তোতামামা হাসলেন। –তা মন্দ বলেনি। কলকাতা গিয়ে চিৎপুর থেকে যাত্রা-থিয়েটারের দোকানে গোঁফ-পরচুলো কিনে বরং ফিরে আসব। ইশ! এই সামান্য বুদ্ধিটা মাথায় কেন যে আসেনি! আসলে পুটুকে বইগুলো দেওয়ার জন্য আমার তর সইছিল না। হা–আসলে সেই দাড়িবাবারা! শয়তানগুলো আমার বুদ্ধিসুদ্ধি শেষ করে দিয়েছে।
বলে তোতামিয়া ব্যাগ থেকে টুপি বের করে মাথায় চাপিয়ে তক্ষুনি বেরিয়ে গেলেন।…..
একটু পরিশিষ্ট আছে। তোমামা সত্যি নকল গোঁফ আর পরচুলো পরে ফিরে এসেছিলেন। আমি, বাবা, মা–কেউই রটিয়ে দিইনি ব্যাপারটা। বরং খুশিই হয়েছিলুম। সেই পেস্লায় গোঁফ ছাড়া কি তোমামা আর তোতামামা থাকেন? সুকুমার রায়ের পদ্যে পড়েছিলুম না? গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা!
দারোগা, ভূত ও চোর
কৈলাসপুর থানার দারোগাবাবু ভূতনাথ পাত্রের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল নেহাত দৈবদুর্বিপাকে। পাড়াগাঁয়ের এক রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে গিয়েছিলুম। সবে উদ্বোধন সঙ্গীত শেষ হয়েছে, হইহই-রইরই করে তেড়ে এসে গেল কালবৈশাখি। যেমন ঝড়, তেমনি বৃষ্টি। সে এক ধুন্ধুমার অবস্থা। মঞ্চের তেরপল উড়ে গিয়ে কোন তেপান্তরের মাঠে পড়ল কে জানে! গাঁয়ের লোকজন আর কাচ্চাবাচ্চা যে যার বাড়ি গিয়ে ঢুকল। উদ্যোক্তাদের আর খুঁজে পেলুম না। একে তো ভর সন্ধেয় অনুষ্ঠান শুরু। তার ওপর ঝড়বৃষ্টির কালো রং সন্ধ্যাটাকে বেজায় আলকাতরা করে ফেলল। ভাগ্যিস বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। মাথা বাঁচাতে দৌডুচ্ছিলুম দিশেহারা হয়ে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঘন গাছপালার ভেতর একটা বাড়ি দেখে তার বারান্দায় উঠলুম। কিন্তু বারান্দায় টেকা দায়। দরজায় ধাক্কা দিতে গিয়ে দেখি, দরজা ভাঙা। ভেতরে ঢুকে পড়লুম।
পকেটে দেশলাই ছিল। ভিজে গেছে ততক্ষণে। কোনওরকমে একটা কাঠি জ্বালিয়ে যা দেখলুম, তাতে স্বস্তি পেলুম না। মেঝেয় আবর্জনার ভঁই, ইঁদুরের গর্ত, চামচিকের নাদি–একটা সাপের খোলস পর্যন্ত।
সর্বনাশ! বাড়িটা যে দেখছি পোড়োবাড়ি। ভূতকে যদি বা মন্তরতম্ভর আওড়ে জব্দ করতে পারি, সাপকে মন্তরতন্তরে বশ করব এমন ওঝা তো আমি নই। কারণ শুনেছি সাপ কানে শোনে না। ভূত কিন্তু দিব্যি শুনতে পায়। কারণ তার আমাদের মতোই একজোড়া কান আছে–সে কান যত বিদঘুঁটে গড়নেরই হোক না কেন? সাপের যে কানই নেই।
মরিয়া হয়ে ওপাশের আরেকটা ভাঙা দরজা পেরিয়ে আরেকটা ঘরে ঢুকলুম। ফের দেশলাই জ্বেলেই দেখি একটা সাইকেল চকচক করছে। তাহলে মানুষ আছে।
কিন্তু যেই সাইকেলের মালিককে ডাকতে গেছি, দেশলাই কাঠিটাও নিভেছে হঠাৎ কেউ শক্ত হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে গর্জে বলে উঠল,–তবে রে ব্যাটা চোর!
আর্তনাদ করে উঠলুম, আঃ! লাগছে, লাগছে! ছাড়ুনআমি চোর নই। আমি প্রধান অতিথি।
মুখের ওপর অনেকটা উঁচু থেকে আওয়াজ এল,–কী বললে?
প্রধান অতিথি।–হাঁফাতে-হাঁফাতে বললুম। আমি এখানে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলুম।
লোকটা আমাকে ছেড়ে দিল। তারপর টর্চ জ্বেলে ভাল করে আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল,–হুম। সেইরকমই মনে হয় বটে। মশায়ের নাম?
নাম বললে তাগড়াই উঁচু লোকটা নমস্কার করে বলল, যা গে। আলাপ করে বেজায় আনন্দ হল। আপনার এক গুণমুগ্ধ পাঠক আমি।
জিগ্যেস করলুম,–আপনার নামটা জানতে পারলে আনন্দ হত।
আমি ভূতনাথ পাত্র। কৈলাসপুর থানার চার্জে আছি।ভূতনাথ দারোগা প্রাণখোলা হেসে বললেন। আর বলবেন না মশাই। এ গাঁয়ে এসেছিলুম একটা দাগী আসামি ধরতে। ঝড়-বৃষ্টির চোটে সে ব্যাটাকে কায়দা করতে পারলুম না। সেপাইরাও মাথা বাঁচাতে কে কোথায় কেটে পড়ল। আমিও বেগতিক দেখে এই পোড়াবাড়িতে আশ্রয় নিলুম।
ভূতনাথকে খুব অমায়িক লোক মনে হচ্ছিল। একথা-সেকথার পর জিগ্যেস করলুম,–এই পোড়োবাড়িটা কার জানেন দারোগাবাবু?
ভূতনাথ বললেন,–শুনেছি এ বাড়িটার মালিক ছিলেন কোন এক হারাধনবাবু। একা থাকতেন। তাঁকে এক রাত্তিরে ডাকাত এসে খুন করেছিল।
চমকে উঠে বললুম, সর্বনাশ! তারপর?
ভূতনাথ বললেন, তারপর আর কী? হারাধনবাবুর মৃত্যুর পর বাড়ির মালিকানা নিয়ে ওঁর আত্মীয়দের মধ্যে মামলা বাধে। সেই মামলা এখনও চলছে। এদিকে বাড়ির অবস্থা তো দেখছেন। শ্যালকুকুর, প্যাচা-ছুঁচো-চামচিকের আখড়া হয়ে উঠেছে। ভূত থাকাও আশ্চর্য নয়। ওই যে আপনি ভূতের কেত্তনে লিখেছেন, বাড়ি খালি পড়ে থাকলেই ভূতেরা এসে জোটে এবং রাত-বিরেতে কেত্তন গায়।
ভূতনাথ দারোগা হা-হা, খ্যাক খ্যাক করে প্রচণ্ড হাসতে থাকলেন। ওদিকে বাইরে তুলকালাম ঝড়, বৃষ্টি, বাজের ডাকে–সে এক প্রলয়কাণ্ড চলছে।
হাসি থামিয়ে ভূতনাথ বললেন,–এই পোড়োবাড়িতে ভূত থাকলে সত্যি বড় মজা হত। বুঝলেন? ভূতের সঙ্গে জমিয়ে এখন আড্ডা দেওয়া যেত। কেত্তন শুনতেও আপত্তি ছিল না–যদিও কেত্তন জিনিসটা আমার ধাতে সয় না। কারণ ওতে গানের চাইতে খোল কলের আওয়াজ বড্ড বেশি। আপনার কী মত?
বললুম,–ঠিকই বলেছেন। তবে কী জানেন? ভূত নিয়ে বই লিখি-টিখি বটে, কিন্তু চর্মচক্ষে ভূত দেখতে আমার আপত্তি আছে।
কেন, কেন?–ভূতনাথ খুব আগ্রহের সঙ্গে জিগ্যেস করলেন।
বইয়ের ভূতেরা মারাত্মক হয় না। সত্যিকার ভূত খুব সাংঘাতিক বলেই আমার ধারণা। তারা নাকি ঘাড় মটকে মানুষকে মেরে ফেলে। ভয়ে-ভয়ে কথাটা বলে এদিক ওদিক তাকালাম। জানালাও ভাঙা। বিদ্যুতের ঝিলিকে বাইরে উঠোন দেখা যাচ্ছে। ঘরে দারুণ অন্ধকার। ভূতনাথ টর্চ নিভিয়ে ফেলেছেন কখন।
