ডন আস্তে বলল,–ঘুড়ি।
ঘুড়ি! –খাপ্পা হয়ে বললুম। আমি কি পয়সার গাছ? কালই তো ঘুড়ির পয়সা দিলুম।
ডন বলল, ছিঁড়ে নিচ্ছে যে!
ছিঁড়ে নিচ্ছে? কে ছিঁড়ে নিচ্ছে তোর ঘুড়ি? খুব তম্বি করে বললুম। চালাকি করিসনে ডন। ওড়াতে না জানলে তো ঘুড়ি ছিঁড়বেই। ইলেকট্রিক তারে লেগে ছিঁড়বে। আন্টেনায় লেগে ছিঁড়বে। গাছের ডালে লেগে ছিঁড়বে।
ডন একটু চটে গিয়ে বলল, ইচ্ছে করে ছিঁড়ে নিচ্ছে যে। আমি বুঝি ঘুড়ি ওড়াতে জানিনে?
-কে ছিঁড়ে নিচ্ছে?
–পি-থ্রি বুড়ো।
অবাক হয়ে বললুম,–পি-থ্রি বুড়ো! সে আবার কে রে? সে কেন তোর ঘুড়ি ছিঁড়ে নেবে? সে গাছ না পাখি? অ্যান্টেনা না ইলেকট্রিক তার?
ডন আমার হাত খিমচে দিয়ে বলল, মামা! তুমি বড় বাজে বকো। ইংকিদের তেতলার ছাদে একটা ঘর আছে না?
হুঁ–আছে। বলেই আমার মনে পড়ে এবং হেসে ফেললুম। ও! তুই পি-থ্রি লেখা বিজ্ঞাপনের বোর্ডটার কথা বলছিস? তাই বল।
ডন আরেকটা খিমচি কেটে বলল,–ভ্যাট! ওখানে একটা বুড়ো লোক থাকে, তার কথা বলছি। যেমনি ঘুড়িটা ইংকিদের তেতলার ছাদের কাছে যাবে, লোকটা খপ করে ছিঁড়ে নেবে। ওত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে, বুঝলে মামা? এই করে আমার পাঁচটা ঘুড়ি গচ্চা গেল। বলে সে আবার চোখ কচলাতে থাকল।
ওর কথা শুনে লোকটার ওপর রাগ হল। কী আশ্চর্য! ছোট্ট ছেলেটা মনের সুখে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, ওর তা সইছে না? ছিঁড়ে নিচ্ছে বদমাইসি করে! উঠে বললুম,–কই চল তো দেখি।
ডন বলল,–খালি-খালি দেখবে কেমন করে? ঘুড়ি কিনে দাও, আমি ওড়াব– তবে তো দেখতে পাবে।
ওর যুক্তি অস্বীকার করা যায় না। হাতে-নাতে না দেখে কীভাবে লোকটাকে দোষি সাব্যস্ত করব? বলতে গেলে তো আমাকেই পাঁচকথা শুনিয়ে ছাড়বে।
কাজেই ডনকে ঘুড়ির পয়সা দিলুম। সে চিকুর ছেড়ে বলে গেল, তুমি ছাদে গিয়ে ওয়েট করো মামা! আমি এক্ষুনি আসছি।
ছাদে গিয়ে দেখলুম, ডনের লাটাই পড়ে আছে। ছেঁড়া সুতো গুটিয়ে রাখতে ভোলেনি। ইংকিদের ছাদটা দেখতে লাগলুম। তেতলায় ছাদের কোণায় অ্যাজবেস্টস চাপানো একটা ছোট্ট ঘর। তার মাথায় পি-থ্রি বিজ্ঞাপনের বোর্ড আটকানো। ওদিকের বড় রাস্তা থেকে ওটা চোখে পড়ে। এ বাড়ির আর ওবাড়ির মাঝখানে একটা ডোবা, মোষের খাটাল, টালির ঘর গোটাকতক, আর কিছু গাছ-গাছালি। ডোবর পাড় দিয়ে গলির রাস্তাটা গিয়ে বড়রাস্তায় মিশেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ লক্ষ রেখেও ওই ছাদের আনাচে-কানাচে জনপ্রাণীটি দেখলুম না। তবে একটা কাক কী একটা জিনিস মুখে করে কার্নিসে গিয়ে বসেই যেন তাড়া খেয়ে উড়ে গেল। তাহলে বুড়ো লোকটি সম্ভবত ঘরের ভেতরেই আছে।
ডন ধুপধুপ শব্দে সিঁড়ি বেয়ে ঘুড়ি হাতে এসে গেল। বললুম, কই, এবার ওড়া তো, দেখি কে তোর ঘুড়ি ছিঁড়ে নিচ্ছে।
ইংকিদের বাড়িটা উত্তর-পূর্ব কোণে। বাতাসের গতিও ওই দিকে। তাই ডনের ঘুড়ি কয়েক মিনিটের মধ্যে পি-থ্রি বোর্ডের কাছে পৌঁছে গেল। ছোট্ট ঘরটার ওপর অন্তত বিশফুট উঁচুতে ঘুড়িটা পাক খাচ্ছিল। হঠাৎ দেখি, ঘরের জানালা দিয়ে একটা হাত বেরুল। তারপর খপ করে সুতো ধরে ফেলল। ডন আকাশচেরা গলায় পেঁচিয়ে উঠল, মামা! মামা!
আমিও বাজখাই চেঁচিয়ে উঠলুম,–এই! এই!
কিন্তু তাতে কোন কাজ হল না। হাতটা ঘুড়ির সুতো ছিঁড়ে দিব্যি ঘুড়িটাকে নামিয়ে এবং টেনে জানালায় ঢোকাল। রাগে খাপ্পা হয়ে বললুম, আয় তো দেখি। মজা দেখিয়ে ছাড়ছি ব্যাটাছেলেকে।
ইংকিরা বাড়ির নিচের তলাটা এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীকে ভাড়া দিয়েছে। তিনি নিচের ঘরগুলোকে গোডাউন করেছেন। দোতলায় থাকে ইংকিরা। গিয়ে দেখলুম, নিচের তলায় তালাচাবি ঝুলছে। দোতলায় উঠে দেখলুম, সেখানেও তালাচাবি। ইংকিরা নেই। তেতলায় ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, আর কপাটে লেখা আছে, কুকুর আছে, সাবধান।
কুকুরকে আমি বেজায় ভয় পাই। কিন্তু কুকুরটার কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। সিঁড়ি দিয়ে সোজা ছাদে উঠে গেলুম। তারপর সেই ছোট্ট ঘরের সামনে গিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়ালুম। ঘরটার দরজার কপাট আটকানো আছে বটে, কিন্তু কপাটদুটো ভাঙা এবং দুটো কপাটই দুপাশে হেলে পড়েছে। মধ্যিখানে মাকড়সার জাল। উঁকি মেরে দেখি, ভেতরে, রাজ্যের ভাঙাচোরা আসবাব ছড়ানো। জানলার কপাটও ভাঙা। সেখানেও উঁকি মেরে দেখলুম। ও ঘরে কোনও জনমানুষ বাস করে না।
কিন্তু তার চেয়ে অবাক কাণ্ড সদ্য ছিঁড়ে নেওয়া ঘুড়িটা সুষ্ঠু ডনের মোট ছখানা ঘুড়িই ভেতরে ভাঙাচোরা আসবাবের ওপর পড়ে রয়েছে।
কিছু বোঝা গেল না ব্যাপারটা। চাপা গলায় ডনকে বললুম, দরজার ফাঁক গলিয়ে তুই ঢুকে যা। ঘুড়িগুলো তো আগে উদ্ধার করা যাক।
ডন দরজার ভাঙা কপাটের ফাঁকে দিব্যি গলে গেল। তারপর ছখানা ঘুড়িই উদ্ধার করে হাসিমুখে বেরিয়ে এল।
তবে তার চেহারাটি এবার ভূতের মতোই হয়েছে। ঝুলকালি মেখে সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা। দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে তেতলার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসেছি, এমন সময় দরজা খুলে গেল। এক বেঁটে গোলগাল চেহারার ভদ্রলোক সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, কী চাই?
কুকুরের ভয়ে চলে আসতে পারলে বাঁচি। তাই ঝটপট বললুম,–ছাদে ঘুড়ি আটকে ছিল তাই
ভদ্রলোক বাধা দিয়ে বললেন, আপনারা ছাদে গিয়েছিলেন? আপনাদের সাহস তো কম নয় মশাই!
