তোমামা বলতে শুরু করলেন তার গোঁফ হারানো আর টাক গজানোর রোমাঞ্চকর কাহিনি।…
–আমাদের জাহাজটা যাত্রিবাহী নয়, মালবাহী ছোট জাহাজ। পৃথিবীর এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে নানা কোম্পানির নানারকম জিনিস পৌঁছে দেয়। জাহাজটার মালিক এক ব্রিটিশ কোম্পানি। জাহাজের নাম ভিট্রি।
গত বছর নভেম্বরে কলকাতা থেকে হংকংয়ে মাল পোঁছে দিয়ে আবার সেখান থেকে মাল বোঝাই করে জাপানের হোক্কাইদো দ্বীপের কাহিরা বন্দরে পৌঁছেছিলুম। কাহিরা থেকে ডিসেম্বরের শেষাশেষি আমাদের জাহাজ রওনা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন বন্দরের দিকে।
প্রশান্ত মহাসাগরের যে অঞ্চল দিয়ে আমরা ভেসে যাচ্ছিলুম, তাকে পলিনেশিয়া বলা হয়। জাহাজের গতি দক্ষিণে। বাঁ-দিকে পাপুয়া এবং নিউজিল্যান্ড, ডানদিকে অস্ট্রেলিয়া। ওখানে প্রশান্ত মহাসাগর আর তত চওড়া নয়। জানুয়ারি মাস। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্মকাল শুরু হয়েছে। উত্তর গোলার্ধে যখন শীত, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্ম!
বেশ যাচ্ছিলুম। হঠাৎ এক রাত্রে শুরু হয়ে গেল তুমুল ঝড়বৃষ্টি। ঝড়ের গতিও দক্ষিণে। কিন্তু সেই ঝড় এমন সাংঘাতিক যে, আমাদের ছোট জাহাজটার অবস্থা হল শোচনীয়। গতি নিয়ন্ত্রণ করে যে যন্ত্রটা, তার নাম রেডার। আমরা নাবিকরা বলি র্যাডার। পাপুয়ার পাশ ঘেঁষে যাওয়া বিপজ্জনক। কারণ সমুদ্রের তলায় ওখানে আছে কয়েকটা ডুবোপাহাড়। কিন্তু ঝড়ের দাপটে র্যাডার অকেজো হয়ে গিয়েছিল। ডুবোপাহাড়ের কিনারায় ধাক্কা লেগেই এই দুরবস্থা।
তারপর আর জাহাজের গতি সামাল দেওয়া গেল না। র্যাডার নৌকোর হালের কাজ করে। হাল ভাঙলে নৌকোর কী অবস্থা হয় ভাববা! ক্যাপ্টেন হুবার্ট বেতারে এস. ও. এস. অর্থাৎ বিপদসংকেত পাঠাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, কোনও বন্দর থেকে সাড়া পাচ্ছিলেন না।
অবশেষে ঝড় যখন থামল, তখন বিপদের ওপর বিপদ, অগভীর সমুদ্রের তলায় জাহাজ গেল আটকে। ইঞ্জিনও গেল বিগড়ে। কারণ জাহাজের প্রপেলার সমুদ্রতলে চড়ার ধাক্কায় বেঁকেচুরে গিয়েছিল। জলের গভীরতা মেপে আমরা প্রমাদ গুনলুম। মাত্র বিশ ফুট গভীরতা সেখানে! ছোট জাহাজ হলেও দুশো টন মাল তো ভর্তি।
ক্যাপ্টেন হুবার্ট অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ হিসেব করছিলেন কম্পাসযন্ত্রে। তাঁর কেবিন থেকে বেরিয়ে জাহাজের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার আর নাবিকদের ডেকে তিনি বললেন, আমরা বিপন্ন। কারণ আমরা এসে পড়েছি সলোমন দ্বীপপুঞ্জের কাছে। অক্ষাংশ ১০ ডিগ্রি এবং দ্রাঘিমাংশ ১৬০ ডিগ্রি থেকে সামান্য দূরে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই অগভীর সমুদ্রের পূর্বে এবং খুব কাছাকাছি যে দ্বীপটা আছে, তার নাম ডেভিলস আইল্যান্ড।
অর্থাৎ কিনা শয়তানের দ্বীপ! আমরা চমকে উঠেছিলুম। কারণ নাবিকজীবনে ওই জনহীন দ্বীপ সম্পর্কে অনেক ভুতুড়ে গল্প শুনেছি। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন হুবার্ট দূরবিনে দেখে নিয়ে আবার বললেন,-া। আমাদের বাঁ-দিকে একমাইল দূরে একটা ছোট্ট দ্বীপ দেখতে পাচ্ছি। ওটাই যে শয়তানের দ্বীপ তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
কিছুক্ষণ পরে দিনের আলো ফুটে উঠল। খালিচোখেই দ্বীপটা দেখতে পেলুম। নাবিকদের মধ্যে বব নামে এক মার্কিন যুবক আর পরেশ রায় নামে একজন বাঙালি যুবক ছিল আমার খুব ঘনিষ্ঠ। পুটুর মতোই, কেন জানি না, পরেশ আমাকে বলত তোমামা। আর বব বলত আঙ্কল টোটা। তো ববের কাছে ছিল বাইনোকুলার। সে বাইনোকুলারে দ্বীপটা দেখতে-দেখতে বলল,–শুধু জঙ্গল দেখতে পাচ্ছি আঙ্কল টোটা! গাছগুলোর চেহারা ভারি অদ্ভুত। তলায় ফার্নের ঝোঁপ আছে অবশ্য। আর একটা পাহাড়ও দেখতে পাচ্ছি। পাহাড় থেকে জলপ্রপাত নেমে গেছে মনে হচ্ছে। কিন্তু সত্যি কোনও জনমানব দূরের কথা, কোনও প্রাণী–এমনকী পাখি পর্যন্ত নেই। আশ্চর্য তো!
ববের কাছ থেকে বাইনোকুলার নিয়ে আমিও খুঁটিয়ে দেখে বললুম, বব ঠিকই বলেছে। দ্বীপের গাছগুলোর মতো ওই রকম আজব গাছ কখনও দেখিনি। গাছগুলো যেন জ্যান্ত হয়ে কটমট করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পরেশও আমার কাছে থেকে বাইনোকুলার নিয়ে দ্বীপটা দেখতে থাকল!
তোতামামা শ্বাস ছেড়ে চুপ করলেন। বাবা বললেন,–তারপর কী হল বলো!
তোতামামা একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, শেষে বেতারযন্ত্রটাও গেল বিগড়ে। এখন আমাদের একমাত্র ভরসা, যদি দূরে কোথাও কোনও জাহাজ বা মাছধরা ট্রলারের দেখা পাওয়া যায়। মাছধরা ট্রলার এই অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে আসে শুনেছিলুম।…
কিন্তু কোথায় কী? সাতদিন সাতরাত্রি কেটে গেল। খাদ্যের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছিল। রেশন করে একটুকরো পাউরুটি আর একটুখানি জল খেয়ে কাটাচ্ছিলুম। অবশ্য নাবিকদের অনেকের কাছে মাছধরা ছিপ ছিল। সমুদ্রের মাছ কোনটা খাওয়া যায়, কোনটা বিষাক্ত বা অখাদ্য আমরা জানি। সেই মাছ পুড়িয়ে খেয়ে পেট ভরাচ্ছিলুম বটে, কিন্তু পানীয় জল? শেষে এমন অবস্থা হল, জলের অভাবে আমরা কাতর হয়ে পড়লুম।
তখন আমিই মরিয়া হয়ে ক্যাপ্টেনসায়েবকে বললুম, স্যার! শয়তানের দ্বীপে একটা পাহাড়ে জলপ্রপাত বা ঝরনা, যা-ই হোক, আমরা দেখতে পেয়েছি। আপনি যদি অনুমতি দেন, তা হলে আমি শয়তানের তোয়াক্কা না করে ওই দ্বীপ থেকে পানীয় জল আনতে পারি।
