গজপতি দাঁড়িয়ে গেছেন। তেমনি ফিসফিসিয়ে বললেন,–এই সেরেছে। কিছু খাবার আনা উচিত ছিল। তাই তো! অন্তত একটুখানি শুকনো গোবর…।
মুখের কথা মুখেই থাকল গজপতির, সেই মূর্তিই হি হি হি হি করে বেজায় হেসে উঠল। ভবভূতি বিড়বিড় করতে থাকলে, ট্রাম ট্রাম ট্রাম ট্রাম…
তারপর টের পেলেন রামের বদলে ট্রাম বলছেন। তক্ষুনি শুধরে নিয়ে রামনাম শুরু করলেন। আর গজপতি বিকট চেঁচিয়ে আর্তনাদের সুরে বলে উঠলেন–ও ভূতো ও-ও, ভূতো রে-এ-এ! তোর ঘটোৎকচকে সামলে নে! বেরিয়ে পড়েছে-এ-এ!
বাংলো বাড়ি থেকে আলো হাতে বেরিয়ে কে সাড়া দিল, কোন বেটারে? নাম ধরে ডাকছিস! স্পর্ধা তো কম নয়।
গজপতি বললেন, বাবা ভূতো, আমি–আমি তোর মামা গজপতি।
আলো হাতে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল একটা লোক। তাকে দেখে রাস্তা আটকে দাঁড়ানো সেই মূর্তিটা একলাফে ঝোঁপঝাড় ডিঙিয়ে পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আচমকা যেন ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। গজপতি ফিসফিস করে জানালেন, পাহাড়ি দেশের ভূত, বুঝলে তো? তারপর ভবভূতির হাত ধরে পা বাড়িয়ে বললেন,-বাবা ভূতত, তোকে খবর দিয়ে আসতে পারিনি। এদিকে ট্রেনটাও লেট করেছিল।
গেট খুলে ডঃ ভূতনাথ বললেন, মামা নাকি? আসুন, আসুন! কী সৌভাগ্য। উনি কে?
–আমার বন্ধু ভবভূতি পতিতুন্ডু। তোকে এনার কথা বলেছি, মনে নেই হয়তো। ইনি একসময় নামকরা শিকারি ছিলেন। আর ভবভূতি এ হচ্ছে সেই ডঃ ভূতনাথ পাত্র।
ডঃ ভূতনাথ নমস্কার করে বললেন, আসুন, আসুন! কী সৌভাগ্য!…
বাংলোঘরের মধ্যে একটা হাজাগ জ্বলছে। লণ্ঠনটার দম কমিয়ে বারান্দায় রেখে ডঃ ভূতনাথ ওঁদের নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। কোনার টেবিলে একটা কালো বেঁটে মোটাসোটা হাঁড়িমুখো লোক খাতায় কী সব লেখালেখি করছিল। একবার মুখ তুলে দেখল। ভবভূতির গা শিরশির করে উঠল লোকটাকে দেখে। মানুষ বটে তো? কেমন যেন ভুতুড়ে চেহারা।
পাশের ঘরের দরজা খুলে ডঃ ভূতনাথ বললেন–এক মিনিট। মোমবাতিটা জ্বেলে নিই।
ভবভূতি বললেন,–লোডশেডিং বুঝি?
না। এখানে ইলেকট্রিসিটির বালাই নেই। কেন নেই, পরে বলবখন। বলে ভূতনাথ মোমবাতি জ্বেলে দিলেন। ডাকলেন, আসুন মামা! আপনারা ভেতরে এসে বসুন। আমি চায়ের জোগাড় করি।
ঘরটা বেশ বড়। ভবভূতি ও গজপতি আরাম করে বসলেন। ডঃ ভূতনাথ বাইরে চলে গেলেন। বাইরে তার গলা শোনা গেল। কাকে ডাকাডাকি করছেন।
গজপতি বললেন, ইলেকট্রিসিটি কেন নেই জানো? ভূতদের ওই আলো সয় না। লণ্ঠন, হ্যাঁজাক অব্দি বড়জোর সয়। ওই ইলেকট্রিসিটির জ্বালায় তো ভূতবংশ লোপ পেতে বসেছে।
ভবভূতি দমে গেছেন এখন। সায় দিয়ে মাথাটা নাড়লেন শুধু। তারপর বারবার জানলার দিকে তাকাতে থাকলেন। বলা যায় না, কখন কী বিতিকিচ্ছিরি ভুতুড়ে চেহারা জানলায় উঁকি দিয়ে ওইরকম একখানা পিলে-চমকানো হাসি হাসবে হয়তো। মনে হচ্চে, রাইফেলটা আনলে ভালো হতো। কিন্তু রাইফেল কি এরা ছুঁড়তে দিত? তার চেয়ে বড় কথা রাইফেলের গুলি ভূতের গায়ে লাগত কি না তাই বা কে জানে। কখনও তো পরীক্ষার সুযোগ পাননি।…
কিছুক্ষণ পরে চা খেতে-খেতে ভবভূতি এই অভয়ারণ্যের ভূতবৃত্তান্ত বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
গজপতির ভাগ্নে ডঃ ভূতনাথ পাত্র অমায়িক মানুষ। রোগা সিঁড়িঙে চেহারা। গায়ের রং কুচকুচে কালো। চুলগুলো ছোট এবং সজারুর কাটার মতো খাড়া। গোঁফটাও তাই। এই শরতের ভ্যাপসা গরমেও স্যুট-টাই পরে আছেন। গজপতির চোখ নাচছে অনবরত। যেন বলতে চাইছেন, দেখছ তো–আমি কেমন ভাগ্নের মামা? ভাগ্নে পাকা সায়েব।
ডাঃ ভূতনাথ বলেছিলেন–আপনি তো শিকারি মিঃ পতিতুণ্ডু। আপনি ব্যাপারটা বুঝবেন ভালো। আপনার যেমন বন্যপ্রাণী বিশেষ করে বাঘের ব্যাপারে তীব্র কৌতূহল ছিল বললেন–আমারও ছেলেবেলা থেকে ভূতের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহ ছিল। যাই হোক, হঠাৎ একদিন কাগজে দেখলুম মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূততত্ত্বে গবেষণার জন্যে সেখানকার সরকার বৃত্তি দিচ্ছেন। অমনি কপাল ঠুকে দরখাস্ত করে দিলুম। ইন্টারভিউয়ে ডাক পড়ল। পাস করে গেলুম। তারপর তো দেখতেই পাচ্ছেন। শুনেও থাকবেন। সাগ্রহে ভবভূতি বললেন,–শুনেছি। কিন্তু এই প্রকেল্প কীভাবে ভূত এনে জড়ো করেছ, সেই কথা বলো তো বাবা, শুনি।
ডঃ ভূতনাথ একটু হেসে বললেন,–সে অনেক হাঙ্গামা। কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছিল–কেউ কোথাও ভূতের খোঁজ পেলে জানান, পুরস্কৃত করা হবে। বিস্তর চিঠি এসেও ছিল। কিন্তু বেশিরভাগ জায়গায় গিয়ে দেখি, মিথ্যে ভোগাচ্ছে। তবে কিছু জায়গায়–যেমন ধরুন, কলকাতার পুরোনো কয়েকটা বাড়ির ছাদ, চিলেকোঠা, সিঁড়ি হাতড়ে তিনরকম প্রজাতির ভূত পেয়েছিলুম। এরা সবাই কিন্তু মানুষ ভূত। কেউ আত্মহত্যা করে ভূত হয়েছে। কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কেউ খুন হয়ে মরেছে।
গজপতি বললেন,–ভালোভাবে না বোঝালে ভবভূতি বুঝতে পারবে না।
–তাহলে শুনুন। ভূতজাতি মূলত তিনটি উপজাতিতে বিভক্ত। মানুষভূত অর্থাৎ যাকে বলা হয় প্রেত। আর প্রকৃত ভূত–যারা মানুষ বা কোনও জন্তুর অশরীরী আত্মা নয়। স্রেফ ভূত। তৃতীয় উপজাতি হচ্ছে প্রাণীজ ভূত অর্থাৎ মানুষ বাদে অন্যান্য প্রাণী মরে যে ভূতের জন্ম। যেমন ধরুন, গরু মরে যে ভূত হয়েছে, তার নাম গোদানো।
ভবভূতি আরও কৌতূহলী হয়ে বললেন, সবরকম ভূতই তো এখানে রয়েছে?
