ভূতনাথ বললেন, উ। তবে সবসময় দেখা পাওয়া মুশকিল। আপনি তো সুন্দরবন অভয়ারণ্যে গেছেন। কবার বাঘ দেখতে পেয়েছেন, বলুন?
ভবভূতি সায় দিয়ে বললেন, আমি শিকারি। ও কি নতুন কথা আমার কাছে?
শুনুন গ্রামাঞ্চলে কীভাবে ভূত খুঁজে এনেছি। গ্রামে খবরের কাগজ কজন পড়ে? তাই উঁাড়া পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়াও হয়েছিল। তার ফলে অসংখ্য জায়গা থেকে নানারকম ভূতের খোঁজ পাওয়া গেল। যেমন ধরুন, বীরভূমের একটা দিঘির এক কোনায় শাকচুন্নীর খোঁজ পেলুম। তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লুম।
–কিন্তু ওদের ধরে আনলে কীভাবে?
ডঃ ভূতনাথ একটু হেসে বললেন,–খুবই সোজা, খুবই সোজা। শুধু জানতে হয়, কোন প্রজাতির ভূতের কী খাদ্য। ব্যস! বীরভূমের সেই শাকচুন্নীর আড্ডায় একরাত্রি গিয়ে বসে রইলাম। ওর প্রধান খাদ্য মাছ। মাছ দেখে তক্ষুনি ওর নোলায় জল ঝরতে লাগল। ঘোমটার ফাঁকে বলল,–ঐকটা মাছ পেঁ না ভাই। আমি অমনি উঠে চলতে শুরু করলুম। সারাপথ ও পেছনে চাইতে-চাইতে আসে, আর আমি বলি–আর একটু গিয়ে দেব, চলে আয়! ব্যস! এই করে এখানে নিয়ে এলুম। এখানে পুকুর বানিয়ে অঢেল মাছ ছেড়েছি। শাকচুন্নীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা খাওয়ার খাচ্ছে। বাকিটা আমরা কলকাতায় চালান দিচ্ছি।
এই শুনে গজপতি মন্তব্য করলেন,–সেইসব মাছই তো কলকাতার বাজারে বিক্রি হচ্ছে। স্বাদেই বোঝা যায়। শাকচুন্নীরা এঁকে ফেলে দেয়, তাই ওরকম। বুঝলে তো?
ভবভূতি বললেন,–আচ্ছা বাবা ভূতনাথ! দুধ রসগোল্লা, পাকা কলা এসব সুখাদ্য কোন ভূতে খায়?
ভূত নয় ভূতিনী বলুন। এরা প্রেত উপজাতির অন্তর্গত। অর্থাৎ কোনও পেটুক মেয়ে মরে ভূত হয়েছে।
যেই কথাটা বলা, অমনি জানালার বাইরে থেকে খ্যানখ্যানে গলায় কে বলে উঠল, কী, কী কী বঁললি? শুধু মেয়েরাই সব খায়?
ভবভূতি আঁতকে উঠে দেখলেন, নির্ঘাৎ ভূতিনীই বটে, চুলের যা ছিরি– তার পরনে শাড়ি, কতরকম গয়নাও পরা, জানালায় দাঁড়িয়ে চোখ কটকটিয়ে তাকিয়ে আছে।
ডঃ ভূতনাথ ধমক দিয়ে বললেন,–পেঁচোর মা! এখন চলে যাও তো এখান থেকে! আমরা কথা বলছি, দেখছ না? কিছু বলার থাকলে পরে এসো। না হয়, দরখাস্ত কোরো।
ভূতিনী জিভ বের করে, কেন কে জানে ভবভূতির দিকেই ভেংচি কেটে সরে গেল। গজপতি খিকখিক করে হেসে বললেন,–পেঁচোর মা সেবার আমাকে বাগবাজারের রসগোল্লা আনতে বলেছিল। ভুলে গেছে নিজেই।
পেঁচোর মা! মানে? ভবভূতি জিগ্যেস করলেন। জবাবটা দিলেন ডঃ ভূতনাথ। ওর ছেলে পেঁচোও যে ভূত। তার মানে, প্রেত। ট্রেনে চাপা পড়ে মারা গেছে।
ভবভূতি বললেন-আচ্ছা বাবা ভূতনাথ, এত যে ভূত রেখেছ অভয়ারণ্যে, তুমি কিংবা তোমার কর্মচারীরা কেউ কখনও বিপদে পড়োনি তো?
ডঃ ভূতনাথ বললেন না। বুঝতে পারছেন না? বেছে বেছে কর্মচারী রাখা হয়েছে। রীতিমতো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। ভূত নিয়ে কাজ করা তো সহজ নয়!
এই সময় ভবভূতির মনে হল তার পাঞ্জাবির পকেটে কী যেন ঢুকেছে। ঘুরেই আঁতকে উঠলেন। চেয়ারের পেছনে ঘাপটি মেরে বসে একটা বছর নয়-দশ বয়সের ছেলে–কিন্তু সত্যি কি ছেলে?
তার পকেটে একটা কালো কুচকুচে লিকলিকে হাত ঢুকিয়ে হাতড়াচ্ছে। ভবভূতি কঁপতে কাঁপতে বললেন,-কে, কে?
ডঃ ভূতনাথ ধমকে দিলেন,–অ্যাই পেঁচো! কী হচ্ছে?
শ্ৰীমান পেঁচো বলল, চকোলেট খুঁজছি ভুতুমামা!
হাত বের কর বলছি! বের করে নে হাত! –ডঃ ভূতনাথ উঠে দাঁড়ালেন। ছিঃ! ওই নোংরা হাত তুই কোন আক্কেলে পকেটে ঢোকালি? মুখে চাইলেই পারতিস!
পেঁচো হি-হি করে হেসে হাত বের করে নিল। তারপর চেয়ারের পেছন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ভবভূতির গলায় দুহাত আঁকড়ে আব্দার-গলায় বলল,–ওঁকটা চকোলেট দাঁও নাঁ দাদু। সেই সঙ্গে বেজায়রকম কাতুকুতুও দিতে থাকল।
কী প্রচণ্ড ঠান্ডা হাত! ভবভূতির দম আটকে যাচ্ছে। ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে গোঁ গোঁ করতে করতে শেষপর্যন্ত ভূতের মতোই হি হি হি হি হি হিঁক করে হেসে উঠলেন।
ভবভূতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর উঠে বসলেন। দেখলেন নিজের ঘরে শুয়ে আছেন। ঘরে সকালের রোদ ঢুকেছে। তাঁর নাতি রুনু বলল,–ও দাদু, এখনও ঘুমোচ্ছ তুমি? আমি কখন উঠেছি।
ভবভূতি আগে ভালোভাবে দেখে নিলেন রুনু, না পেঁচো। তারপর শুধু বললেন,–হুঁ।
–ও দাদু, একটা চকোলেট দাও না।
ভবভূতি চমকে উঠলেন,-এও যে চকোলেট চায়।
কিন্তু না, মনের ভুল। স্বপ্নই দেখছিলেন বটে। কাল সন্ধ্যায় গজপতির সঙ্গে ভূত নিয়ে বেজায় তর্ক হয়েছিল, মনে পড়ছে।
পি-থ্রি বুড়ো
আমার ভাগ্নে ডন মহা ধড়িবাজ বিচ্ছু ছেলে। একেকসময় তার মাথায় একেকটা খেয়াল গজিয়ে ওঠে আর তার ধাক্কায় আমাকেই ভুগতে হয় শেষপর্যন্ত। দুদিন থেকে দেখছি, শ্রীমানের মাথায় ঘুড়ি ওড়ানোর খেয়াল চেপেছে। ভয় হল ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে দৈবাৎ কিছু বিপদ না বাধিয়ে ফেলে।
কিন্তু ডনকে বারণ করা বৃথা। বারণ করলে তো আরও বেশি করেই তা করবে আর বাড়িসুদ্ধ লোককে দুর্ভাবনায় ভোগাবে।
সকালে জুতসই একখানা ভূতের গল্প লিখব বলে টেবিলে হুমড়ি খেয়ে বসে কলম বাগিয়ে ধরেছি সেই সময় ডন এসে কাগজে তার খুদে থাবা রাখল। বিরক্ত হয়ে বললুম, আঃ, কী হচ্ছে ডন।
ডন মুখে কিছু বলল না। অন্য হাতে খালি চোখ কচলাতে থাকল। এটাই তার কান্নাকাটি। অগত্যা গল্প লেখার চেষ্টা বাতিল করে কাগজ কলম যথাস্থানে রেখে বললুম,–প্রবলেম কী রে?
