সে হুঁকোয় গুড়ুক-গুড়ুক আওয়াজ করে টান দিতে দিতে আমার একটু তফাতে পা ঝুলিয়ে বসল। তারপর হুঁকো নামিয়ে বাঁ-হাতে ধরে রেখে বলল,–কী? ওটা কী পড়া হচ্ছে?
গম্ভীর মুখে জবাব দিলুম,–ইতিহাস।
এই শুনে সে খিকখিক করে হেসে উঠল,–ইতিহাস? সে আবার কেমন হাঁস খোকা? আঁ? ঢের-ঢের হাঁসের নাম শুনেছি। ইতিহাস নামে কোনও হাঁসের কথা তো শুনিনি!
কী বোকা লোক রে বাবা! হাসি পেল, বললুম, না, না, হাঁস নয়। ইতিহাস।
লোকটা বলল,–সেই তো বলছি গো! পাতিহাঁস, এলেহাঁস, বেলেহাঁস, জলহাঁস, রাজহাঁস, বুনোহাঁসকত রকম হাঁস আছে। সেসব ছেড়ে ওই উছুটে ইতিহাঁস নিয়ে পড়াটা সুবিধের নয়। বরং ওই যে কী বলে পাতাল হাসনাকি হাসপাতাল সেটাও মন্দ নয়!
এবার একটু রাগ হল। বললুম,–তুমি কি বোঝো না!
বুঝি না? আমি বুঝি না? লোকটাও চটে গিয়ে মুখখানা তুম্বো করে ফেলল। আমি বুঝি না তো কে বোঝে শুনি? কোথায় থাকে তোমার ইতিহাস?
বইয়ের পাতা দেখিয়ে বললুম,–এই তো এখানে থাকে।
সে আবার ফিক করে হাসল,–ওই শুকনো খসখসে বইয়ের পাতায় ইতিহাস থাকে? বলছ কী খোকা! খায় কী? এখানে তো দেখছি জলটল একফেঁটা নেই। সাঁতার কাটছেই বা কেমন করে?
বুঝলুম, বকুলগাছের এই হুঁকোখার লোকটা একটি মুখ। লেখাপড়াই জানে না। তাই ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বললুম, ইতিহাঁস নয়, ইতিহাস। এর মানে কী জানো?
সে আপত্তি করে বলল, আমাকে মানে বোঝাতে এসো না! বিস্তর হাঁস দেখে দেখে বুড়ো হয়ে গেলুম। দিনরাতে ঝাঁকে ঝাকে ডানা শনশন করে কত হাঁস আসছে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। কত রকম গানও গায়, জানো? শোনো। বলে সে হেঁড়ে গলায় গুনগুন করে গেয়ে উঠল :
তেপান্তরের মধ্যিখানে
মস্ত একটা বিল আছে
কলমিদামে শালুক পানায়
কত যে ফুল ফুটতাছে
শামুক বুড়ো চিংড়িবুড়ি
বড় সুখে রোদ পোহায়
যে যাবি ভাই আয় রে সাথে
শনশনিয়ে আয় রে আয়–
গানটা কেমন ঘুমঘুম সুরে ভরা। শুনতে-শুনতে হাই ওঠে। ঢুলুনি চাপে। শীতের লম্বা রাতের বেজায় লম্বা ঘুমের পর এই মিঠে রোদের সক্কালবেলায় আবার ঘুমিয়ে পড়াটা বিপজ্জনক। মেজকাকা এসে টের পেলেই চুল খামচে ধরবেন।
গান শেষ করে লোকটা চোখ নাচিয়ে বলল, দারুণ গান, তাই না? বলে সে আবার গুড়ক আওয়াজ করে হুঁকো টানতে থাকল।
আমি ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে বললুম,–গানটা ভালো লাগল। তবে বড় ঘুম পায় যে। ওগো লোকটা, তুমি বরং রাতের শোওয়ার সময় এসো। এখন যাও। পড়ায় ডিসটার্ব কোরো না। মেজকাকা বকবেন।
–কে তোমার মেজকাকা? ঢ্যাঙা রোগামতো ছোকরাটা বুঝি?
–চুপ! ও কথা বোলো না। মেজকাকাকে রোগা বললে আগুন হয়ে ওঠেন। মেজকাকার একটা কুকুর আছে, জানো তো? তার নাম কালু। কালুকে
এ পর্যন্ত শুনেই লোকটা যেন চমকে উঠল। চাপা গলায় জিগ্যেস করল, কালু এখন বাড়িতে আছে নাকি?
বললুম, মনে হচ্ছে না। থাকলে এতক্ষণ তোমাকে–
–ওরে বাবা! বোলো না, বোলো না!
ওকে ভয় পেতে দেখে খুব মজা লাগল। বললুম,–তাই তো বলছি, পড়ায় ডিসটার্ব না করে তুমি কেটে পড়ো। এক্ষুণি কালু এসে পড়তে পারে। বোধহয় মেজকাকার সঙ্গে পাড়া বেড়াতে বেরিয়েছে।
লোকটা উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল,–তাহলে আসি। আমার কথা কাকেও বোলো না যেন। পরে সময়মতো এসে তোমাকে আরও হাঁসের গান শোনাব। ইচ্ছে করলে দেখতে যেতেও পারও হাঁসেরা কোথায় থাকে। কিন্তু তাই বলে সেখানে তোমার ওই ইতিহাস দেখতে পাবে ভেবো না। তোমার পড়ার বইতে মিথ্যে লিখেছে! বরং ওই যে কী বলে পাতালহাঁস বা হাসপাতাল সত্যি হলেও হতে পারে!
এই বলে সে খড়ম পায়ে চাপা খটখট শব্দ তুলে বলুগাছে দিব্যি চড়ে গেল এবং ঝাকড়া ডালপালার মধ্যে অদৃশ্য হল। আমি অবাক হয়ে বসে রইলুম। আমাদের বাগানের বকুলগাছটাতে এমন কেউ থাকে তা তো শুনিনি। বাবা মা মেজকাকা সেজকাকা ছোটকাকা কেউই বলেনি?
ইলু এতক্ষণে এসে ফাঁসফেঁসে গলায় বলল, কী রে বিশু? কী দেখছিস অমন করে? সেই লেজঝোলা পাখিটা?
উঁহু, বকুলগাছের লোকটা পইপই করে বারণ করেছে। কাকেও ওর কথা বলব না।
–কী রে বিলু? বলছিস না যে! বারবার জিগ্যেস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে na বুঝি?
ইলুকে পাত্তা না দিয়ে আবার পড়া শুরু করলুম : মোগলসম্রাট আকবর মোগলসম্রাট আকবর ইতিহাস না–পাতিহাঁস, এলেহাঁস, বেলেহাঁস, রাজহাঁস পুষতে ভালোবাসতেন। তাই তিনি–
ইলু অবাক হয়ে বলল, কী পড়ছিস রে। দাঁড়া মেজকাকা আসুক—
বকুলগাছের লোকটার কথা আমি কাকেও বলিনি। সেই যে ওর সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে গেল, তারপর কতবার এই বারান্দা কিংবা বাগানে একলা হলেই সে এসে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। কতরকম মজার-মজার গল্প শুনিয়েছে। কত আজব ছড়া!
কিন্তু মুশকিল বাধাচ্ছিল মেজকাকার কুকুর কালু। বেশ দুজনে কথা বলছি, হঠাৎ কালুটা কোথায় ঘেউ-ঘেউ করে ওঠে, অমনি লোকটা বকুলগাছে লুকিয়ে পড়ে। কালুটা মহাপাজি। গাছটা চক্কর দিয়ে ওপরে মুখ তুলে কতক্ষণ ঘেউ-ঘেউ করে। আমি ওকে তাড়াতে গেলে দাঁত বের করে আমাকেই কামড়াতে আসে। আমি ঢিল ছুঁড়ে তাড়াই।
একদিন বিকেলে স্কুল থেকে শেষ পরীক্ষা দিয়ে ফিরে বাগানে একলা দাঁড়িয়ে ওর একটা গল্প শুনছি। গল্পটা দারুণ মজার। আমাদের গাঁয়ের এক শাকতলানী বুড়ি গেছে তেপান্তরের মাঠের মধ্যিখানে সেই হাঁসচরা বিলে। বুড়িটা ছিল বড় কুঁদুলী। লোকে বলত পাড়ার্কুদুলী। কারণ, পাড়ার লোকের সঙ্গে হুট করতেই কোঁদল জুড়ে দিত।
