–জানি না। কারণ এমন প্রজেক্টের কথা কস্মিনকালে শুনিনি।
গজপতি গর্জে বলেছিলেন, তুমি যা জানো না বা শোননি, তা নিয়ে তক্কো করতে এসো না। রামচন্দ্রপুর ভূত প্রকল্পের চার্জে যে অফিসার আছে, তার নাম ভূতনাথ; আমার আপন ভাগ্নে। সে রীতিমতো মেক্সিকোতে ট্রেনিং নিয়ে এসেছে ভূতের ব্যাপরে।
ভবভূতি অবাক হয়ে বলেছিলেন, বলো কী!
–হ্যাঁ। মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূততত্ত্বে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। আমাদের ভূতো সেই ডিগ্রি পেয়ে এখন ভারতের নামকরা ঘোস্ট-এক্সপার্ট অর্থাৎ ভূত-বিশেষজ্ঞ হয়েছে। গতবছর যখন রামচন্দ্রপুর ঘোস্ট প্রজেক্ট-থুড়ি, ভূতেদের অভয়ারণ্য চালু হল, তখন তার উদ্বোধন করেছিলেন কে জানো তো? ভূত বিষয়ক দফতরের মন্ত্রী মিসেস এস সি হাড়মটমটিয়া।
ভবভূতি আরও অবাক,–এমন সরকারি দপ্তরের নাম তো শুনিনি! আর এস সি হাড়মটমটিয়া…উঁহু, শুনিনি।
গজপতির উল্লাস দেখে কে,–এই তো! কিছু খবর রাখো না। রাখবে কী করে? সারাজীবন তো বনবাদাড়ে বাঘের লেজ ফলো করেই কাটালে। শুনে রাখো, এমন দপ্তর একটা আছে। তবে গোপনীয় দপ্তর। তাই কেউ জানে না। আমার ভাগ্নের খাতিরেই আমি জেনেছি।
হুঁ। তাহলে ওই মন্ত্রীমহোদয়ার পুরো নাম বুঝি মিসেস শাকচুন্নী হাড়মটমটিয়া? ভবভূতি ফের হেসে উঠেছিলেন।
গজপতির আবার রাগ হয়েছিল। বলেছিলেন, ঠিক আছে। কালই আমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ো। রামচন্দ্রপুর ভূতারণ্যে গিয়ে স্বচক্ষে সব দেখবে। এও বুঝবে, স্টেশনের নাম রামচন্দ্রপুর রাখার কারণই বা কী?
–কী কারণ শুনি?
–ওটা ভূতারণ্যের বর্ডার। রাম শব্দে ভূতেরা জব্দ। বুঝলে না? পাছে অভয়ারণ্য বা ভূত প্রকেল্পর দু-একটা পাজি ভূত এলাকা ছাড়িয়ে বাইরে গাঁ-গেরামে গিয়ে হানা দেয়, তাই ওই ব্যবস্থা। তোমার সোঁদরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের দু-একটা বাঘ কি এমন করে না মাঝে-মাঝে?
রেল লাইনের ধারে ধারে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে সরু একফালি রাস্তায় নামলেন গজপতি। সামনে একটা ছোট্ট নদী দেখা যাচ্ছিল। তার ওপর কাঠের পোল আছে। সেই পোলে পৌঁছবার পর বললেন, এবার আমরা ভূতেদের অভয়ারণ্যের এলাকায় ঢুকছি। ওই দেখ, কাঠের ফলকে দেখা আছে : রামচন্দ্রপুর ভূত প্রকল্প। দেখতে পাচ্ছ তো?
ভবভূতি থমকে গেলেন। মুখের বাঁকা হাসিটা মিলিয়ে গেল। কাঠের ফলকটার সামনে দাঁড়িয়ে চশমা খুলে চোখ দুটো মুছে নিলেন। তারপর চশমার কাঁচ ভালোভাবে মুছে হেঁট হলেন। কিন্তু না। বড় বড় হরফে সত্যি লেখা আছে? রামচন্দ্রপুর ভূত প্রকল্প। এবং তলায় ব্রাকেটের মধ্যে : তেরটি প্রজাতির ভূতের অভয়ারণ্য। তার পাশে আরেকটা বড় ফলকে নোটিশ?
সাবধান, কেহ উহাদের উত্ত্যক্ত করিবেন না। ঘাড় মটকাইয়া দিলে সরকার দায়ী হইবেন না। তবে কেহ-কেহ আদর করিয়া উহাদের কিছু খাওয়াইতে চাহেন, তাহাতে আপত্তি নাই। কিন্তু নিচের এই তালিকার খাদ্যগুলি ছাড়া আর কোনও প্রকার খাদ্য খাওয়াইবেন না। জরিমানা করা হইবে।
ভবভূতি একটু ঝুঁকে খাদ্য তালিকায় ঝটপট চোখ বুলিয়ে নিলেন। (১) দুধ (২) রসগোল্লা। (৩) হাড়গোড় (৪) শুকনো গোবর (৫) খাঁটি সরিষার তৈল (৬) পাকা কলা (৭) টিকটিকির ডিম ও লেজ (৮) নানারকম মাছ (সিঙ্গি বাদে) (৯) আরশোলার ঠ্যাং…।
গজপতি ওঁর পিঠে হাত রেখে চাপাস্বরে বললেন,–দেরি হয়ে যাচ্ছে। সন্ধে হয়ে গেল। আমার ভাগ্নের অফিসে গিয়ে ওসব জেনে নেবে। এসো।
ভবভূতি গুম হয়ে গেছেন। মুখে রা-বাক্যি নেই। তার ওপর গজপতির একরকম চাপা গলায় কথা বলা শুনে তার গা ছমছম করছে এবার।
দুধারে ঘন ঝোঁপজঙ্গল, মাঝখানে একফালি পিচের পথ। কিছুটা চলার পর বড়-বড় গাছের জঙ্গল দেখা গেল। তার মধ্যে একটা আলো দেখা যাচ্ছিল। গজপতি তেমনি চাপাগলায় বললেন,–ওই যে শ্রীমানের অফিস। মানে আমার ভাগ্নের।
ভবভূতি এখন মোটামুটি অনেকটা বিশ্বাস করে ফেলেছেন। খুঁতখুতে গলায় বললেন,–ওদের জন্যে কিছু খাবার আনা উচিত ছিল।
গজপতি ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, চুপ! খাবারের নাম করো না। এক্ষুনি পিছু নেবে। সেবার আমি কী বিপদেই না পড়েছিলুম এসে।
–পিছু নিয়েছিল নাকি?
–হুঁউ। ওই অফিস অব্দি পিছনে খালি বলে,-কী এনেছিস, দিঁয়ে যাঁ।
–বলো কী! আচ্ছা, ওরা নাকিস্বরে কথা বলে কেন বলো তো?
–নাক নেই যে! কংকালের মুণ্ডু দেখনি? নাক আছে?
–ঠিক বলেছ। নাকের জায়গায় গর্ত আছে বটে!
এই সময় আলো অনেক কমেছে। ভবভূতি অস্বস্তিতে হাঁটছেন। আর অনবরত এদিক-ওদিক চাইছেন। হঠাৎ তার মনে হল সামনে বাঁদিকে একটা গাছের প্রকাণ্ড মরা ও শুকনো ডালে কালোরঙের এবং দেখতে কতকটা হনুমানের মতো, কী যেন বসে আছে। তারপর সেই অদ্ভুত প্রাণীটা বারকতক আপন খেয়ালে উল্লুকের মতোই শুকনো ডালটা ধরে চরকিঘোরা হয়ে ঘুরল। ভবভূতি শিউরে উঠে বললেন,–ওটা কী?
গজপতি দেখেই চাপাস্বরে বললেন,–বলো রাম রাম রাম রাম—
ভবভূতি আওড়াতে শুরু করলেন, রাম রাম রাম রাম রাম–
সাবধানে পা টিপেটিপে জায়গাটা পেরিয়ে গিয়ে গজপতি জানালেন,–এই প্রজাতির নাম গেছে। এরা গাছে থাকে। এদের বড় বদ অভ্যেস। টুপটাপ করে ঢিল ছোড়ে। মাথা ন্যাড়া দেখলে তো আর রক্ষে নেই।
রাস্তাটা ডাইনে ঘুরছে এবার। সামনে গেট দেখা যাচ্ছে। তার ওপাশে বাংলো মতো একটা বাড়ি। গেটের কাছাকাছি যেতেই ভবভূতি দেখলেন, আচমকা কী একটা ঢ্যাঙা লিকলিকে মূর্তি সটান ঝোঁপ ঠেলে রাস্তায় এল এবং তাদের সামনে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে গেল। ভবভূতি ফিসফিস করে উঠলেন,–গজু! ওটা কী?
