সেই পাড়াকুঁদুলী বুড়ি আপন মনে হাঁসচরা বিলে কলমি শাক তুলছে। তার স্বভাব যাবে কোথায়? একটা শামুকের গুঁড়ে ওর ঠ্যাঙে সুড়সুড়ি লেগেছে বলে বুড়ি তার সঙ্গে কেঁদল জুড়ে দিয়েছে।
বুড়ি নেচে নেচে ছড়া গেয়ে কেঁদল করছে :
তোর মুণ্ডু খাই, তোর কত্তবাবার খাই।
কড়মড়িয়ে খাই আমি মড়মড়িয়ে খাই।
খেয়েদেয়ে ভ্যাডেঙ্গিয়ে নাতির বাড়ি যাই–
এদিকে হয়েছে কী, জলার ধারে থাকে একশাকচুন্নী। সেও পেত্নিপাড়ার নামকরা কুঁদুলী। শাঁখ, গুগলি, কাঁদা আর শামুক তার খাদ্য। এ বুড়ি যেমন পেটের জ্বালায় শাক তুলতে গেছে সেই শাকচুন্নীও তেমনি পেটের জ্বালায় গুগলি, শামুক খুঁজতে গেছে। শাকতলানীর গলা পেয়ে সে ট্যাক্স-ট্যাঙস করে সেখানে হাজির হয়েছে। হয়ে বলেছে, কী কী কী?
ব্যস! দুই কুদুলীতে লেগে গেছে তুমুল কোদল। কেউ থামবার নয়। পরস্পর আঙুল তুলে পরস্পরকে শাসাচ্ছে। সে কী চিলাচানি! সে কী নাচনকোদন!
হেন সময়ে জলার হাসদের রাজার কানে গেছে সেই খবর। হাঁসের রাজা রাজহাঁস খাপ্পা হয়ে বলল?
প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁকোর প্যাঁক–
শিগগির গে দ্যাখ তো
কারা দেখায় জাক রে
কাট তাদের নাক
তবু না থামে যদি,
কাটিস চুল আর দুকানের লতি
প্যাঁক প্যাঁকোর প্যাঁক
শিগগির দ্যাখ তো।…
হুকুম পেয়েই জলার যত পাতিহাঁস বেলেহাঁস শনশনিয়ে ডানা কাঁপয়ে আঁকেঝকে আসতে লেগেছে। আকাশ-বাতাসে হুলুস্থুল। জলার জল ঢেউয়ে তোলপাড়। তারপর কিনা…
আচমকা ঘেউ-ঘেউ! ঘেউ-ঘেউ! বাড়ির ভেতর থেকে হতচ্ছাড়া কালুটা বেরিয়ে বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে পড়ল এবং তাকে দেখেই আমার বকুলগাছের কোখেকো বন্ধুবেচারা এক লাফে গাছে চড়ে অদৃশ্য হল। তার কোটা পড়ে গেল হাত ফসকে। কলকে উল্টে ছাই পড়ল গড়িয়ে। আগুনের ফুলকি উঠল চিড়বিড়িয়ে।
বগবগ করে একটু জলও হুঁকোর খোলের ফুটো থেকে গড়িয়ে পড়ল।
কালু চেঁচামেচি করে গাছ চক্কর দিচ্ছে। এমন সময় মেজকাকা বেরিয়ে এলেন বাড়ি থেকে। এসেই কালুকে ধমক দিয়ে বললেন,-শাট আপ! শাট আপ!
কালু থামবার পাত্র নয়। সে মেজকাকুর কাছে এসে হাঁটুর কাছে মুখ তুলে কেঁউমেউ করে কী বলল। তারপর আবার দৌড়ে গেল গাছতলায়।
এবার মেজকাকা সন্দেহাকুল চোখে গাছটা দেখতে-দেখতে বললেন,-গাছে হনুমান আছে নাকি রে বিলু?
বললুম, না মেজকাকু। কালু একটা কাঠবেড়ালি দেখেছে।
হঠাৎ গাছতলায় উল্টে থাকা কোটার দিকে চোখ গেল মেজকাকার। হুঁকোটা তুলে নিয়ে অবাক হয়ে বললেন,–এ কার হুঁকো রে বিলু?
–আমি তো জানিনে মেজকাকু।
মেজকাকু ধমক দিয়ে বললেন–জানো না? এখনও কলকের আগুন রয়েছে। কে হুঁকো খাচ্ছিল বল হতভাগা?
–জানিনে মেজকাকু।
আলবাৎ জানিস বলে হুঁকোটা তুলে ভুড়ভুড়ুক করে কয়েকটা টান মেরে মেজকাকা ফুরফুর করে ধোঁয়া উড়িয়ে দিলেন। বাঃ। এ তো ভারি সুগন্ধি তামাক!
–ও মেজকাকু! ছা-ছা। তুমি কো খাচ্ছ? বলে দেব বাবাকে?
মেজকাকু চোখ টিপে বললেন, চুপ। লেবেনচুস দেব। তারপর মনের আনন্দে হুঁকো খেতে থাকলেন। ততক্ষণে কালু মেজকাকার কাছে ফিরে এসে মুখ তুলে তামাকের গন্ধ শুঁকছে। কালুর মুখটা বেজায় গম্ভীর। চোখে সন্দেহের চাউনি।
তারপর কালু আমার কাছে এসে বেজায় ধমক দিল বারতিনেক। আমি অবিকল মেজকাকার গলায় বললুম, শাট আপ কালু। শাট আপ।
কালু যেন কুকুরের ভাষায় পাল্টা ধমক দিয়ে বলল, চালাকি কোরো না বিলু। সব বুঝতে পেরেছি আমি। তারপর সে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করে লেজ তুলে বাড়ির ভেতর চলে গেল।
মেজকাকা তারিয়ে-তারিয়ে হুঁকো খাওয়ার পর চাপাস্বরে বললেন,–এই বিলু, আরও দুটো লেবেনচুস দেব। বল না, কার হুঁকো এটা?
বলব, না বলব না ভাবছি হঠাৎ বিদঘুঁটে ব্যাপার ঘটে গেল। ততক্ষণে শীতের বেলা ফুরিয়ে এসেছে। বাগানে আর একটুও দিনের আলো নেই। আবছায়া ঘনিয়েছে। গাছগুলো গায়ে কুয়াশার চাদর টেনে নিয়েছে। সেই ধূসর কুয়াশা আর আবছা অন্ধকারে বকুলগাছটা থেকে একটা মস্ত লম্বা কালো হাত বেরিয়ে খপ করে মেজকাকার হাত থেকে হুঁকোটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
অমনি মেজকাকা আঁতকে উঠে গোঁ-গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
আর আমিও এতদিন পরে এতক্ষণে ঝটপট বুঝে নিয়েছি, বকুল গাছের বন্ধুটি খুব সহজ লোক নয়। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছি সঙ্গে-সঙ্গে।
আমার চেঁচামেচিতে বাবা বেরিয়ে এলেন। এলেন। আর সব কাকারা এলেন। সে এক হুলুস্থুলুস ব্যাপার। আলো আন! জল আন! পাখা আন!
পরদিন সকালে বুধু ওঝাকে ডেকে আনা হল। সে নাকি ভূতপ্রেতের যম। লোকে বলে বুধু ওস্তাদ। সে মেজকাকাকে খুব ঝাড়ফুঁক করে বলল, বলুন, নেই।
মেজকাকা মিনমিনে স্বরে বললে,–নেই।
তারপর বুধু গাছটার চারপাশে ঘুরে দেখে-শুনে বাবাকে বলল, বড়বাবু! এই গাছটা আজই কেটে ফেলুন। এ গাছে ব্ৰহ্মদত্যি আছে।
বাবা ভয় পেয়ে বললেন, বলো কী হে ওস্তাদ!
আজ্ঞে হ্যাঁ বড়বাবু।–বলে বুধু আমার দিকে যেন চোখে তাকিয়ে ফের বলল, আমার মনে হচ্ছে, খোকাবাবুর দিকেও নজর পড়েছে ওনার। কেমন যেন শুকনো-শুকনো দেখাচ্ছে! –খোকাবাবুর চোখে ব্ৰহ্মদত্যিমশাইকে দেখতে পাচ্ছি। ওই তো ইকো টানছে গুড়ুক গুড়ুক করে।
মা সভয়ে আমাকে টেনে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। খোকা কিছুদিন থেকে ভালো করে খাচ্ছেটাচ্ছে না। খালি বকুলতলায় মন পড়ে থাকে। কী যেন ভাবে আর বিড়বিড় করে কথা বলে।
