–হাঁটুতে বাত। খুব ভুগছেন।
আহা রে। বরাবর ওর ওই বাতের অসুখ। এদিকে আমার আবার অম্বলের ব্যামো?
–আপনাকেও জ্যাঠামশাই বলব কিন্তু।
–একশোবার বলবে বইকী বাবা। যতবার খুশি বলবে।
শূলপাণির সঙ্গে শিগগির আমার ভাব হয়ে গেল। কিন্তু অভদ্রতা হবে ভেবে এ বাড়ির দুর্নামের কথা তুলতে পারলুম না। একথা-সেকথার পর শূলপাণি হাঁক দিলেন,–খ্যাঁদা! ওরে খাদা! বাবাজীর জন্যে চা-ফা আন! ও খ্যাঁদা! শুনতে পাচ্ছিস নে হতভাগাঁ?
বলার সঙ্গে সঙ্গে দরজার কাছ থেকে নাকিস্বরে কে বলে উঠল,–যাঁই স্যাঁর!
তারপর যে মূর্তিটি ঢুকল, তাকে দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল। কালো কুচকুচে এবং চামচিকের মতো চেহারা একটা লোক। মাথায় বুরুশের মতো চুল। বড়-বড় কান, পরনে ঢোলা হাফপেন্টুল। একটা ট্রে রেখে সে আমার দিকে জুলজুল চোখে তাকাতে-তাকাতে বেরিয়ে গেল। শূলপাণি একটু হেসে বললেন,-খাদা খুব কাজের লোক। নাও বাবাজী, সন্দেশ খাও।
সন্দেশ থেকে কেমন ভুরভুর মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে। মুখে পুরতেই কিন্তু অবাক হলুম! সঙ্গে সঙ্গে যেন উবে গেল। একি আজগুবি সন্দেশ রে বাবা! দিল্লিকা লাড়ু একেই বলে না তো? চায়ের স্বাদটাও খাসা। কিন্তু গলার কাছে যেতে কী একটা ঘটে যাচ্ছে। ঢোক গিলতে গিয়ে টের পাচ্ছি, বিলকুল উবে গেছে। স্রেফ গন্ধটুকুই সার।
ওদিকে শূলপাণি তার বন্ধু গদাধরের ছেলেবেলার কথা বলছেন। আমি আনমনা হয়ে আছি। ব্যাপারটা সুবিধের মনে হচ্ছে না। একটু পরেই শীতের বেলা ফুরিয়ে এল। আমি উঠি-উঠি করছি, শূলপাণি কিছুতেই ছাড়বেন না। রাতের খাওয়াটাও খেয়ে যেতে হবে। শুনে আরও অস্বস্তিতে পড়েছি।
ঘরের ভেতরটা আবছা হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। বললুম,–আলো জ্বালাবেন না জ্যাঠামশাই?
শূলপাণি বললেন,–দেখ বাবা অমু, আলো তো আমরা সব সময়ই পাচ্ছি। অন্ধকার কতটুকু পাই। বলবে, অন্ধকার প্রায় ঘন্টা বারো থাকে। কথাটা ভুল। প্রথম কথা–অন্ধকারকে আমরা আলো জ্বেলে নিকেশ করি। তার ওপর ওই ব্যাটা চাঁদ বড় ধড়িবাজ। আকাশে লণ্ঠন ঝুলিয়ে দিতে ওস্তাদ! তাছাড়া মহা বিচ্ছু ওই ফুটকি ফুটকি তারা। এদিকে জোনাকি হারামজাদাগুলোও কম যায় না। হায় রে! প্রাণভরে অন্ধকারের স্বাধ কতটুকুই বা পেলুম? তাই তো এমন বাড়িতে এসে জুটেছি।
এই সময় দরজার একপাশে এক ঘোমটা-ঢাকা স্ত্রীলোক ঠিক সেই খ্যাঁদার মতো নাকিস্বরে বলে উঠল,-ঘঁরে ঝঁড় দেঁব বাবুমশাই!
শূলপাণি বললেন,–হ্যাঁ, সাফ করে দাও খ্যাঁদার মা! বাবা অমু, একটুখানি ঠ্যাং তুলে বসো এবারে। পুরনো বাড়ি। তাই সবসময় চুনবালি খসে মেঝে নোংরা হয়ে থাকছে।
দুজনে ঠ্যাং তুলে বসে আছি। খাদার মা ঝাড়ু বুলোচ্ছ। আবছা অন্ধকারে তার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। খালি ভাবছি, ঝাড়ু দিয়ে ঘরদোর সাফ করার সময় কি সন্ধ্যেবেলা? সে তো সকালের কাজ। এ বাড়িতে যেন সন্ধ্যা হচ্ছে না, আসলে সকালই হচ্ছে। উঁহু ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না।
একটু পরে সে আমার চেয়ারের কাছে এসে ঝাড়ু বুলোতে-বুলোতে হঠাৎ ঘোমটার ফাঁকে মুখ তুলে কে জানে কেন, ফিক করে হাসল।
সঙ্গে-সঙ্গে আমার হৃৎপিণ্ডে খিল ধরে গেল, আতঙ্কে! ওরে বাবা। এ কী দেখছি। এ যে কংকালের মুখ। দাঁত বের করে আছে। দুটি চোখের গর্ত ছাড়া আর কিছু নেই। নাকের ডগাতেও একটা গর্ত। এত কাছে প্রায় নাকের ডগায় বলে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
আর বসে থাকতে পারলুম না।
এক লাফে চেয়ার থেকে নেমে দরজা গলিয়ে দৌড়লুম। সিঁড়িতে পা হড়কে গেল। গড়াতে-গড়াতে নীচের বারান্দায় পড়লুম। ওপর থেকে শূলপাণি চ্যাঁচিচ্ছেন– অমু! অমু! পালাচ্ছ কেন? কী হল কী হল অমু? রাতে যে খাওয়ার নেমন্তন্ন তোমার!
আর খাওয়ার নিকুচি করেছে। ততক্ষণে আমি উঠোন পেরিয়ে সদর দরজায়। তারপর সেখান থেকে বস্তির গলিতে ঢুকে পড়েছি। আমাকে এভাবে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে দেখে খাঁটিয়ায় বসে থাকা কয়েকজন লোক চোর-চোর! পাকড়ো-পাকড়ো! বলে চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিল।
তাই শুনে এপাশ থেকে ওপাশ থেকে পিলপিল করে লোকেরা বেরুতে শুরু করছে। বেদম চ্যাঁচিচ্ছে। কিন্তু ভাগ্যিস, বস্তিটায় ইলেকট্রিক লাইন নেই এবং সন্ধেরাতেই ঘন কুয়াশা জমে উঠেছে। আমাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। অনেক কষ্টে আমাদের বাড়ির সামনে যখন পৌঁছেছি, তখন জ্যামাপ্যান্টে গোবর আর কাদা যথেচ্ছ মেখে গেছে। ছিঁড়ে ফর্দাফাইও হয়েছে। এক পাটি জুতো নেই পায়ে। কেটে-ছড়ে রক্ত বেরুচ্ছে। সটান গিয়ে প্রথমে গদাইজ্যাঠার ফ্ল্যাটের বেলের সুইচ টিপলুম। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলুম।…
জ্ঞান হলে দেখি, গদাইজ্যাঠার বিছানায় শুয়ে আছি। সব ফ্ল্যাটের লোক জড়ো হয়েছে ঘরে। সস্নেহে বললেন,–আর ভয়ের কিছু নেই! এবার সবাই আসুন।…
কিছুক্ষণ পর ওঁকে আগাগোড়া সব জানালুম। তখন গম্ভীর হয়ে মাথা দুলিয়ে বললেন, আমারই বোকামি হয়েছিল। জানি, শূলোটা মহা পাজী! এক নম্বর ফড়বাজ! মরে গেলেও স্বভাব যাবে কোথায়?
হতভম্ব হয়ে বললুম,–মরে গেলেও মানে?
গদাধর বললেন, হ্যাঁ। বছর সাতেক আগে শূলো ডাকাত ধরতে গিয়ে বোমার আঘাতে মারা পড়েছিল। বড় গোঁয়ার ছিল ও। তবে কি জানো, আমার ছেলেবেলার বন্ধু তো। সবসময় ওর কথা ভাবি। যাক গে, ভালোই হল। কাছাকাছি এসে জুটেছে যখন, গিয়ে আলাপ করে আসব।…
