৎ এঁকেবেঁকে কী দৌড় দৌড়য়, দেখবার মতো দৃশ্য। দুষ্টু ছেলেরাও কখনও হল্লা করে দৌড়য়। তাতে বঁটুডাক্তারের টাট্টু ভয় পেয়ে কেলেঙ্কারি বাধায়। ডাক্তার হয়তো রুগি দেখতে যাচ্ছেন কেষ্টপুরে, তাকে নিয়ে গিয়ে তুলল বিষ্ণুপুরে।
