দারোগাবাবু খিকখিক করে হেসে বললেন, ধুর মশাই। ভূতের আবার সত্যি মিথ্যে আছে নাকি? ভূত ইজ ভূত। ভূতকে ভয় পেতে নেই। তাছাড়া আমি পুলিশের দারোগা। আমায় দেখলেই ভূতের হৃৎকম্প হয়।
এইসময় খ্যানখেনে গলায় ভেতরের দরজার কাছে কে বলে উঠল,–কে বাপু তোমরা খালি ভূত-ভূত করছ তখন থেকে?
ভূতনাথ টর্চের বোতাম টিপলেন হয়তো, পুট-পুট আওয়াজ শুনলুম। কিন্তু আলো জুলল না। ভূতনাথ রেগেমেগে বললেন, ধ্যাত্তেরি!
আমি আরেকজন মানুষের সাড়া পেয়ে প্রথম চমকালেও পরে সাহসী হয়েছি। বললুম, তুমি কে হে? সাড়া না দিয়ে ঘরে ঢোকাটা ঠিক হয়নি কিন্তু।
বিদ্যুতের আলোর ঝিলিকে রোগা একটা লোককে দেখতে পেলুম। খালি গা। ভিজেছে বলেই মনে হচ্ছিল। সে বলল, তখন থেকে ভেতরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি আর তোমাদের কেত্তন শুনছি। আমায় ভয় পাওনা বুঝি?
ভূতনাথ খাপ্পা হয়ে বললেন, তুমিই আস্ত ভূত। সাড়া না দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছিলে কোন মতলবে? কে তুমি? বাড়ি কোথায়?
লোকটাও চটেমটে বলে উঠল, দারোগাই হও আর যেই হও বাপু, ভদ্রতা করে কথা বলবে। ইস! বলে–কে তুমি, বাড়ি কোথায়! আমার বাড়িতে আমারই শোওয়ার ঘরে ঢুকে আমাকে ধমক দেওয়া হচ্ছে! কী স্পর্ধা।
আমার একটু সন্দেহ জাগল। বললুম,–মশায়ের নাম কি হারাধনবাবু?
–আবার কী? আমি সেই হারাধন জোয়ারদার।
আমার বুকে হাতুড়ির শব্দ হতে থাকল। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। কিন্তু ভূতনাথ দারোগা হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন,–এ ব্যাটা নির্ঘাৎ উন্মাদ। বদ্ধ পাগল। হারাধনবাবু শুনেছি মান্ধাতার আমলে ডাকাতের হাতে খুন হয়ে মারা পড়েছেন!
চোপরাও। –লোকটা গর্জে উঠল। কাসর-ঘণ্টার আওয়াজ যেন। তারপর ভেংচি কেটে বলল, ডাকাতের হাতে খুন হয়ে মারা পড়েছে–তো কী হয়েছে?
দারোগাবাবু আমাকে লক্ষ করে বললেন,–শুনছেন? শুনছেন মশাই ব্যাটার কথা?
এই? ব্যাটাব্যাটা কোরও না বলে দিচ্ছি! মানহানির মামলা করব। লোকটা শাসাল। আমার মাসতুতো ভাইয়ের নাতির বন্ধু এম. এল. এ। আমার ভাগ্নের সম্বন্ধীর খুড়ো এম. পি.-র প্রাইভেট সেক্রেটারি। আমার মেজদার শ্বশুর বিলেতে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাপের ক্লাসফেন্ড ছিলেন। সাবধান!
ভড়কে গিয়ে ভূতনাথ দারোগা বললেন, আহা! ব্যাটা কি আপনাকে বলছি, বলছি আপনার ব্যবহারকে। আগে সাড়া নেই শব্দ নেই, হঠাৎ অমন করে কথা বলতে শুরু করলেন। তার ওপর বলছেন এক সৃষ্টিছাড়া কথা। যে মানুষ ডাকাতের হাতে খুন হয়, সে বেঁচে থাকে কেমন করে? বলুন না–এটা কি কেউ মানবে?
প্রচণ্ড শব্দ করে কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়ল। বাড়িটা কেঁপে উঠল থরথর করে। ভয় হল, ছাদ ভেঙে পড়বে না তো?
লোকটা দারোগাবাবুর কথায় একটু শান্ত হয়ে বলল,-দেখ বাপু। সত্যি বলছি, আমি মরিনি। হা-আমার দেহটা পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছে; কিন্তু আত্মা? আত্মার তো বিনাশ নেই।
ভূতনাথ দারোগা আরও ভড়কে গিয়ে বললেন,–আপনি যদি হারাধনবাবুর আত্মা তাহলে যে-দেহ ধরে এসেছেন এবং কথা বলছেন, সেই দেহটা কোথায় পেলেন?
–চুরি করেছি।
–চুরি! আপনি তাহলে চোর! দারোগাবাবু পা বাড়াচ্ছেন। টের পেলুম অন্ধকারে। জানেন? আপনাকে তাহলে আমি অ্যারেস্ট করতে পারি!
আবার ঝগড়া বাধবে দেখে বললুম,
–একটা কথা হারাধনবাবু। কার দেহ চুরি করেছেন? পাঁচু নামে একটা লোকের।
ভূতনাথ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,–সেই দামি হারামজাদা পাঁচুর? কী কাণ্ড । আজ এক গাঁয়ে পাঁচুকেই তো পাকড়াও করতে এসেছিলুম!
আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললুম,–ও হারাধনবাবু! পাঁচুর দেহটা যে চুরি করলেন, পাঁচুর আত্মার কী হল? তাকে কীভাবে তাড়িয়ে তার দেহ চুরি করলেন?
লোকটা তেমনি খ্যানখ্যানে গলায় হেসে বলল, একটু আগে ব্যাটা পেঁচো পুকুরপাড়ে একটা গাছের তলায় বাজ পড়ে মারা গেছে। আমি ছিলাম সেই গাছের ডালে! যেই না কেঁচোর আত্মাটা দেহছাড়া হয়েছে, আমি সুড়ুৎ করে ওর দেহে ঢুকে পড়েছি। পেঁচোর আত্মা এখনও টের পায়নি অবিশ্যি। টের পেয়ে ঝগড়া করতে এলে না হয় ফেরত দেব। কী বলেন?
ভূতনাথ ততক্ষণে মনে মনে বুঝি আইনের প্যাঁচ কষছিলেন। এবার বললেন, দেখুন মশাই! ভেবে দেখলুম, আমরা যখন কোনও আসামি পাকড়াও করি, তখন তার দেহটাকেই পাকড়াও করি। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেহটা পাঁচুর। অতএব পাচুর দেহকে অ্যারেস্ট করলে আইনসম্মত কাজ হয়। কই, দেখি হাত দুটো!
ভূতনাথের পকেটে নিশ্চয় হাতকড়া ছিল! অন্ধকারের মধ্যে মালুম হল, হাতকড়া নিয়ে এগোচ্ছেন। তারপর একটা ধস্তাধস্তির শব্দ শুনলুম! তারপর বিকট
চেঁচিয়ে উঠলেন ভূতনাথ,-পাকড়ো! পাকড়োয় আসামি ভাগ যাতা!
বাইরে বিদ্যুতের আলোয় দেখলুম, ভূতনাথ দারোগা উঠোনে ছুটোছুটি করছেন বৃষ্টির মধ্যে। লোকটাকে দেখতে পেলুম না। একটু পরে ভূতনাথেরও পাত্তা নেই। ওঁর সাইকেলটা পড়ে রইল ঘরে।
এবার আমার ভীষণ ভয় হতে লাগল। মরিয়া হয়ে পাশের ঘরে, তারপর সেই ভাঙা দরজা দিয়ে বাইরে গেলুম। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে টলতে টলতে কিছুটা এগিয়েছি, দেখি একদল লোক লণ্ঠন আর টর্চ নিয়ে আসছে।
আমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন রবীন্দ্রজয়ন্তীর উদ্যোক্তারা।… বছরখানেক পরে মফস্বলে এক আত্মীয় বাড়ি গেছি। ফেরার সময় রেলস্টেশনে ভূতনাথ দারোগার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আরও প্রকাণ্ড হয়েছেন উনি। ঊড়ির বহরও বেড়েছে। একথা-সেকথার পর জিগ্যেস করলুম,–সেই পাঁচুর দেহটাকে শেষ পর্যন্ত পাকড়াও করতে পেরেছিলেন তো?
