আমি বললুম, ভ্যাট। আমার কি হয়নি।
বুধু আমার বুকে তার কড়ে আঙুল ছুঁইয়ে বিড়বিড় করে কী মন্ত্র পড়ল। তারপর ঘুরে বকুলগাছটার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ধমক দিল, যা, যা! ভাগ!
সেদিন দুপুরে দেখি, মকবুল কাঠুরেকে ডেকে আনা হয়েছে। সে কুড়ুল দিয়ে গাছটার কাছে যেতেই আমি কান্নাকাটি জুড়ে দিলুম। মেজকাকা আমাকে থাপ্পড় তুলে ধমক দিলেন, শাট আপ! শাট আপ!
আমার চোখের সামনে নিষ্ঠুর মকবুল কাঠুরে গাছটার গোড়ায় কোপ মারতে শুরু করল। দুঃখেরাগে আমি অস্থির। কিছুক্ষণের মধ্যেই অত সুন্দর বকুলগাছটা মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। মকবুল দাঁত বের করে হেসে বলল,-এবার শীতের রোদ্দুর অনেকটা পাবেন বাবুমশাই। এখানে ফুলের গাছ লাগাবেন। দেখবেন, রাঙা-রাঙা ফুল ফুটবে।
বহুপ্রকার ভূত
তখন আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। স্কুলে সংস্কৃত পড়ালে যিনি, তাকে বলা হতো পণ্ডিতমশাই। আমাদের পণ্ডিতমশাইয়ের নাম ছিল ভূতনাথ শাস্ত্রী। খুব হাসিখুশি আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের নাম নিয়ে রসিকতা করতেন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কত সব মজার গল্প শোনাতেন। পণ্ডিতমশাই ক্লাসে এলেই আমরা আনন্দে নেচে উঠতাম।
আমাদের দুর্ভাগ্য, পণ্ডিতমশাই পুজোর ছুটিতে নিজের গ্রামে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। কী একটা অসুখে মারা গিয়েছিলেন। স্কুল খোলার পর তাঁর স্মরণে শোকসভা এবং একদিন ছুটিও দেওয়া হয়েছিল।
এরপর নতুন পণ্ডিতমশাই এলেন যিনি, তিনি একেবারে উল্টো প্রকৃতির মানুষ। এঁর নাম কার্তিকচন্দ্র শর্মা। কিন্তু দেখতে মোটেই কার্তিক নন। বদরাগী মারকুটে খিটখিটে মেজাজ। ক্লাসে এসেই উকট সব সংস্কৃত শব্দ আওড়ে আমাদের ভয় পাইয়ে দিতেন। কথায় কথায় শব্দের বুৎপত্তি জিগ্যেস করতেন। না পারলেই মর্কটদণ্ড। তার মানে, বেঞ্চে উঠে হাঁটু ভাজ করে হাতদুটো ডেস্কে রেখে মর্কট বা বাঁদর সাজতে হবে।
এর চেয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার, ফার্স্টবয় অশোক বাদে আমাদের প্রত্যেকের একটা করে নাম দিয়েছিলেন কেলো, ন্যাড়া, পেঁচো, হাঁদা, ভোম্বল ইত্যাদি। আমাকে ডাকতেন পুঁটে বলে। ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বলেই কি? কে জানে? ছোটবেলাতেই চুনোপুঁটি বলা হয়।
নতুন পণ্ডিতমশাইয়ের কিছু বাতিকও ছিল। স্যার বলা নিষেধ, মহাশয় বলতে হবে। তাও এক বিড়ম্বনা।
আরও একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মতো। পড়াতে-পড়াতে হঠাৎ বেরিয়ে যেতেন। কেলো মানে কালিপ্রসাদ ছিল সবচেয়ে সাহসী ছেলে। সে একদিন চুপিচুপি দেখে এসে এই রহস্যটা ফাস করেছিল। পণ্ডিতমশাই বোর্ডিংয়ে নিজের ঘরে জল খেতে যান। সাত্ত্বিক শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণ। অন্যের জল খাবেনই বা কেন? তবে ঘন ঘন জল খাওয়ার রহস্য তখনও জানা যায়নি।
আমাদের স্কুলটা ছিল গ্রামের শেষপ্রান্তে, নদীর ধারে উঁচু জমির ওপর খুব পুরোনো স্কুল প্রাঙ্গণের পাশে সারবন্দি বোর্ডিং-ঘর। বাইরের মাস্টারমশাই আর ছাত্ররা সেখানে থাকতেন। তার পেছনে প্রাঙ্গণে খেলার মাঠের সামনে ঝোঁপ-জঙ্গল। তার ওদিকে শ্মশান। সেখানে একটা বিশাল বটগাছ ছিল। একটা ভাঙাচোরা মন্দিরও ছিল। শ্মশানকালীর মন্দির।
নতুন পণ্ডিতমশাই এসে সংস্কৃতের ক্লাস শেষ পিরিয়ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ছুটির ঘণ্টা বেজে গেলেও আমাদের নিষ্কৃতি ছিল না। তাই শেষ পিরিয়ডের শুরুতে খড়মের খটাখটা শব্দ শোনামাত্র আমরা ভুষোমুখে বই খুলতাম।
তো একদিন পণ্ডিতমশাই হন ধাতু নিয়ে বকবক করছেন, হঠাৎ পেছনের বেঞ্চ থেকৈ ভোম্বল, মানে তারাপদ ভূ ভূ ভূ করে চেঁচিয়ে উঠল।
পণ্ডিতমশাই হুঙ্কার দিয়ে বললেন,-আরে মূর্খ! ভূ ধাতু নহে। হন ধাতু। ভূ ধাতু আগামীকল্য পড়াইব।
ভোম্বল কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ভূ-ভূত ম-মহাশয়!
পণ্ডিতমশাই সগর্জনে বললেন, তাহা হইলে তুই-ই বল, ভূত কয় প্রকার?
ভোম্বল আরও তোতলাতে লাগল। তখন কর্মটদণ্ড দিয়ে পণ্ডিতমশাই ফার্স্টবয় অশোকের দিকে তাকালেন। অশোক বলল,–পঞ্চ প্রকার মহাশয়!
–কী, কী?
–ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ব্যোম মহাশয়। সা
–ধু, সাধু!
বলে পণ্ডিতমশাই উঠে দাঁড়ালেন এবং অভ্যাসমতো বেরিয়ে গেলেন। জল খেতেই যে গেছেন, সেটা আমরা জানতাম। তবে প্রকৃত রহস্য বুঝতে আরও কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল।
ওঁর খড়মের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ডোম্বল বলে উঠল, মাইরি! ভূ-ভূ করে আমাদের ডোবাল। আগামীকল্য নয়, অদ্যই ভূ ধাতু যদি না পড়িতে হয়–সে ভেংচি কেটে ফের বলল—তু-ই ভূত!
তারপর খড়মের শব্দে সে থেমে তুম্বা হয়ে গেল। কিন্তু এবার পণ্ডিতমশায়ের চেহারা দেখে অবাক আমরা। মুখে হাসি ঝলমল করছে। ইশারায় ডোম্বলকে বসতেও বললেন। ভাবলাম ফার্স্টবয় ওঁর প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ায় মেজাজ প্রসন্ন হয়েছে।
পণ্ডিতমশাই সহাস্যে বললেন, কী পড়া হচ্ছিল যেন?
ফার্স্টবয় বলল,–পঞ্চভূত, মহাশয়!
পণ্ডিতমশাই আমাদের আরও অবাক করে বললেন,-মহাশয় নয়, স্যার বলবে। যে যুগের যা রীতি। তা পঞ্চভূত বললে। উঁহু! ভূত বহু প্রকার। যেমন ধরো : দ্রবীভূত, শিলীভূত, পুঞ্জীভূত ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যাখ্যা করি শোনো। যে ভূত দ্রব হয়েছে অর্থাং গলে জল হয়েছে, সে দ্রবীভূত। যে ভূত শিলা অর্থাৎ পাথর হয়ে গেছে, সে শিলীভূত। যে ভূত ভস্ম অর্থাৎ ছাই হয়ে গেছে সে ভস্মীভূত। যে ভূত পুঞ্জ অর্থাৎ হাড়গোড় ভাঙা হয়ে দুমড়েমুচড়ে পাঁজার মতো হয়েছে, সে হল পুঞ্জীভূত। বোসো৷ আসছি।
