–নিশ্চয় হয়। হওয়ারই কথা।
–হুঁ-হুঁ। আমি সেই গদাই দারোগা। ভূত-মানুষকে একঘাটে জল খাইয়ে ছেড়েছি। আমিও লাইন দিলুম।
–তারপর, তারপর?
–লাইন দিলুম শুক্রবার রাত বারোটায়। শনিবার রাত বারোটায় দেখি যেখানে ছিলুম, সেখানেই আছি। বলো, ব্যাপারটা ভৌতিক নয়?
–নিশ্চয় ভৌতিক।
–যাইহোক, আমিও তখন ভূতের কায়দা দেখালুম। ওদের ব্যাপার-স্যাপার সবই তো জানি।
–কী করলেন জ্যাঠামশাই? কী করলেন?
–ওদের মতো ডিগবাজি খেয়ে শুন্যে উড়লুম। তারপর এর কাঁধ ওর মাথার ওপর দিয়ে এগিয়ে টিকিটের ফোকরে হাত গলিয়ে দিলুম।
ব্যাপারটা ভাবতে হৃৎকম্প হচ্ছিল আমার। এই আড়াই কুইন্টাল শরীরের চাপে কতজনের কাঁধের হাড় আর মগজের ঘিলু চিড়িক করে দুভাগ হয়েছে কে জানে! নির্ঘাৎ পরে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়েছিল।
গদাধর বললেন, সিনেমা হলে ঢুকে আরও প্রমাণ পেলুম। ভেবে দেখ, আমার ডাইনে আর বাঁয়ে দুপাশে দুই ভূত আবিষ্কার করে তখন আমি অবাক। ওরা কী করছে। জান? খালি হি-হি করে হাসছে আর চেয়ারে মচমচিয়ে নাচছে। স্বভাব যাবে কোথায়? আর ঠিক সেই সময় আচম্বিতে লোডশেডিং।
গদাধর চুপ করলেন। দু-চোখে হাসির ঝিলিক দিচ্ছে।
বললুম, হল অন্ধকার হয়ে গেল তো?
–হ্যাঁ। তারপর যা হওয়ার তাই হল। এমন সুযোগ ভূতেরা ছাড়বে কেন? সে এক ধুন্ধুমার বেধে গেল। অন্ধকারে নানারকম ভৌতিক আওয়াজ হতে থাকল। বেচারা মানুষগুলোর প্রাণান্ত! তাদের কারা কাতুকুকু দিচ্ছে। কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। নাক কান খামচে দিচ্ছে। চ্যাঁচিমেচিতে লুলু কাণ্ড!
গদাধর মাঝে-মাঝে কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে যান। গুম হয়ে কী ভাবেন। তখন আর হাজারবার প্রশ্ন করেও জবাব পাইনে।
এই ঘটনা বলতে বলতে উনি তেমনি চুপচাপ তুষোমুখে পোড়োবাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। গতিক দেখে আমি কেটে পড়েছিলুম সেদিন।…
এবার শীতটা খুব জাঁকিয়ে এসেছিল। এইতে গদাই জ্যাঠার বাঁ-হাঁটুর বাতটা খুব বেড়ে গেছে। চলাফেরা প্রায় বন্ধ। চুপচাপ শুয়ে থাকেন আর খবরের কাগজ পড়েন। কাপের পর কাপ চা খান। মাঝে-মাঝে গিয়ে দেখে আসি। ওঁর চাকর ভোঁদা বাতের জায়গায় কবরেজী তেল মালিশ করে দেয়। জানালায় রোদ্দুর পড়ে দুপুরবেলা। জ্যাঠামশাই বাতকে রোদ্দুরের ছ্যাকায় শায়েস্তা করেন।
একদিন গেছি, বললেন–অমু, এসো, এসো। তোমার কথাই ভাবছিলুম।
–কেমন আছেন জ্যাঠামশাই?
–সে কথার জবাব না দিয়ে গদাধর জানালা দিয়ে পোডড়াবাড়িটার দিকে আঙুল তুলে বললেন-অমু, এক কাণ্ড হয়েছে।
–কী হয়েছে জ্যাঠামশাই?
–তুমি কি লক্ষ করোনি?
–না তো?
–কাল থেকে ওই হানাবাড়িতে একজন ভাড়াটে এসেছে।
–বলেন কী!
–হ্যাঁ। প্রথমে ভেবেছিলুম, ভূতটুতই হবে। কিন্তু পরে সন্দেহ হল–না, মানুষ। কারণ, রোদ্দুরে রেলিঙে কাপড়-চোপড় শুকোতে দেখলুম। ভূতেরাও কাপড় শুকোতে দেয়। তবে রোদ্দুরে নয় অন্ধকারে। আমরা যেমন শীত করলে রোদ্দুরে বসি, ওরা শীত করলে অন্ধকারে বসে থাকে। তো, যা বলছিলুম শোন! আমার তো এই অবস্থা। তুমি গিয়ে আলাপ করে এসো তো ভাড়াটে ভদ্রলোকের সঙ্গে। কে উনি, কেন এ বাড়ি ভাড়া নিলেন–সব তন্নতন্ন করে জেনে আসবে কিন্তু। তোমাকে গোয়েন্দার দায়িত্ব দিলুম।
শুনে খুশিও হলুম, আবার ভয়ও লাগল। ওই ভূতের বাড়ির ত্রিসীমানায় কখনও পা বাড়াইনি!
পরে আমার ঘরে থেকে জানালা দিয়ে ভালো করে দেখে নিলাম বাড়িটা। হ্যাঁ, সত্যি একজন ভাড়াটে এসেছেন বটে। ফাটল ধরা দেয়াল আর ছাদ! তার মধ্যে কী সাহসে ভদ্রলোক বসবাস করতে এলেন ভেবে অবাক লাগল!
ভদ্রলোকের বয়স দূর থেকে যতটা আঁচ করলুম, গদাধরের প্রায় কাছাকাছি মনে হল। তবে উনি বেজায় ঢ্যাঙা এবং রোগা। অবশ্য গোঁফ আছে গদাধরের মতোই। বাতও আছে কিনা কে জানে!
সারা দুপুর ভদ্রলোকের গতিবিধি লক্ষ করে ভয়ের কিছু দেখলুম না। তখন বিকেলে ওঁর সঙ্গে আলাপ করতে গেলুম।
বাড়িতে ইলেকট্রিক লাইন নেই। নিশ্চয় ছিল এক সময়! এখন নেই। তাই দরজায় কড়া নাড়তে হল। অনেকক্ষণ জোরে কড়া নাড়ার পর দরজা খুলল। ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে বললেন, কাকে চাই?
তবু একটু ভয়েভয়ে বললুম, আপনি নতুন এসেছেন পাড়ায়। তাই আলাপ করতে এলুম।
ভদ্রলোক খুব খুশি হয়ে বললেন,–আসুন-আসুন। এসে অব্দি বড্ড একা লাগছে মশাই! আমিও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ করার জন্যে হাপিত্যেশ করছি।
সেকেলে বাড়ি। এক টুকরো উঠোন আছে। রাজ্যের আবর্জনা আর জঙ্গল গজিয়ে রয়েছে সেখানে। বারান্দা ঘুরে সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে-উঠতে ভদ্রলোক বললেন, সবে এসেছি। এখনও সাফ করতে পারিনি কিছু। আশা করি, দু-একদিনের মধ্যে বাড়িটার ভোল বদলে ফেলব!
ওপরে একটা বড় ঘরে ঢুকলাম। এই ঘরের ভেতরটা কিন্তু অক্ষত আছে। ভদ্রলোক চমৎকার সাজিয়ে ফেলেছেন। সেকেলে আসবাবপত্র সাফ করেছেন! একটা গদিআঁটা চেয়ারে বসলুম। উনি একটা আরাম কেদারায় বসলেন। তারপর আলাপ পরিচয় শুরু হল।
জানলুম, ওঁর নাম শূলপাণি চক্রবর্তী। উনিও পুলিশের দারোগা ছিলেন এবং রিটায়ার করেছেন শুনে আমি জ্যাঠার কথা তুললুম।
অমনি উনি হা-হা করে হেসে বললেন,–আঁ! বলেন কী! গদা ওই বাড়িতে থাকে? সেই গদা?
আমি অবাক। আপনি চেনেন গদাইজ্যাঠাকে?
–আলবাত চিনি। খুব চিনি। আরে মশাই, পাশাপাশি দুই থানাতে ছিলুম শত বচ্ছর। তার ওপর ও ছেলেবেলাতেও বন্ধু ছিল। একসঙ্গে চাকরিতে ঢুকেছিলুম। প্রায় একসঙ্গে রিটায়ার করেছি। গদা বহরমপুরের ছেলে। আমিও। একেবারে পাশাপাশি বাড়ি ছিল। যাক গে, খুব খুশি হলুম। গদাকে গিয়ে বলবেন আমার কথা। কেমন আছে সে?
