কঁচুমাচু মুখে বললুম, নানা। অন্য কোনও মতলবে যাইনি। দেখছেন না? এই ঘুড়িগুলো আমার ভাগ্নের।
ভদ্রলোক ফিক করে হেসে বললেন,–খুব বেঁচে এসেছেন মশাই! ভাগ্যিস মামা-ভাগ্নে মিলে দুজনে ছিলেন তাই, একা গেলে এতক্ষণে মড়া হয়ে পড়ে থাকতেন?
–সে কি! কেন বলুন তো?
এই সময় এতক্ষণ পরে কুকুরের গর্জন শোনা গেল ভেতরে। ভদ্রলোক একবার ঘুরে কুকুরটার উদ্দেশে বললেন, চুপ কর টার্জান! এরা মানুষ!
বলে আমাদের দিকে ঘুরলেন হাসিমুখে, আর কখনও ছাদে যাবেন না। আর খোকা, তুমিও সাবধান। ঘুড়ি ছিঁড়েছে তোমার ভাগ্যি। বাগে পেলে মুভুটি ছিঁড়ে নিত যা পাজি ব্যাটাচ্ছেলে।
বললাম, আপনি কার কথা বলছেন?
–যে ঘুড়ি ছিঁড়ে নেয়।
–কে সে?
ভদ্রলোক খাপ্পা হয়ে বললেন, ধুর মশাই! কুকুর পুষেছি কেন তাও বুঝলেন না? যাকগে আমার কী? সাবধান করে দিলুম। ঠেলা টের পাবেন কথা না শুনলে।
ডনের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলুম, সে ঘুড়ি ওড়াবে আর আমি আগে থেকে গিয়ে ইংকিদের ছাদে ওত পেতে থাকব। লোকটিকে ডন অবশ্য দেখেছে। সে নাকি এক বুড়ো। যাইহোক তার মুখোমুখি একটু বোঝাঁপড়া করে নিতেই হবে। ভূতের গল্প লিখি বটে। কিন্তু ভূত বিশ্বাস করি না। দেখাই যাক না, সত্যি-সত্যি ভূত আছে নাকি এবং তার ব্যাপার-স্যাপারই বা কী। বেগতিক দেখলে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করব বরং। দিন দুপুরে ভূতের পক্ষে ঘুড়ি ছিঁড়ে নেওয়া সম্ভব হলেও আমার মুণ্ডু ছিঁড়ে নিতে সাহস পাবে বলে মনে হয় না।
চুপি চুপি গিয়ে ছাদের ঘরটার দেয়াল ঘেঁষে বসে রইলুম। ডনের ঘুড়িটা তরতর করে এগিয়ে আসছিল। ঘরটার মাথায় পৌঁছুতেই দেখি জানালার ফঁক গলিয়ে একটা হাত বেরুচ্ছে। বুকটা ধড়াস করে উঠল। কিন্তু হাতটা কিছুতেই ঘুড়ির সুতোর নাগাল পেল না। ডনও মহা ধড়িবাজ ছেলে। ধরতে গেলেই ঘুড়িটা পাক খাইয়ে নাগাল থেকে সরিয়ে নিচ্চে।
একটু পরে দরজার কপাটের ফঁক গলিয়ে সত্যিই এক বুড়ো ঢ্যাঙা গড়নের লোক বেরুলো। একটু শুটকো চেহারা কোথাও দেখিনি। তাকে দেখে দূরের ছাদ থেকে ডন চিকুর ছাড়ছিল, মামা। মামা! বেরিয়েছে।
আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললুম,–এই যে মশাই।
অমনি বুড়ো লোকটি চমকে উঠল। সে আমাকে দেখার আশাই করেনি। দেখামাত্র জিভ কেটে সরি বলে সুড়ৎ করে কপাটের ফঁক গলিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। দরজার সামনে গিয়ে বললুম,–শুনুন! শুনুন! আপনার সঙ্গে কথা আছে।
কিন্তু আর কোনও সাড়াই পেলুম না। উঁকি মেরেও তাকে আর দেখতে পেলুম না। তবে দেয়ালের কোনায় একটা প্রকাণ্ড টিকটিকি কুতকুতে নীল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখামাত্র আবার বুকটা ধড়াস করে উঠল। আর এক মুহূর্ত
ওখানে থাকার সাহস হল না। সবেগে পালিয়ে এলুম।
যাই হোক, তারপর আর ডনের ঘুড়ি ঘেঁড়া যায়নি। পি-থ্রি বুড়ো নিশ্চয় বড্ড লজ্জা পেয়েছিল। তাই আমি বা ডন আর ওকে নিয়ে মাথা ঘামাইনি।…
বকুলগাছের লোকটা
এ আমার ছেলেবেলার কাহিনি। ইচ্ছে হলে বিশ্বাস না করতেও পারো কেউ! কিন্তু সত্যি ঘটেছিল।
এক শীতের সকালে পুবের বারান্দায় ঝলমলে রোদ্দুর খেলছে। আমি আমার বোন ইলু সতরঞ্জি পেতে বসে খুব চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করছি। কদিন বাদেই বার্ষিক পরীক্ষা কি না! তার ওপর মেজকাকা বলে দিয়েছেন, যত জোরে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করবি, তত ভালো রেজাল্ট হবে। ইলু তো গলা ভেঙে ফেলল উৎসাহের চোটে। কিছুক্ষণ পরে শুনি, ফাঁস-ফাঁস আওয়াজ বেরুচ্ছে বেচারির গলা থেকে। সে মাঝে-মাঝে বই থেকে মুখ তুলে করুণ চোখে তাকিয়ে যেন মেজকাকাকেই খুঁজছে।
মেজকাকার পাত্তা নেই। আমি বললুম,–ইলু, বরং জল খেয়ে আয়!
ইলু ফাঁসাসে গলায় বলল,–যদি মেজকাকু এসে পড়েন!
–তুই ঝটপট খেয়ে আয় গে না! আমি বলব মা ইলুকে ডেকেছেন।
এই শুনে ইলু জল খেতে গেল ভেতরে। আমি আবার চেঁচিয়ে পড়তে শুরু করেছি, মোগল সম্রাট আকবর…মোগল সম্রাট আকবর…, সেই সময় কোত্থেকে হেঁড়ে গলায় কে বলে উঠল, কী পড়া হচ্ছে খোকাবাবু?
আমাদের বাড়ির এদিকটায় বাগান। বাগানের ওপাশে ধানখেত। সবে পাকা ধান কেটে নিয়েছে চাষিরা। সেদিকে দূরে ঘন নীল কুয়াশা ভাসছে, যেন বুড়ো মাঠ আলোয়ান গায়ে দিয়ে এখন ঘুম-ঘুম চোখে তাকিয়ে আছে। বারান্দা থেকে কয়েক মিটার তফাতে আছে একটা ঝাকড়া বকুলগাছ। মনে হল, আওয়াজটা এসেছে ওই থেকেই। তাই মুখ তুলে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। খুঁজছি কে কথা বলল।
হঠাৎ দেখি, বকুলগাছ থেকে হনুমানের মতো ধুপ করে নিচে লাফিয়ে পড়ল একটা বেঁটে নাদুসনুদুস গড়নের লোক। হাঁটু অব্দি পরা ধুতি, খালি গা, কুচকুচে কালো রং। বুকের ওপর দিয়ে একটা পৈতে ঝুলছে। তার মাথার কঁচাপাকা চুলগুলো ছোট করে ছাঁটা, খোঁচাখোঁচা হয়ে আছে। টিকিতে ফুল গোঁজা। তার গোঁফগুলোও সেইরকম বিচ্ছিরি। হাতে একটা হুঁকোও আছে। পায়ে খড়ম আছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল। তারপর এগিয়ে আসতে লাগল। আমি তো অবাক। হাঁ করে তাকিয়ে আছি। নাকে ভুরভুর করে তামাকের মিঠে গন্ধ ভেসে আসছে। আমাদের পাঠশালার পণ্ডিতমশাই ঠিক এমন সুগন্ধি তামাক খেতেন।
কিন্তু বকুলগাছে এমন হুঁকো খাওয়া বিদঘুঁটে চেহারার লোক থাকাটা যদি বা মেনে নেওয়া যায়, তার এভাবে পড়া-ডিস্টার্ব করতে আসাটা মোটেও উচিত হয়নি। মেজকাকা থাকলে নিশ্চয় আপত্তি করতেন।
