সর্বনাশ! বলে কী? ব্যস্তভাবে বললুমনা, না। মড়া বও তাতে কী হয়েছে?
ওহিদ প্যাডেলে আস্তে চাপ দিয়ে বলল ইস্টিশনের পেছনে মা গঙ্গা। নানা জায়গার মড়া যায় সেখানে। আমি মড়া বই। দোষ কী বলুন? তিনগুণ ভাড়া পাই। বইব না কেন? জ্যান্ত প্যাসেঞ্জার কি আমায় স্বগগে নিয়ে যাবে?
–ঠিকই তো। বরং মড়া বইলে অনেক পুণ্যি! মড়ারা তো স্বর্গের পথেই পাড়ি জমায়। আগে থেকে চেনা-জানা থাকা ভালো। নেহাং পাপ করে থাকলে তাদের কেউ কেউ স্বর্গে ঢুকতে পায় না। নরকে বেঁধে নিয়ে যায়!
ওহিদ আমার কথায় খুশি হল!–তাহলেই দেখুন! তবে আসল কথা কী জানেন স্যার? মড়া বওয়া সহজ কাজ নয়। সবাই এটা পারে না। ইস্টিশনের যত রিকশাওলা আছে, কারুর কি এ সাধ্যি হতো? হ্যাঁ, পারলে তো সবাই বইত। তিনগুণ বেশি পয়সা পেত। কিন্তু মুরোদে কুলোয় না বলেই হিংসে করে আমায়।
–তাই বুঝি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। মড়া পেসেঞ্জার নিয়ে রিকশোর প্যাডেল ঘোরানো সোজা নয়। শালারা কি ভেতরে-ভেতরে চেষ্টা করেনি কেউ? সব জানি বাবা। পারেই নি। একবার গোবর্ধন রেতের বেলায় চুপি-চুপি মড়া চাপিয়েছিল। পরদিন সকালে দেখি, রিকশো নয়নজুলির জলে উলটে পড়ে আছে মড়া সুদ্ধ। সে এক কেলেঙ্কারি।
ওহিদ খুব হাসতে লাগল। আমি বললুম,–গোবর্ধনের কী হল?
–গোবর্ধন বেগতিক বুঝে রিকশোর সিট থেকে লাফ দিয়ে পালিয়েছিল। তাই রক্ষে। তো সেই থেকে সে মড়া দেখলে সরে যায় তফাতে।
–তা ওহে ওহিদ, তুমি কীসের জোরে মড়া বইতে পারো বলো তো শুনি?
–ওহিদ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। একটু পরে বলল, আমি নিজেই এক মড়া।
–তার মানে?
–মড়া বইকী। কারণ, আমাকে একবার জানঘরে দিয়েছিল।
–জানঘর! সে আবার কী?
–বলতে গেলে সে বড্ড দুঃখের কথা স্যার। আমার পেটে শুলের ব্যামো হয়েছিল। সদর হাসপাতালে ভর্তি হলাম। দেখে থাকবেন। হাসপাতালের একধারে একটা আলাদা ঘর থাকে। রুগি মারা যাবে টের পেলে কিংবা মারা গেলে সেই ঘরে রেখে আসে। তাকে বলে জানঘর। তো আমাকে সেই জানঘরে রেখে এসেছিল ডাক্তারবাবু।
–বলো কী? তারপর?–ডাক্তারবাবু আমার নাড়ি খুঁজে পায়নি। খাবি খেতে খেতে মারা পড়েছিলুম।
–অ্যাঁ! সর্বনাশ!
–আজ্ঞে খোদার কসম। তো রোজ সকালে বউ খোঁজ নিতে যায় আর আমায় গালমন্দ করে আসে। এভাবে হাসপাতালে পড়ে থাকলে সংসারী লোকের চলে? ছেলেপুলে উপোস করে মরছে যে! বউ ভারি চটে গিয়েছিল। রোজ এসে বলত– মিনসের সব চালাকি! রিকশো টানতে আলস্যি। তাই হাসপাতালে এসে মিছিমিছি পড়ে আছে। টাইমে-টাইমে দিব্যি পেটপুরে খেতে পাচ্ছে। বউ বোজ গিয়ে গালাগালি করত। আমায় জানঘরে দেওয়া শুনে বউ আরও চটে গেল। বাড়ি থেকে একটা মুড়ো ঝটা এনে জানঘরের দরজায় গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ন্যাকামির আর জায়গা পাওনি? ওঠো, ওঠো বলছি। পড়ে আছো আর এখানে আমরা উপোস করে মরছি। না ওঠো তো, পিঠের চামড়া কঁঝরা করে দেব। এই বলে যেই আঁটা তুলেছে, আমি স্যার তড়াক করে উঠে পড়েছি।
–সর্বনাশ!
–সর্বনাশ বলে সর্বনাশ! আমার বউকে তো স্যার দেখেননি।
–তারপর কী হল?
–দেখতেই পাচ্ছেন। রিকশোয় প্যাডেল ঘোরাচ্ছি। সে হাঁ করে দম নিয়ে ফের চাঁদটা দেখার পর বলল, আমি জানঘর থেকে পালিয়ে আসা মড়া, স্যার। আমি কেন মড়ার ভয় পাব বলুন?
সে ফ্যাঁচ করে অদ্ভুত হাসল এবার। এতক্ষণে তার মুখের একটা পাশ, একটা চোখ অব্দি দেখতে পেলুম ফিকে জ্যোৎস্নায়। নীল ঝকঝকে ওই চোখ কি জ্যান্ত মানুষের? আমার গা ছমছম করল।
এই সময় হঠাৎ দেখি, আমার সঙ্গী যাত্রীটিও এতক্ষণে একটু নড়লেন এবং গলার ভেতর খিকখিক করে হেসে উঠলেন। চোখও খুললেন।
ভয়ে ভয়ে বললুম, কী হল মশাই? হাসছেন কেন?
ভদ্রলোক ভারি গলায় বললেন,–কে জ্যান্ত কে মড়া বোঝা ভারি কঠিন। এই আমায় দেখছেন, বলুন তো আমি জ্যান্ত না মড়া?
–মড়ারা কথা বলে না। আপনি তো দিব্যি কথা বলছেন?
–বলে মশাই, বলে। আপনি জানেন না, সে আলাদা কথা। বলে ভদ্রলোক ফের খিকখিক করে হাসতে থাকলেন।
পাগল নাকি? বললুম–নিজেকে বুঝি আপনি মড়া ভাবেন?
–ভাবব কী মশাই? আমি যে সত্যি-সত্যি মড়া!
–বলেন কী?
–হুঁউ! ওই যে ওহিদ বলল, সে জানঘর থেকে পালিয়ে এসেছিল বউয়ের আঁটার ভয়ে। আমিও আজ জানঘর থেকে পালিয়ে এসেছি জানেন?
–আপনিও কি বউয়ের ভয়ে পালিয়ে এসেছেন?
ভদ্রলোক জোরে ঘাড় নেড়ে বললেননাঃ! আমার মশাই বউটউ নেই।
–তাহলে?
–ডাক্তারবাবুর ভয়ে। মশাই সবে মারা গেছি–ডাক্তারবাবু কিনা ইয়াবড় ছুরি বাগিয়ে আমাকে টুকরো-টুকরো করে কাটার ফন্দি এঁটেছেন।
–পোস্টমর্টেম বলুন।
–ঠিক বলেছেন। তো যেই ছুরিটা আমার বুকের দিকে এনেছেন, অমনি একলাফে উঠে ডাক্তারবাবুকে ধাক্কা মেরে হটালুম। কারা চেঁচাল, ধর ধর। পালাচ্ছে, মড়া পালাচ্ছে। আমি ততক্ষণে পগার পার। বাপস, আর ভুলেও হাসপাতালে নয়।
ভদ্রলোক খিকখিক করে ফের হাসলেন। ওহিদ সায় দিয়ে বলল, কখনও নয়। ভাগ্যিস, মারা গিয়েছিলুম বলেই না উচিত শিক্ষেটা হল।
ভদ্রলোক হাসি থামিয়ে আমার দিকে ঘুরে বললেন,–যাকগে। এবার আপনারটা শোনা যাক।
–আমার কী?
–লজ্জা কীসের মশাই? লুকোছাপা করে আর কী লাভ বলুন? এখানে তো কোনও জ্যান্ত মানুষ নেই। প্রাণ খুলে বলে ফেলুন, আপনি কীভাবে…
