পণ্ডিতমশাই ঘুরে দেখে নিয়েই গর্জন করলেন, তবে রে বিশ্বাসঘাতক, আজ তোর একদিন কী আমার একদিন!
তারপর তড়াক করে এক লাফে গাছে উঠে গেলেন। এবার যেন ঝড় শুরু হল। গটগাছটার ডালপালা প্রচণ্ড নড়তে থাকল। সেইসঙ্গে অদ্ভুত খ্ৰী খ্ৰী ঘেঁ এইসব গর্জন। হুঙ্কার। মড়মড় করে একটা ডালও ভেঙে পড়ল। ভূতনাথ শাস্ত্রী এবং কার্তিকচন্দ্র শর্মার তুমুল যুদ্ধ চলছে।
কেলো বলল,–হেভি ফাইট বেধে গেছে। পালাই চল! আর এখানে থাকা ঠিক নয়। কিন্তু এবার বুঝলি তো কেন নতুন পণ্ডিতমশাই ঘনঘন জল খেতে যেতেন? জল খাওয়ার ছলে আমাদের পুরোনো পণ্ডিতমশাইকেই তাড়া করতে যেতেন। ডোম্বল ঠিক দেখেছিল।
আমরা গুঁড়ি মেরে জঙ্গলের আড়ালে দৌড়ে স্কুলবাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। স্কুলপ্রাঙ্গণে তখন সত্যি ভিড়। হেডমাস্টারমশাই একটা কাগজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মাস্টারমশাইয়ের মুখ প্রচণ্ড গম্ভীর। কেলো হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে বলল, সত্যি দুজন ভূত স্যার! হেভি ফাইট বেধেছে।
হেডমাস্টারমশাই গম্ভীরমুখে বললেন, এবার থেকে স্কুলে নতুন শিক্ষক নিতে হলে সাবধান হওয়া দরকার।
বাঁচা-মরা
অনেক বছর পরে গ্রামে যাচ্ছি। ট্রেন লেট করেছিল। স্টেশনে নেমে দেখি শেষ
বাস চলে গেছে রাত নটায়। এখন বাজছে প্রায় দশটা। গ্রাম ছয় মাইল দূরে। কী করব ভেবে পেলুম না।
কয়েকটা সাইকেল রিকশো দাঁড়িয়েছিল। তাদের সাধাসাধি করলুম। এত রাতে কেউ অত দূরে যেতে রাজি হল না। তখন হতাশ হয়ে একটা চায়ের দোকানে গেলুম চা খেতে।
এমনসময় রোগা হাড়গিলে চেহারার হাফপেন্টুল আর ছেঁড়া গেঞ্জি পরা লোক এসে হঠাৎ বলল, স্যার কি রিকশো খুঁজছিলেন? কোথায় যাবেন?
–হ্যাঁ। যাব দোমোহানী।
–আসুন তবে। লিয়ে যাই। চন্ডীতলার একজন পেসেঞ্জার পেয়েছি। পথে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাব। ওই দেখুন আমার রিকশো। আনন্দে লাফিয়ে উঠলুম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলুম, একটু তফাতে গাছতলায় একটা রিকশো দাঁড়িয়ে আছে। তাতে একজন লোক গুটিসুটি বসে আছে। গাছের পাতার ফাঁকে কুচিকুচি আলো পড়েছে মাছের আঁশের মতো। পাঞ্জাবিধুতিপরা লোকটাকে প্রৌঢ় বলে মনে হল। কোলে একটা ব্যাগও আছে। চুপচাপ বসে আছে।
শিগগির চা খেয়ে আসুন।–বলে রিকশোওলা চলে গেল। ভাড়ার কথা তোলার ইচ্ছে হল না। যা চায় দেব। এমন বিশ্রি অবস্থায় কখনও পড়িনি। আর স্টেশনটা এমন অখাদ্য জায়গায়, বাজার বা বসতি মাইলটাক দূরে। সেখানে গিয়েও যে রাতের আশ্রয় পাব, ভরসা নেই।
চা-ওলা আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। এতক্ষণে বলল,–স্যার, ওহিদের রিকশোয় যাবেন না। বরং ওই সিংহবাহিনীর মন্দিরে যান। ধর্মশালা আছে।
আমি জানি, হিন্দু মন্দিরে অথবা ধর্মশালায় আমাকে থাকতে হলে জাত উঁড়িয়ে থাকতে হবে। সে মিথ্যাচারিতা সম্ভব নয়। তাই বললুম–থাক। কিন্তু ওর রিকশোয় গেলে ক্ষতি কী বলুন তো?
চা-ওলা চাপা গলায় বলল, আপনি নতুন লোক বলেই বলছি। ওহিদ ওর রিকশায় মড়া বয়।
হেসে বললুম,–মড়া বয়? আমি ভাবলাম বুঝি চোর-ডাকাত!
–না না। লোক খুব ভালো। তবে দোষের মধ্যে ব্যাটা রিকশোয় মড়া বয়। তাই চেনা-জানা কেউ ওর রিকশোয় চাপে না। চাওলা ফের ষড়যন্ত্রসংকুল গলায় বলল,-রাত বিরেতে মড়াবওয়া রিকশোয় চাপতে নেই। আমি একবার ভারি বিপদে পড়েছিলুম জানেন? আসছিলুম মেয়ের শ্বশুরবাড়ি সেই হরেকেষ্টপুর থেকে। বেয়ানের সঙ্গে একটুখানি কথা কাটাকাটি হয়েছিল! তাই…
ওহিদ রিকশাওলা এসে তাড়া লাগাল, আসুন স্যার। রাত বেড়ে যাচ্ছে। তক্ষুনি উঠে পড়লুম। চা-ওলা খুব জমিয়ে নিশ্চয় ভূতের গল্প বলতে চাইছিল। বাধা পেয়ে গোমড়ামুখে বসে রইল।
আমার সঙ্গী ভদ্রলোক চোখ বুজে বসে আছে। মনে হল, ঘুমোচ্ছেন। অনেকের এ অভ্যাস থাকে। তাছাড়া যেচে পড়ে কারও সঙ্গে আলাপ করার স্বভাব আমার নেই। রিকশো ধীরেসুস্থে চলেছে। ওহিদ রিকশাওলা তেমন শক্তসমর্থ জোয়ান নয়, তা ওর গঠন দেখেই টের পেয়েছিলুম।
কিছুক্ষণ পরে কৃষ্ণপক্ষের ভাঙা উঁদ উঠল। হালকা জ্যোৎস্না ছড়াল পৃথিবীতে। এসব সময়ে এই নির্জন রাতের পথে স্বভাবত ঘুম-ঘুম আচ্ছন্নতা এসে যায়। কিন্তু ইন্দ্রিয় সজাগ রাখা দরকার। না, ভূতের ভয় দেখিয়েছে বলে নয়, নেহাত চোর-ডাকাতের ভয়েই। ভাবলুম, রিকশোওলার সঙ্গে গল্প করা যাক। তাই বললুম–ওহে, তোমার নাম বুঝি ওহিদ?
রিকশাওলা জবাব দিল,–হ্যাঁ, স্যার।
–তুমি থাকো কোথায়?
–আজ্ঞে, হরিণমারা-গোপপাড়ায়। ইস্টিশনের ওপাশেই আমাদের গাঁ বলে সে আকাশের দিকে মুখ তুলে হাঁ করে দম নিল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে চাঁদ দেখে ফিরে বলল,-বড় গাঁ, স্যার। ইস্কুল-পোস্টাপিস-থানা-হাসপাতাল সবই আছে।
এরপর সে তার গ্রাম সম্পর্কে মোটামুটি একটা ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিবরণ দিতে থাকল। লোকটির প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে গেল।
এই করে প্রায় মাইলটাক আসা গেল। তারপর বেমক্কা হাসতে-হাসতে বলে বসলুম, হ্যাঁ, তুমি নাকি এই রিকশোয় মড়া বও?
ওহিদ প্যাডেল থামিয়ে আমার দিকে ঘুরে ফাঁচ করে অদ্ভুত হেসে বলল– নেতদা বলল বুঝি? নেত্যদাটা ভারি দুষ্টু। আমার প্যাসেঞ্জারকে ভাঙচি দেয় খালি। কী আর বলব বলুন? এক জায়গায় আড্ডা দিই। তাসটা-আরটা খেলি। বলতে গেলে বন্ধু মানুষ। তা স্যার, ইচ্ছে হলে চলুন আমার গাড়িতে। না ইচ্ছে হলে নেমে যান। ভেবে দেখুন এখনও।
