বলে যথারীতি উনি আবার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলাম। কেলো চাপাস্বরে হেডমাস্টারমশাই বকে দিয়েছেন। বুঝলি না?
এবার পণ্ডিতমশাই হন্তদন্ত ক্লাসে ঢুকলেন। কিন্তু আগের মতো কাঠের চেহারা! হুঙ্কার দিয়ে বললেন,-ভোম্বল! তোকে না মর্কটদণ্ড দিয়াছিলাম?
ভোম্বল তড়াক করে আবার বাঁদর হয়ে কাঁদকঁদ মুখে বলল, আপনিই তো স্যার…
–কী? কী? কী? ম্লেচ্ছ যাবনিক সম্বোধন। তোকে তালদণ্ড দিলাম!
তালদণ্ড মানে বেঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের দুইকান ধরে থাকতে হবে। তালগাছকে তো এই রকমই দেখায়! ডোম্বল তালদণ্ড নিতে যাচ্ছে, ফার্স্টবয় বলে উঠল,-মহাশয়। সে মিথ্যা কহে নাই। আপনি দ্বিতীয়বার আসিয়া দ্রবীভূত, শিলীভূত, ভস্মীভূত ইত্যাদি ইত্যাদি ভূতের ব্যাখ্যাও করিলেন।
পণ্ডিতমশাইয়ের চোখদুটো জ্বলে উঠল। কী? কী? কী? আমি দ্বিতীয়বার আসিতেছি। অথচ তুমি কহিতেছ, আমি দ্বিতীয়বার আসিয়াছিলাম! তদুপরি ওই সকল উদ্ভট ব্যাখ্যা করিয়াছি?
–হ্যাঁ মহাশয়! তদুপরি আপনি এই তৃতীয়বার আসিলেন।
অমনি পণ্ডিতমশাই হুঙ্কার দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমরা হকচকিয়ে গেছি। একটু পরে খড়মের শব্দ করতে করতে পণ্ডিতমশাই ফিরে এলেন। মুখে আবার একরাশ হাসি। বললেন,-ভূত শ্মশানের দিকে ভাগিয়ে দিয়েছি। হুঁ, কত রকম ভূত আছে। তাই না? তবে সবার সেরা ভূত নামচোরা। কেন নামচোরা বলছি জানো? যেমন ধরো? মামদো, ব্রহ্মদত্যি, জটাধারী, শাঁকচুন্নি, পেঁচো ইত্যাদি ইত্যাদি। এদের নামে ভূত শব্দই নেই। অথচ এরাই আসল ভূত। খাঁটি ভূ-ভূ-ভূ
পণ্ডিতমশাই হঠাৎ হেঁট হয়ে খড়মদুটো হাতে নিয়ে সবেগে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে কি তার গর্জন শুনলাম আমরা। মনে হল হুঙ্কার দিতে দিতে কে কাকে তাড়া করছে।
কেলো বলল,–আয় তো দেখি, কী ব্যাপার! ঘনঘন মত বদলানো ভালো ঠেকছে না।
আমাদের ক্লাসরুম ছিল স্কুলবাড়ির শেষাংশে। বেরুলেই বাঁ-দিকে বোর্ডিংয়ের শেষপ্রান্ত এবং ঝোঁপজঙ্গল শুরু। বেরিয়ে গিয়ে চোখে পড়ল, ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে পণ্ডিতমশাইয়ের মাথা দ্রুত দূরে দূরে সরে যাচ্ছে। হেমন্তকালের শেষবেলার রোদে কালো মাথাটি ভীষণ নড়াচড়া করছে।
সাহসী কেলোর সঙ্গে আমরা কয়েকজন দৌড়ে গেলাম। ঝোঁপজঙ্গল পেরিয়ে গিয়ে শ্মশানতলায় পণ্ডিতমশাইকে দেখতে পেলাম। বটগাছ লক্ষ্য করে একপাটি খড়ম ছুঁড়ে সগর্জনে বললেন, সাহস থাকিলে অবতরণ কর রে শাখামৃগ!
গাছের ওপরে ডালপালার আড়াল থেকে খিখি হাসি শোনা গেল শুধু। পণ্ডিতমশাই অপর খড়মটি ছুঁড়ে গর্জন করলেন, দন্ত বিদীর্ণ হউক পামরের।
ওপর থেকে সেইরকম হাসির সঙ্গে কথা শোনা গেল,-একজোড়া নতুন খড়ম লাভ হল। বুঝলি কেতো? এখন আমার ভাঙা খড়মজোড়া খুঁজে নিয়ে পরগে যা। সাবধান! ঠ্যাং ভেঙে পুঞ্জীভূত হবি।
এবার পণ্ডিতমশাই আমাদের দেখতে পেলেন। দ্বিগুণ উৎসাহে চিৎকার করলেন,–রণং দেহি! রণং দেহি! তোমরা হাঁ করিয়া কী দেখিতেছ? ইষ্টক নিক্ষেপ করো! ভুতোকে শীঘ্র বধ করো।
উনি ভাঙা মন্দিরের ইট কুড়িয়ে বটগাছে ছুঁড়তে থাকলেন। আমরাও যুদ্ধে যোগ দিলাম। এবার বটগাছের ওপর থেকে আর কোনও সাড়াশব্দ এল না। একটু পরে পণ্ডিতমশাই বললেন,–ক্ষান্ত হও! দুবৃত্ত এক্ষণে যথার্থই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছে। রণজয়ের পুরস্কারস্বরূপ তোমাদের ছুটি দিলাম। যে যাহার গৃহে প্রত্যাবর্তন করো
রণজয়ী পণ্ডিতমশাই সবেগে স্কুলবাড়ির দিকে চলে গেলেন। এই সময় কেলো বলল, ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। হ্যাঁ রে, ইট ছুঁড়ে দুনম্বর পণ্ডিতমশাইকে সত্যি মেরে ফেললাম না তো?
নাড়ুগোপাল ওরফে পেঁচো বলল,–ঠিক বলেছিস। এখনই বেলা থাকতে থাকতে খুঁজে দেখা উচিত। দরকার হলে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসব।
কেলো চিন্তিতমুখে বলল, কিন্তু ব্যাপারটা বড় গোলমেলে।
ভোম্বল বলল, কিছু গো…গোলমেলে নয়। তখন আমি জানালার বাইরে ভূ- ভূমানে পুরোনো পণ্ডিত ম-মশাইকে–ওরে বাবা! ওই দ্যা-দ্যাখ! আবার আসছে ন-নতুন পণ্ডিতমশাই।
ঘুরে দেখি পণ্ডিতমশাই দুপাঠি খড়ম হাতে হন্তদন্ত-আবার এদিকে আসছেন। বোঝা গেল খড়মের খোঁজেই গিয়েছিলেন আসলে।
কেলো বলল,-মন্দিরের আড়ালে লুকিয়ে পড়া যাক। শিগগির! খুব রহস্যজনক ঘটনা মনে হচ্ছে।
আমরা শ্মশানকালীর মন্দিরের আড়ালে গিয়ে গুঁড়ি মেরে বসলাম। পণ্ডিতমশাই এসে বটগাছের ওপর দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বললেন, তোর খড়ম নিয়ে আমার খড়ম ফেরত দে। ও ভুতো! ভুতো। মলো যা! সত্যি ভিরমি গেলি নাকি? ন্যাকামি করে সাড়া দিচ্ছিস না কেন?
একটু পরে সাড়া এল ডালপালার আড়াল থেকে খড়ম ফেরত দেব। তবে আজই তোকে স্কুল থেকে চলে যেতে হবে। ছেলেগুলোকে বড় কষ্ট দিচ্ছিস তুই!
পণ্ডিতমশাই বাঁকা হেসে বললেন, কষ্ট দিচ্ছি বলেই ওরা সংস্কৃতটা ভালো করে শিখতে পারছে। তুই তো খালি গল্প করেই ওদের পরকাল ঝরঝরে করে দিয়েছিলে। তাই না আমি এই স্কুলে এলাম!
–থাম-থাম! বড়াই করিসনে! এসেছিস তো স্বভাব যায় না মলে বলেই। তোর স্বভাব যাবে কোথায়? মরে গিয়েও একই স্বভাব ছাড়তে পারলিনে হতভাগা!
–চুপ! চুপ!
–কক্ষনও চুপ করে থাকব না। তোর বাড়ি থেকে তোর হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেট চুরি করে এনেছিলাম। তোর গিন্নির বাসে ছিল, হেডমাস্টারমশাইয়ের টেবিলে রেখে এসেছি। গিয়ে দ্যাখ না কী হুলুস্থুল হচ্ছে এতক্ষণ! ওই দ্যাখ! স্কুলের সামনে কী ভিড়! এতক্ষণ লোক চলে গেছে কেকরাডিহির হাসপাতালে।
