একথা শোনার পর থেকে আমি আর গদাইয়ের ছায়া মাড়াইনে।
নিঝুম রাতের আতঙ্ক
স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে একগাল হেসে গজপতি আঙুল তুলে বললেন,–ওই যে জঙ্গলমতো জায়গা দেখতে পাচ্ছ, ওখানেই। সূর্য ডুবতে চলেছে, শিগগির পৌঁছতে হবে কিন্তু।
ভবভূতি ট্রেনটা চলে না-যাওয়া অবধি কোনও কথা বললেন না। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঠোঁটের কোনায় সেই অবিশ্বাসের বাঁকা হাসিটা এখনও রেখে দিয়েছেন অবশ্য। ট্রেনটা দূরের বাঁকে গাছপালার আড়ালে মিশে গেলে তখন বললেন, ইয়ে, একটুখানি চা পেলে ভালো হত।
চা!–গজপতি হাসলেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখ তো, এখানে চায়ের দোকান দূরের কথা, আমরা বাদে জনমনিয্যি আর দেখতে পাচ্ছো নাকি?
ভবভূতি দেখলেন। তাই বটে। প্ল্যাটফর্ম খাঁ-খাঁ। শুধু এই স্টেশনঘর–তার মানে একটা টিনের গুমটিঘরের মতো, তা ছাড়া আর কোনও ঘরবাড়িও নেই। গাছপালা-ঝোঁপজঙ্গল নিঝুম হয়ে ঘিরে আছে স্টেশনটা। কেমন যেন থমথমে অস্বস্তিকর হাবভাব। নিঝুম রাতের আতঙ্ক
তারপর হঠাৎ চোখে পড়ল ঝোঁপের আড়ালে দুজন লোক হনহন করে চলে যাচ্ছে। অমনি ভবভূতি বলে উঠলেন,–এই তো দুজন লোক।
গজপতি তা দেখে নিয়ে বললেন,–, এই স্টেশনেরই লোক। স্টেশনমাস্টার আর পয়েন্টসম্যান। কিন্তু ওরা পালাচ্ছে।
পালাচ্ছে, মানে? ভবভূতি অবাক!
স্টেশনে থাকতে চায় না। গজপতি জানালেন। রেলের কোয়ার্টার পর্যন্ত এখানে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। করেছে খানিকটা দূরে। ওরা এখন পালিয়ে সেই কোয়ার্টারে ঢুকবে। পরের ট্রেন আসার সময় হলে স্টেশনে আসবে। ফের পালাবে।
অবিশ্বাসী ভবভূতি বললেন, তাহলে এই স্টেশনঘরটা তৈরি হল কীভাবে শুনি?
সে অনেক হাঙ্গামা করে হয়েছিল। সায়েব ইঞ্জিনিয়াররা এসে বানিয়েছিল। ওরা খুব ডানপিটে ছিল বলেই পেরেছে। গজপতি পা বাড়িয়ে ফের বললেন, আর ট্রেনটা কেমন ঝটপট একটু দাঁড়িয়েই তক্ষুনি লেজ তুলে কেটে পড়ল, দেখলে না? তুমি ঠাহর করলে দেখতে, ড্রাইভার-ফায়ারম্যান-গার্ডসায়েব–এমন কি যাত্রীরাও এ স্টেশনে এসে চোখ বুজে থাকে। ওই সিগন্যাল পেরুলে তখন চোখ খোলে।
আমরা কিন্তু চোখ বুজে নেই। ভবভূতি বাঁকা হাসিটা আরও একটু লম্বা করে দিলেন।
গজপতি বললেন, আমাদের ক্ষতি হওয়ার কারণ নেই বলেই চোখ খুলে রেখেছি। তুমি নিশ্চিন্তে থেকো, আমাদের গায়ে আঁচড় লাগা দূরে থাক, আমাদের উঁকিঝুঁকি মেরে ওরা দেখতে সাহসও পাবে না। কারণ এত বড় প্রজেক্টের চার্জে আছে আমার ভাগ্নে ভূতনাথ। ভূতনাথকে ওরা কী ভয় যে পায়!
প্রজেক্ট। অর্থাৎ বাংলায় যাকে বলে প্রকল্প। এই প্রকল্পের কথা শুনে ভবভূতি কলকাতায় গজপতির ড্রয়িংরুমে যতটা জোরে হেসেছিলেন, এখানে পৌঁছে ততটা পারলেন না। খুকখুক শব্দ হল মাত্র। গজপতির পিছনে-পিছনে রেললাইন বরাবর এগোতে থাকলেন। সূর্য গাছপালার আড়ালে অস্ত যাচ্ছে। আশ্বিন মাস। ঘন সবুজ চেকনাই দেওয়া সেইসব গাছপালার গায়ে নীলচে কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। পাখপাখালি তুমুল হল্লা করছে। ভবভূতি টের পেলেন, কেমন যেন অস্বস্তি তাকে পেয়ে বসছে ক্রমশ। হলেও হতে পারে কিংবা থাকলেও থাকতে পারে গোছের ভাবনা মগজে সুড়সুড় করে বেড়াচ্ছে। বারবার এদিক-ওদিক দেখতে-দেখতে যাচ্ছেন।
.
এই প্রকল্পের কথাটা উঠেছিল সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের কথায়। গতকাল সন্ধ্যায় জোর বৃষ্টি নেমেছিল। রাস্তায় একহাঁটু জল জমে গিয়েছিল। তার সঙ্গে লোডশেডিং। গজপতির ড্রয়িংরুমে মোমবাতির আলোয় বাঘ নিয়ে কথা হচ্ছিল। ভবভূতি যৌবনে। দুর্দান্ত শিকারি ছিলেন। তাই ওঁর সব কথায় বাঘ আসবেই। ওঁর আপশোস, বাঘ মেরে বড় ভুল করেছেন এতকাল। এখন বাঘবংশ দেশ থেকে লোপ পেতে বসেছে। তাই সুন্দরবনে বাঘ প্রকল্প করে সরকার একটা কাজের মতো কাজ করেছেন। বেচারিরা শান্তিতে ওখানে খেয়েপরে বাঁচুক আর বংশবৃদ্ধি করুক।
সেই কথার জের টেনে গজপতি বলেছিলেন–আর ভূতবংশের কথাটা ভাবো ভায়া! আজকাল আর তত ভূত কেউ দেখতে পায়? ভূতেরাও তো লোপ পেতে বসেছে। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি…
বাধা দিয়ে ভবভূতি বলেছিলেন,–ভূত! তুমি ভূত বিশ্বাস করো?
–আলবাত করি। গজপতি দৃঢ়ভাবে জবাব দিয়েছিলেন। সেই তো বলতে যাচ্ছি! হাত তুলে ভবভূতি বলেছিলেন, উঁহু, শুনব না! সব গুল। ভূত নেই।
নেই! গজপতি ফুঁসে উঠেছিলেন। আলবাত আছে। চলো, এক্ষুনি চলো– আছে না নেই টের পাইয়ে দিচ্ছি।
কোথায় যাব শুনি? –ভবভূতি হাসতে-হাসতে বলেছিলেন। কোনও পোড় বাড়িতে, নয়তো শ্মশানে–এই তো? আমি ওসব জায়গা চষে ফেলেছি একসময়। ভূতের টিকিও দেখিনি।
গজপতি রেগে গিয়েছিলেন,–ঠিক জায়গায় গেলে তো দেখবে। তাছাড়া বললুম তো, আজকাল আর তত ভূত নেই। আগে যেমন পাড়াগাঁয়ে যখন-তখন বাঘ দেখা যেত এখন কি যায়? যায় না। আর তুমিই তো বললে, বাঘবংশ লোপ পাচ্ছে বলে সুন্দরবনে বাঘ প্রকল্প করা হয়েছে।
–হয়েছে। প্রকল্প না বলে বলো, বাঘেদের অভয়ারণ্য।
–হুঁ, ঠিক তাই বলতে যাচ্ছিলুম তোমায়। শুনবে, না খালি গোঁ ধরবে। রামচন্দ্রপুর নামে স্টেশন আছে শুনেছ কখনও? শোননি।
ভবভূতি বাঁকা হেসে বলেছিলেন, না শুনিনি। তা হয়েছে কী?
–রামচন্দ্রপুরে ঠিক তোমার সুন্দরবনের বাঘেদের অভয়ারণ্যের মতো ভূতেদেরও বংশরক্ষার জন্য অভয়ারণ্য করা হয়েছে জানেন? আর তার প্রজেক্ট অফিসার কে জানো?
