ক্যাপ্টেন বললেন, তোমার মাথাখারাপ হয়েছে টোটা? ওই দ্বীপে যারা যায়, শুনেছি তারা আর জ্যান্ত ফিরে আসে না।
তাই শুনে বব বলল, আঙ্কল টোটার সঙ্গে আমিও যেতে রাজি।
পরেশও বলল, আমিও যাব। রবারের ভেলায় প্লাস্টিকের পাত্রে প্রচুর জল ভরে আনব।
দুই ভাগ্নের সাহসে আরও সাহসী হয়ে বললুম, ক্যাপ্টেনসায়েব! আমাদের যেতে অনুমতি দিন। আমাদের চাই শুধু তিনটে আগ্নেয়াস্ত্র!
ক্যাপ্টেন একটু চিন্তাভাবনা করে বললেন,–এই অগভীর সমুদ্রে বহু দ্বীপ থেকে আদিবাসীরা মাছ ধরতে এসে আমাদের জাহাজ দেখতে পাবে। তখন তারা আমাদের আক্রমণ করতে পারে। তাই আমি তোমাদের রাইফেল বা রিভলভার দিতে পারব না। বড়জোর দুটো শটগান আর দুটো করে চারটে কার্তুজ দিতে পারি। ক্যাপ্টেনের কথায় যুক্তি ছিল।
তো বব আর আমি শটগান দুটো নিলুম। পরেশ নিল ঝোঁপজঙ্গল কাটা একটা ভোঙ্গালি জাতীয় ছোট্ট ধারালো দা। আমরা তিনজনে রবারের ভেলায় চেপে শয়তানের দ্বীপের বালিভরা বিচে পোঁছলুম। তারপর জল ভরার তিনটে পাত্র নিয়ে রবারের ভেলাটা টানতে-টানতে ফার্নের জঙ্গলে লুকিয়ে রাখলুম।
আগেই বলেছি, দ্বীপের গাছপালার চেহারা কেমন যেন জ্যান্ত। এসব গাছ আমি জীবনে দেখিনি। কাছাকাছি গিয়ে মনে হচ্ছিল ফিসফিস শব্দে গাছগুলো যেন আমাদের বিরুদ্ধে কী চক্রান্ত করছে। ফার্নের ঝোঁপ কেটে যত এগোচ্ছি পাহাড়টার দিকে, তত চমকে উঠে পিছনে তাকাচ্ছি। কেউ বা কারা যেন গোপনে বা অদৃশ্য থেকে আমাদের পিছনে হেঁটে আসছে। বব তো একবার চমকে উঠে শটগান তাক করে গুলি ছুঁড়তে যাচ্ছিল। ওকে আটকে না দিলে সত্যি গুলি ছুড়ত।
মিনিট কুড়ি হাঁটার পর দেখলুম, ওটা পাহাড়ি ঝরনাই বটে। প্রায় পঞ্চাশ ফুট উঁচু থেকে জলের ধারা নিচে আছড়ে পড়ে ছোট্ট একটা জলাশয় সৃষ্টি করেছে। বহু দ্বীপে এ ধরনের প্রস্রবণ আছে, সুপেয় জলের। ছোট্ট জলাশয়টা অন্তত বিশ ফুট নিচে একটা সংকীর্ণ উপত্যকায় অবস্থিত। তারপর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। ঝোঁপ কেটে আমরা নামতে যাচ্ছি, হঠাৎ এক অদ্ভুত-বেজায় উদ্ভুট্টে দৃশ্য দেখতে পেয়ে তিনজনই গুঁড়ি মেরে বসে পড়লুম।
ঝরনা যেখানে আছড়ে পড়ছে, তার পাশে একটা চওড়া কালো সমতল পাথর। সেই পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে চারটে প্রাণী। কীরকম প্রাণী বলি।
ফুট চারেক উঁচু। তাদের সাদা গোঁফ-দাড়ি বুক ঢেকে পায়ের তলায় পৌঁছেছে। তাদের মাথার সাদা চুলও পিঠ ঢেকে পায়ের পেছনে মাটি ছুঁয়েছে। শুধু মুখের ওপরটা আর দুটো লিকলিকে হাত দেখা যাচ্ছে কঁধ থেকে। বেজায় কালো রং। চোখগুলো যেন জ্বলছে।
ওরা কতকটা মানুষের মতো। অথচ মানুষ নয়। আমরা হতভম্ব হয়ে বসে আছি। কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। একটু পরে চারটে প্রাণীই ঝুপঝুপ করে জলাশয়ে ঝাঁপ দিল। সাঁতার কাটল কিছুক্ষণ। তারপর পাথরটাতে উঠে শরীর নাড়া দিয়ে জল ঝেড়ে ফেলে রোদে বসল। মনে হল, ওরা দাড়ি আর চুল শুকিয়ে নিচ্ছে।
পরেশ ফিসফিস করে বলল, তোতামামা! মনে হচ্ছে এরাই সেই বালখিল্য মুনি। মহাভারতে এদের কথা পড়েছি। ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন ক্রতু। তুর পুত্র ছিলেন বালখিল্য মুনিরা। শুধু একটা কথা মিলছে না। বালখিল্য মুনিদের সাইজ ছিল এক আঙুল লম্বা। পরেশ আমাকে বাংলায় কথাগুলো বলছিল। তাই বব চটে গিয়ে জানতে চাইল কী বলছে পরেশ? তখন পরেশ তাকে কথাগুলো যথাসাধ্য ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিল।
বব গম্ভীর হয়ে বলল,–তোমাদের ওই বই যারা লিখেছিল, তারা নিশ্চয় দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড ছিল। তাদের আঙুল কি তোমার মতো ছিল? পরেশ সায় দিল তার কথায়।
আধঘণ্টা কেটে গেল। কিন্তু বালখিল্যরা নড়ল না। তখন অধৈর্য হয়ে খাপ্পা বব আমি বাধা দেওয়ার আগেই শূন্যে ফায়ার করে দিল। নিচের উপত্যকায় প্রচণ্ড শব্দ হল। অমনি সেই দাড়িবাবারা, পরে ঠাট্টা করে আমি তাদের দাড়িবাবা নাম দিয়েছিলুম–তারা চমকে গিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। তারপর কিচিরমিচির করে কী বলতে থাক। ববকে আটকাতে পারলুম না। সে আবার শূন্যে ফায়ার করামাত্র দাড়িবাবা বা বালখিল্যরা পাহাড়ের গায়ে ঝোঁপজঙ্গলের ভেতর চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বব, তার পিছনে পরেশ, তার পিছনে আমি তিনটে জলের পাত্র নিয়ে দ্রুত নেমে গেলুম। সেই পাথরটা থেকে ঝরনার জল ভরতে শুরু করল বব আর পরেশ। আমি শটগান হাতে পাহারায় রইলুম।
হঠাৎ আমার মাথায় গো চাপল। দুর্মতি আর কাকে বলে?
তোমামা আবার জোরে শ্বাস ছেড়ে চুপ করলেন। বললুম,–তোমামা! তারপর কী হল?
তোতামামা তাঁর মাথার চকচকে চামড়ায় হাত বুলিয়ে নিয়ে আবার তাঁর কাহিনি শুরু করলেন।
–হঠাৎ আমার মাথায় গো চাপল। শটগানের গুলির শব্দে যারা ভয় পায়, তারা নিশ্চয় ভিতু। আমার হাতে শটগান আছে। দুটো কার্তুজ আছে। ধারালো দা আছে। তাছাড়া নাবিকজীবনে কত ভয়াবহ অবস্থায় পড়েছি। তা থেকে গায়ের জোর আর বুদ্ধির জোরে উদ্ধার পেয়েছি। এই চার ফুট দাড়ি-চুলওয়ালা দুপেয়ে প্রাণীগুলোকে ভয় পাওয়ার মানে হয় না। ওদের অন্তত একটাকে ধরে জাহাজে নিয়ে যেতে পারলে হইচই পড়ে যাবে।
আমি বব আর পরেশকে কিছু না বলেই খাড়াই বেয়ে সাবধানে উঠতে শুরু করলুম। ওরা আমাকে ডাকাডাকি করছিল। সাড়া দিলুম না। পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে দেখি জঙ্গলের ভিতরে সরু একটা পথ। ওই পথেই বিদঘুঁটে প্রাণীগুলো তাহলে এসেছিল। কয়েক পা এগিয়ে গেছি, আচমকা দুধারের গাছ থেকে ঝুপঝুপ করে সেই দাড়িবাবারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখন বুঝলুম, ওদের গায়ে কী সাংঘাতিক শক্তি! একজন আমার শটগান কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল। বাকি তিনজন আমার পিঠে বসে ফরফর করে আমার জামা ছিঁড়ে ফেলে দাড়ি ঘষতে থাকল। ওহ! সে কী সুড়সুড়ি! হাসব কী, চ্যাঁচিতে শুরু করলুম। তখন একজন হাত বাড়িয়ে আমার গোঁফসুদ্ধ মুখ চেপে ধরল। গোঁ-গোঁ করতে থাকলুম।
