ঘুমটা এসে গেছিলো তাড়াতাড়িই। বেশ খানিকক্ষণ পরে, আধো জাগরণে, আধো তন্দ্রায় মনে হল, খাটের পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কেউ নেই জানি। কিন্তু কেউ দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে এই অস্বস্তিকর অনুভূতিটা তীব্র হয়ে উঠলো।
তার ওপর হঠাত করে মনে হল এসিটা যেন বেশি ঠান্ডা ছড়াতে শুরু করেছে, দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। আশ্চর্যজনক ভাবে এসির মৃদু আওয়াজটা কিন্তু শোনা যাচ্ছে না একেবারেই। কোথাও কোন আওয়াজ নেই, বিন্দুমাত্র আলো নেই, দিকচিহ্ন নেই, কোথায় আছি, কিভাবে আছি, বুঝতে পারছি না। শরীরের নিচে বিছানাটা অনুভব করতে পারছি না। মনে হচ্ছিল যেন গাঢ় নিশ্ছিদ্র অথৈ শূন্যতার মধ্যে কেউ আমাকে গেঁথে দিয়েছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে গলার নিচ থেকে আমার সারা শরীরে কোন সাড় নেই। আরও যেটা অদ্ভুত লাগছিল, যে আমি চেষ্টা করেও চোখ খুলতে পারছি না! মাথা নাড়াতে পারছি না! মানে আমার সমস্ত জোর দিয়ে চাইছি মাথাটা এদিকে ঘোরাতে, পাগলের মত চেষ্টা করছি, ছটফট করছি, তীব্র একটা জান্তব ইচ্ছে দিয়ে চাইছি মাথাটা ঘুরিয়ে চোখ খুলে দেখতে আদৌ কেউ আছে কি নেই….
কিন্তু একচুলও নড়তে পারছি না।
ধীরেধীরে অনুভব করলাম খুব ঠান্ডা কিলবিলে কিছু একটা চাদরের নিচে দিয়ে আমার পিঠে এসে ঠেকলো। সাপে আমার খুব ভয়, বস্তুত ঘেন্না করি। সারা শরীর যেন ভয়েঘেন্নায়আতংকে কুঁকড়ে উঠতে চাইলো। কিন্তু তাও একবিন্দু নিজেকে নড়াতে পারছি না, একবিন্দুও না। সেই ঠান্ডা সর্পিল অনুভূতিটা কক্সিস বরাবর এসে যেন মুহুর্তের জন্যে স্থির হয়ে দাঁড়ালো, তারপর যেন সেকেন্ডের ক্ষণভগ্নাংশের বিরতি দিয়ে শিরদাঁড়া বরাবর খুব ধীরেসুস্থে পিঠের মাঝখান বেয়ে উঠতে লাগলো। বুঝতে পারলাম আমার সমস্ত শরীর ছিটকে উঠতে চাইছে, আর্ত গলায় চিৎকার করতে চাইছে, এই ঘৃণ্য অনুভূতিটাকে গলায় দলা পাকিয়ে ওঠা কফের মতই ছুঁড়ে ফেলতে চাইছে….
কিন্তু আমি বিন্দুও নিজেকে নড়াতে পারছি না!!!
কত স্থিরশঙ্কিত আতঙ্কমুহূর্ত কেটে গেছে খেয়াল ছিল না, সেন্সগুলোও ঠিকঠাক কাজ করছিল না। হঠাত করে বুঝলাম যে সেই শীতল হিলহিলে শিরশিরানি অনুভূতিটা আমার পিঠে আর নেই। খুব মৃদুভাবে হলেও সামান্য সাহস এলো। ভাবছি আবার নড়াচড়ার চেষ্টা করবো কি না, কেন জানি মনে হচ্ছিল যে এবার পারবো, এবং ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম,
কেউ যেন গায়ের চাদরটা টেনে নিচ্ছে ধীরেধীরে!
খানিকক্ষণ কাঠ হয়ে পড়ে রইলাম। খুব ধীরে হলেও গায়েহাতেপায়ে সাড় ফিরে আসছিলো। মুঠো করে চাদরটা ধরার চেষ্টা করে বুঝলাম বৃথা প্রয়াস। চাদরটা যেন কোন এক অলৌকিক ম্যাজিশিয়ানের অলক্ষ্য নির্দেশে পৃথিবীর সমস্ত ভার নিয়ে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত ভাবে সরে যাচ্ছিল নিচের দিকে। এবং পায়ের দিকে চোখের তারা নাড়িয়ে দেখলাম, সেই চাদরটিকে যেন খাটের পায়ার কাছে এক অতলান্ত আঁধারসমুদ্র গিলে খাচ্ছে। ধীরে, খুবই ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত ভাবে যেন আমার সমস্ত সুস্থতার আব্রু ওই চাদরের সংগেই অন্তর্লীন এক নিঃসীম শূন্যতার মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছে। কোন এক যাদুকর যেন আমার সমস্ত অস্তিত্ব হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতই ওই চাদরে জড়িয়ে অগাধ হাহাকারের মধ্যে…
ততক্ষণে আমার হাতে পায়ে সাড় ফিরে এসেছিলো অনেকটাই। চাদরটা তখন আমার হাঁটুর কাছে। ক্রমশ সরে যাচ্ছে। আধো মগ্নচৈতন্যে ঠিক করলাম ঝটিতি ঘুরে, মাথার কাছে বেডস্যুইচটা অন করে দিই। তাহলে এই অতর্কিত মুভমেন্টে অপ্রস্তুত আমার এই প্রতিপক্ষটিকে দেখতে পারবো। আমিও বাঙাল। যা হবে সামনাসামনি হোক। দেখাই যাক না, কি হচ্ছে অ্যাকচুয়ালি?
ফলে আমি বাঁদিক থেকে ডানদিকে ঘোরার চেষ্টার শুরু করার আগেই চাদরের সরে যাওয়াটা আরও দ্রুততর হল।
এর পরের ঘটনাটা স্রেফ সিনেমায় ফ্রেম বাই ফ্রেম দেখানোই সম্ভব। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেলো যেন। মানে আমি সেকেন্ড বাই সেকেন্ড ডানদিকে ফিরছি, এক এক ক্ষণসেকেন্ড যেন অনন্তসময়কাল মনে হচ্ছে, এবং চাদরটা ততোধিক দ্রুতবেগে হাঁটুর আরও নিচে সরে যাচ্ছে। যে মুহুর্তে আমি বাঁ হাত দিয়ে স্যুইচটা ছুঁলাম, বুঝলাম যে চাদরটা আমার ডান পায়ের নখের ডগা থেকে সেই নিঃসীম অন্ধসমুদ্রে মিলিয়ে গেলো…
জাস্ট এক সেকেন্ডের মধ্যে আলো জ্বলে উঠলো।
চাদর আমার গায়ে নেই।
মেঝেতেও নেই।
হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে বসলাম। বুঝলাম যে কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমে আছে। হাত দুটো তখনও থরথর করে কাঁপছিল। বেডসাইড টেবিলে জল ছিল, এক নিঃশ্বাসে প্রায় পুরোটা শেষ করলাম। বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডটা বেধড়ক লাফাচ্ছিল। একটু শান্ত হলাম বসে।
তারপর ভাবলাম চাদরটা গেলো কই?
ধীরেধীরে বিছানা থেকে পা নামিয়ে এদিকওদিক দেখে বুঝলাম চাদরের নামগন্ধ নেই। সামান্য এগোতে এগোতে এল এর বাঁকে এসে পৌঁছলাম।
ধীরে ডানদিকে ঘাড় ঘোরাতেই দেখি,
চাদরটা এল এর অন্যদিকে, দরজার কাছে পড়ে!
মনে হল আতঙ্কে গলা চিরে একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ বেরিয়ে আসবে। বাকি সব কিছু আমার নেশা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। কিন্তু যে অলৌকিক উপায়ে কিছুক্ষণ আগেও আমার গায়ে থাকা চাদর, একটা নব্বই ডিগ্রি বাঁক পেরিয়ে সুদূর দরজার কাছে পড়ে থাকে, সেটা কি ভাবে বুঝবো ভেবে পেলাম না!!
