ভূতনাথ খ্যা খ্যা করে হেসে বললেন,-মনে আছে আপনার? মশাই, ব্যাটা আমার মতো ধুরন্ধর লোককেও কী রামঠকানো ঠকিয়েছিল ভাবা যায় না। বাজ পড়ে সত্যি-সত্যি পাঁচু-চোর মরেনি। কাজেই হারাধনবাবুর ভূতও তার দেহে ঢুকে ঝড় বৃষ্টির সময় নিজের পোড়োবাড়িতে হাজির হননি। আসলে সাক্ষাৎ পাঁচুই আমাকে গণ্ডগোলে ফেলেছিল। ব্যাটা অসম্ভব ধূর্ত মশাই! আমার সঙ্গে রসিকতা করতে এসেছিল। কী স্পর্ধা।
দুই বন্ধু
আমাদের তেতলার এই ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দায় দাঁড়ালে বাড়িটা দেখা যায়। হাড়গোড় বের করা খুব পুরোনো একটা বাড়ি। পলেস্তারা কবে খসে গেছে। দেয়ালের ফাটলে গজিয়ে উঠেছে অশ্বথের চারা আর উঁচু-উঁচু ঘাস। কেউ না বললেও বুঝতে পেরেছিলুম, ওটা একটা পোড়োবাড়ি।
পোড়োবাড়িতে ভূত থাকে, তা সবাই জানে। ওই দোতলা বাড়িটার চারদিকে বস্তি এলাকা। নিচু টালির ছাদওয়ালা অজস্র ঘর আর গরু মোষের খাটাল। একটা পুকুরও আছে। সবসময় লোকজন গিজগিজ করে। প্রায়ই মাইক বাজে। মাইকের চোটে আমাদের কান ঝালাপালা।
তাই ভাবতুম, পোড়োবাড়ির ভূতগুলো টিকে আছে কীভাবে? চারপাশে এত সব লোক, এত গরুমোষ, তার ওপর সারক্ষণ দিনরাত মাইক।
আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের গদাধরবাবু একজন ভূতবিশারদ। ভূতপ্রেত সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান অর্জন করেছেন সারাজীবন। করবেন না কেন? ভদ্রলোক ছিলেন জাঁদরেল দারোগা। থাকতেন মফস্বলের থানায়। চোর-ডাকাত ধরতে গাঁয়ে-গাঁয়ে রাতবিরেতে ঘুরতে হয়েছে। তার ফলে অসংখ্যবার ভূতের পাল্লায় পড়েছেন। ভূতেরাও তার পাল্লায় পড়েছে। যেমন বাঘা তেঁতুল, তেমনি বুনো ওল। কত ভূতকে যে বেদম রামধোলাই দিয়েছেন, কহতব্য নয়। একবার চোর ভেবে গেরস্থবাড়িতে আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করা এক ভূতকেই পাকড়াও করে ফেলেছিলেন। থানায় নিয়ে আসার পথে তার সে কী কান্না মাইরি স্যার, আঁমি চোর নই, ভূত! যা প্রমাণ চাইবেন, পেঁব। আমায় ছেড়ে দিন।
গদাই দারোগা বলে,–শেষ অবধি অনেক প্রমাণ আদায় করে তবে ব্যাটাকে ছেড়েছিলুম।
–কী প্রমাণ জ্যাঠামশাই?
–সে অনেক। পরে বলবখন। ওরা ইচ্ছেমতো চেহারা ধরতে পারে। চেনা কঠিন। কলকাতার শহরে এত সব লোকের মধ্যে কত ভূত যে বেড়াচ্ছে, খবর রাখ? আমি টের পাই। কারণ, কে ভূত কে মানুষ, তার প্রমাণ আমার জানা।
পরে আর কথাটা জিগ্যেস করা হয়নি। উনিও তোলেননি। তবে এটুকু বুঝে নিয়েছিলুম, দারোগা জীবনে উনি সত্যি বড় দাপটওয়ালা পুলিশ অফিসার ছিলেন।
হ্যাঁ, ওঁকে আমি জ্যাঠামশাই বলেই ডাকি। এখন বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। প্রকাণ্ড মানুষ। চুল গোফ দাড়ি পেকে সাদা হয়ে গেছে। অনেক রকম অসুখ-বিসুখে ভোগেন। সবচেয়ে কষ্টদায়ক বাঁ-হাঁটুর বাত। বাতটা বৃষ্টির সময় আর শীতকালে চাগিয়ে ওঠে। তখন লাঠি ধরে খুঁড়িয়ে হাঁটেন।
তো এই গদাই জ্যাঠা-ই বলেছিলেন–ওই দোতলা বাড়িটা দেখছ! ওটা একটা হানাবাড়ি। আজকাল পাড়াগাঁয়ে ভূতপ্রেতগুলোও খুব শহুরে হয়ে উঠেছে কিনা। বাড়ি খালি পেলে কথাই নেই। গতমাসে আমরা ফ্ল্যাটে তালা এঁটে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলুম। ফিরে গিয়ে টের পেলুম, একগাদা ভূত এসে আশ্রয় নিয়েছে। অনেক হাঙ্গামা করে তাড়াতে হল।
শুনে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। যদি কখনও বাইরে কোথাও যেতে হয়, কিছুতেই ফ্ল্যাট খালি রেখে যাব না। কাউকে রেখে যাব। ভূত বিশারদ গদাই জ্যাঠা অভিজ্ঞ মানুষ। ওঁর পরামর্শ কি অবহেলা করা যায়?
যাইহোক, জীর্ণ ওই দোতলা পোড়োবাড়ির ভূতগুলো সম্পর্কে গদাই জ্যাঠা অনেক খবরাখবর দিয়েছিলেন। ও বাড়ির ওপরে-নিচে মোটমাট দশখানা ঘর আছে নাকি। দশখানা ঘরে কমপক্ষে দশ ডজন ভূত বাস করে। বুড়োবুড়ি থেকে শুরু করে কাচ্চাবাচ্চা পর্যন্ত সব বয়সের ভূতই নাকি আছে। গদাই জ্যাঠা একদিন আলাপ করতে গিয়ে ব্যাজার হয়ে ফিরে এসেছেন। দারোগা ছিলেন শুনেই ভীষণ ভয় পেয়ে ওরা মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
আমি জিগ্যেস করেছিলুম,–আচ্ছা গদাই জ্যাঠা, আপনার কাছেই তো শুনেছি, ভূতেরা নিরিবিলি থাকতে ভালোবাসে। হই-হল্লা আলো এসব পছন্দ করে না। অথচ ওই বস্তি এলাকায় এত মাইকের চ্যাঁচিমেচি, হই-হল্লা, ভিড়-ভাড়াক্কা! তাহলে ওরা টিকে আছে কীভাবে?
গদাই জ্যাঠা ফিক করে হেসে বলেছিলেন, বুঝলে না? এরা যে একেলে ভূত। এদের স্বভাব একেবারে উল্টো। এরা হই-হল্লা জেল্লাই পছন্দ করে। বিশেষ করে একেলে ভূতেরা হিন্দি ফিল্মের বড় ভক্ত। কলকাতার এত সব সিনেমাঘরে হিন্দি ফিল্ম দেখে মৌজে যারা বসে থাকে, তাদের শতকরা কতজন মানুষ আর কতজন ভূত জান?
–তা তো জানিনে জ্যাঠামশায়!
–ফর্টি পারসেন্ট। শতকরা চল্লিশজন।
–ওরে বাবা বলেন কী?
–হ্যাঁ। তাহলে খুলেই বলি। কাকেও বলো না কিন্তু।বলে গদাধর ফিসফিস করে জানিয়েছিলেন–একদিন একটা সিনেমা হলে টিকিট কাউন্টারে বিরাট লাইন দেখে সন্দেহ হল। শুনলুম, আগের রাত থেকে পরদিন বিকেল অব্দি এই লাইন জমে আছে। একি মানুষের পক্ষে সম্ভব? তার ওপর স্বচক্ষে দেখলুম, লাইনের লোকগুলোর মধ্যে কিছু লোক দিব্যি শূন্যে উড়ে এর কাধ ওর মাথার ওপর দিয়ে সটান গিয়ে হাত বাড়াচ্ছে এবং টিকিট নিয়ে নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। বলল, সন্দেহ হয় কিনা?
