তারপর কী হয়েছিল মনে নেই। নিশ্চয় আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলুম। কতক্ষণ পরে দেখি, বব আর পরেশ আমার মুখে জলের ঝাঁপটা দিচ্ছে। জ্ঞান ফিরতেই বললুম, ওরা কোথায়?
বব বলল,–তা জানি না। আমরা তোমাকে খুঁজতে এসে দেখি, এখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছো তুমি। তোমার জামা ছিঁড়ে ফাই। পরেশ বলল, তোমার শটগান কী হল তোতামামা?
অতিকষ্টে বললুম,–ওই জঙ্গলে ওরা ছুঁড়ে ফেলেছে। পরেশ জঙ্গলে খুঁজে শটগানটা কুড়িয়ে আনল। তারপর ওদের সাহায্যে অতিকষ্টে নিচে নেমে এলুম। জলের পাত্র তিনটে ঠিকই ছিল। পরেশ আর বব তিনটে পাত্র ধরাধরি করে নিয়ে চলল। আমি খাপ্পা হয়ে শটগানটা থেকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে একটা গুলি ছুড়লুম।
কিন্তু তখনও জানতুম না এরপর কী ঘটবে।
ভেলায় চেপে জাহাজে ফিরে গেলুম। জাহাজসুদ্ধ লোক ভিড় করে দাড়িবাবা বা বালখিল্যদের গল্প শুনল। কিন্তু তারা বিশ্বাস করল না। শুধু ক্যাপ্টেন হুবার্ট বললেন,–ওটার নাম ডেভিলস আইল্যান্ড কেন তা এবার জানা গেল। বব, পরেশ আর টোটা যাদের দেখেছে, তারা সেই শয়তান। যাই হোক, টোটাকে শয়তানরা ছুঁয়েছিল। টোটাকে একটা আলাদা কেবিনে রাখতে হবে। ওর গায়ে শয়তানের ভাইরাস লেগেছে। সাবধান! কথাগুলো শুনে আমি একটু ভড়কে গেলুম। তবে পুরো একটা কেবিনে একা থাকার সুযোগ পেয়ে একটু খুশিও হয়েছিলুম।
সেদিনই বিকেলে পাপুয়া দ্বীপের একটা মাছধরা ট্রলার মাছ ধরতে এসেছিল ওই অঞ্চলে। নাবিকদের পতাকা নাড়ানো দেখে তারা আমাদের জাহাজের পাশে এসেছিল। তারপর ক্যাপ্টেনের মুখে সব কথা শুনে একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন অফিসারকে ট্রলারে চাপিয়ে নিয়ে গেল।
মাঝরাতে একটা ছোট জাহাজ এসে প্রায় একমাইল উত্তরে নোঙর করেছিল। সেখান থেকে রবারের ভেলায় পালাক্রমে আমাদের জাহাজের লোকজনকে নিয়ে গেল। বাকি রইলেন শুধু ক্যাপ্টেন হুবার্ট আর আমি। ক্যাপ্টেন বললেন, আমাদের জাহাজের সব মাল খালাস করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিসবেন থেকে একটা মালবাহী জাহাজ আসছে। সেটা না আসা পর্যন্ত আমাকে থাকতে হবে। আর টোটা! তোমাকে শয়তানগুলো ছুঁয়েছে। তোমাকে কারও সংস্পর্শে যেতে দেওয়া হবে না। সেই জাহাজে তুমি আমার সঙ্গে যাবে। কথা শুনে খুব মনমরা হয়ে গেলুম।
যাই হোক। কেবিনে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম শেষ রাত্রে! হঠাৎ ঘুম ভাঙার পর চমকে উঠলুম। এ কী! আমার পা পর্যন্ত জঙ্গলের মতো দাড়ি গজিয়েছে কেন? লাফিয়ে উঠে বসলুম। সেই রকম লম্বা চুল আমার মাথা থেকে পায়ের পেছন দিকে লুটিয়ে পড়ল। সর্বনাশ! আমিও যে দাড়িবাবা হয় গেছি! চিৎকার করে ডাকলুম, ক্যাপ্টেন সায়েব! ক্যাপ্টেনসায়েব! ক্যাপ্টেন হুবার্ট এসেই আমাকে দেখে রিভলভার বের করেছিলেন। বললুম,–আমি আপনার সেই নাবিক টোটা স্যার! দয়া করে গুলি করে আমাকে মেরে ফেলবেন না। ক্যাপ্টেন তখন দড়াম করে কেবিনের দরজা এঁটে বাইরে থেকে বললেন,–তালা আটকে দিচ্ছি! টোটা! তুমি টু শব্দটি করবে না। করলেই গুলি করে মেরে ফেলব। আর শোনো! তোমাকে দেখলে ব্রিসবেনে হইচই শুরু হয়ে যাবে। তাই গোপনে তোমাকে আমার চেনা এক জীববিজ্ঞানী এবং ডাক্তারের ল্যাবে নিয়ে যাব। সাবধান! টু শব্দ নয়।
–কথা না বাড়িয়ে এবার সংক্ষেপে বলি। বোনটি! তার আগে আর এক কাপ চা চাই।
মা চা করে আনতে কিচেনে চলে গেলেন। দেখলুম, বাবা মিটিমিটি হাসছেন। তোতামামা বললেন,-বলেছিলুম বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমার মাথা, নাকের নিচেটা আর গালের অবস্থা দেখো…
চা খেয়ে তোতামিয়া তার কাহিনি শুরু করলেন।
ব্রিসবেনে জীববিজ্ঞানী এবং ডাক্তার রবার্ট স্টিলারের ল্যাবে প্রায় একমাস ধরে গোপনে আমার চিকিৎসা চলেছিল। ডাঃ স্টিলার বলেছিলেন, সলোমন আইল্যান্ড এলাকায় অনেক অদ্ভুত প্রাণী এখনও থাকতে পারে। তাদের গায়ের লোেম থেকে এরকম অদ্ভুত সংক্রামক ব্যাধি হওয়া খুবই সম্ভব। যাই হোক, আমি যে লোশন তৈরি করেছি, তার ফল পাওয়া গেছে। তবে এই নাবিকবেচারার দুর্ভাগ্য, আর ওর চুল গজাবে না। গোঁফ-দাড়ি গজাবে না। এর শরীরে আর লোম পর্যন্ত গজাবে না। কিন্তু সাবধান নাবিক! তোমাকে এখনও তিনমাস আমার লোশন মেখে স্নান করতে হবে প্রতিদিন। এর মধ্যে একদিন লোশন না মাখলে কী ঘটবে তা বলতে পারছি না। কথা শুনে কোনও প্রশ্ন করতে পারিনি। ডাঃ স্টিলার ক্যাপ্টেন হুবার্টের মতোই রগচটা মানুষ।
বলে তোতামামা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাবা তার উপহার দেওয়া লোশন দেখিয়ে বললেন, ওহে তোতামিয়া! এই লোশন তোমার সেই লোশন নয় তো?
অমনি তোতামিয়া আগের সময়ের মতো কুঁড়ি কাঁপয়ে হেসে বললেন, না, না! আমার লোশন কবে ফুরিয়ে গেছে। ওটার গায়ে কী লেখা আছে দেখো! শেভিং লোশন।
বললুম,–আচ্ছা তোতামামা! আপনি সেই ডাক্তারকে কেন বলেননি, অন্তত গোঁফ গজানোর কোনও লোশন দিন! তোতামামা! আপনার গোঁফ না থাকলে আপনাকে যে কেউ চিনতে পারবে না।
তোতামামা বললেন,–চেপে যা পুঁটু! এ শহরে কেউ যেন টের না পায় আমার গোঁফ নেই। তাহলে কেউ আমাকে গ্রাহ্য করবে না। জানিস? আমি ছোটভাইয়ের বাড়ি ঢুকিনি। চুপিচুপি সন্ধ্যাবেলা শুধু তোদের বাড়ি এসেছি। এখনই চুপিচুপি কেটে পড়ব। কলকাতা চলে যাব।
বাবা বললেন, তা কেন? তুমি নকল গোঁফ পরে মাথায় পরচুলো চাপিয়ে নেবে।
